শুধু গান্ধী নন, বিড়লারা শ্যামাপ্রসাদকেও সমর্থন করতেন

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: বিড়লা পরিবার শুধু যে মহাত্মা গান্ধী এবং কংগ্রেসের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এমন নয়, লালা লাজপত রায়, মদনমোহন মালব্য এবং হিন্দু মহাসভার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন৷ এমনকী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী করতেও চেয়েছিলেন এই ব্যবসায়ী পরিবারের প্রতিনিধিরা৷

ঘনশ্যামদাস বিড়লার জীবনে গান্ধীজির প্রভাব ছিল অসীম৷ ১৯১৬ সালে তিনি প্রথম গান্ধীজির সংস্পর্শে আসেন৷ তাঁরা দুজনেই একে অপরের উপর এতটাই নির্ভর করতেন যে, তাঁদের সিদ্ধান্তেও তার প্রতিফলন মিলত৷ জিডি বিড়লা গান্ধীজির কোনও কাজ বা সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যেমন কখনও সখনও প্রশ্ন তুলতেন তেমনই তার জেরে কোনও কোনও ক্ষেতে গান্ধীজি তাঁর