স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: ব়্যাগিং একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ বহু বছর ধরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ব়্যাগিং বন্ধ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে রাজ্য সরকার৷ ২০০৯ সালে ব়্যাগিংয়ের জেরে মেডিক্যালের ছাত্র আমন কাছরুর মৃত্যুর পর এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও৷ কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত এখনও দেশে ব়্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটে চলেছে৷ এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব৷ আর কোনও পড়ুয়া ব়্যাগিংয়ের শিকার হলে তিনি পদক্ষেপও নিতে পারেন৷

কিন্তু, বেশির ক্ষেত্রেই দেখা যায় সিনিয়রদের হুমকি বা অপমানে কোনও অভিযোগ দায়ের করেন না৷ তার পিছনে দায়ী থাকে অজ্ঞানতাও৷ কোথায় গিয়ে অভিযোগ জানাবে? জানালে কেউ বিশ্বাস করবে তো? জানিয়ে দিলে আমার আরও ক্ষতি করে দেবে না তো? এই ধরনের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন ব়্যাগিংয়ের শিকার পড়ুয়ারা৷ ক্রমে সেই উদ্বিগ্নতার ফল হয়ে দাঁড়ায় মানসিক অবসাদ৷ তারপর মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে তাঁরাই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ৷

Advertisement

অতদূর বিষয়টি এগানোর আগেই সামলে নেওয়া যেতে পারে নিজেকে৷ পদক্ষেপও নেওয়া যেতে পারে দোষীদের বিরুদ্ধে৷ কীভাবে? প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অ্যান্টি ব়্যাগিং নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে অ্যান্টি ব়্যাগিং সেল৷ এ ছাড়া, ব়্যাগিং প্রতিরোধের জন্যও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা রয়েছে ২০০৯ সালের ইউজিসির উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব়্যাগিং প্রতিরোধ আইনে৷ যেমন, ইউজিসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পড়ুয়ার হাতে একটি লিফ্টলেট তুলে দেওয়া হয়৷ যেখানে একটি পড়ুয়া কার কাছে অভিযোগ নিয়ে যেতে পারবেন তার বিস্তারিত তথ্য দেওয়া থাকবে৷ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে অ্যান্টি ব়্যাগিং কমিটি ও অ্যান্টি ব়্যাগিং স্কোয়াড থাকবে৷

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ইউজিসি স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়েই এই কমিটি ও স্কোয়াড রয়েছে৷ কেউ যদি ব়্যাগিংয়ের শিকার হন তাহলে এই অ্যান্টি ব়্যাগিং কমিটির কাছে অভিযোগ জানালেই ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনে দোষীকে শাস্তিও দেওয়া হবে৷ এ বিষয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তরুণকান্তি নস্কর বলেন, ‘‘এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটলে অফিসিয়াল অ্যান্টি ব়্যাগিং সেলে জানাতে হবে৷ প্রয়োজনে অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদের জানাতে হবে৷’’ তবে, যদি কোনও কারণে কেউ বিশ্ববিদ্যালয় বা নিজের প্রতিষ্ঠানকে জানানোর ভরসা না পান তাহলে সরাসরি ইউজিসির কাছেও অভিযোগ জানাতে পারেন ওই পড়ুয়া৷

এ ছাড়া, যে জেলায় ঘটনাটি ঘটছে সেই জেলার ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গিয়েও অভিযোগ জানানো যায়৷ সম্প্রতি ব়্যাগিং সম্পর্কে সচেতন করার জন্য রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্যাম্পাসে অ্যান্টি ব়্যাগিং পোস্টার লাগানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাংলার উচ্চ শিক্ষা দফতর থেকে৷ এই নির্দেশেই ব়্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটলে কোথায় কোথায় অভিযোগ করা যাবে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ উচ্চ শিক্ষা দফতরের হেল্প লাইন নম্বরে ফোন করেও সাহায্য চাইতে পারেন পড়ুয়ারা৷

তবে, সবসময় অফিসিয়ালভাবে এগানোর পদ্ধতি সম্পর্কে জানা থাকে না পড়ুয়াদের৷ সেই সব ক্ষেত্রে অধ্যাপক-অধ্যাপিকাদেরও জানাতে পারেন পড়ুয়ারা৷ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দেবদত্ত রায় বলেন, ‘‘যে বিভাগের পড়ুয়া সেই বিভাগের প্রধানকে বিষয়টি জানাতে পারে পড়ুয়া৷ বিভাগীয় ডিনকেও জানাতে পারে৷ তাঁদের বলতে পারেন, স্যার বা ম্যাম আমার সঙ্গে এই ধরনের ব্যবহার করা হচ্ছে৷ সেক্ষেত্রে তাঁরাই প্রাথমিকভাবে জানিয়ে দেবেন ও গাইড করবেন যে কীভাবে অভিযোগ জানাতে হবে৷’’ পাশাপাশি, পরিবারকেও জানানো দরকার৷ প্রয়োজনে তাঁরাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন৷

এ তো গেল কী করে পদক্ষেপ নেবেন৷ তার আগে জেনে নেওয়া দরকার যে, একটু বুদ্ধি খাটিয়েও এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসা যায়৷ কী করে? মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অভিষেক হংস জানাচ্ছেন, এই ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে পড়ুয়াদের বুদ্ধি খাটিয়ে বের হয়ে আসতে হবে৷ তিনি বলেন, ‘‘প্রথমেই পড়ুয়াদের একটা পার্সনালিটি তৈরি করতে হবে৷ যে কোনও নতুন সিচুয়েশনে যাওয়ার আগে তাকে ভেবে নিতে হবে সে কী কী ধরনের সমস্যা হতে পারে ও তার কী কী সমাধান হতে পারে তা আগে থেকেই ভেবে নিতে হবে৷ তাহলে, এই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হলে তার সমাধান সহজেই করতে পারবে সে৷ একটা পরিকল্পনা তৈরি করে রাখা দরকার৷’’

কিন্তু, যদি হঠাৎ করে কোনও অচেনা পরিস্থিত সম্মুখীন হয় কেউ? সেক্ষেত্রে তাঁরা কী করবেন? উত্তরে অভিষেক হংস বলেন, ‘‘হঠাৎ করে কোনও সমস্যা দেখা দিলে মানুষ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে৷ সেটা একদম উচিত নয়৷ কারণ, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে আমাদের লজিক্যাল ব্রেইন কাজ করা বন্ধ করে দেয়৷ তাই ইমোশনাল না হয়ে এই সব পরিস্থিতিতে বুদ্ধি খাটিয়ে বের হয়ে আসতে হয়৷ মজা করে, অনুরোধ করে, বাহানা দিয়ে সেই সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে হয়৷’’ আর কোনও পরিস্থিতিতে যদি জীবনের ঝুঁকির সম্ভাবনা তৈরি হয় সেক্ষেত্রে অপমান সহ্য করে বের হয়ে আসাটাই প্রধান লক্ষ্য হতে হবে৷ তারপর পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে৷ সেটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হবে৷

তবুও, অনেক ক্ষেত্রে সাবধানতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ সত্ত্বেও ব়্যাগিংয়ের শিকার হতে হয় অনেক পড়ুয়াদের৷ তার ফলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন অনেকেই৷ ব়্যাগিংয়ের পরে মানসিক দিক থেকে ঠিক থাকাটাও অত্যন্ত জরুরী৷ আর তার জন্য প্রয়োজন সাপোর্ট সিস্টেম৷ অভিষেক হংস বলেন, ‘‘প্রথমেই বাবা-মাকে জানাতে হবে৷ কারণ, বাবা-মায়ের থেকে বেশি সাপোর্ট এই পৃথিবীতে আর কেউ দিতে পারেন না৷ যে কোনও সমস্যাতেই তাঁদেরকে সবার প্রথমে জানানো উচিত৷’’ পাশাপাশি, বাবা-মা, পরিবারকেও এই সব ক্ষেত্রে সচেতন থাকার কথা বলছেন অভিষেক হংস৷ তাঁর মতে, এই ধরনের সমস্যায় প্রথমে সন্তানদের কী করে সাহায্য করা যাবে, ওই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনা যাবে সেই চিন্তা করতে হবে বাবা-মাকে৷ সেটা না করে বকাবকি করলে ফল হীতে বিপরীত হতে পারে বলে দাবি এই বিশেষজ্ঞ মনোবিদের৷

বাবা-মাকে জানানোর পরের পদক্ষেপ কাউন্সেলিং করানো৷ অভিষেক হংস বলেন, ‘‘এই সব ক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব মনোবিদের সাহায্য নিতে হবে৷’’ কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন রবীন্দ্রভারতীর রেজিস্ট্রারও৷ দেবদত্ত রায় বলেন, ‘‘এই ধরনের ঘটনা ঘটলে কাউন্সেলিং করানোর প্রয়োজন দেখা দেয়৷ একজন মনোবিদ যদি ব়্যাগিংয়ের এর শিকার পড়ুয়াদের কাউন্সেলিং করান তা অনেকটাই ফলপ্রসূ হবে বলে আমি মনে করি৷ আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন কাউন্সিলর নিয়োগ করার ভাবনাচিন্তা করছি৷ যদিও, বিষয়টি এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে৷’’

----
--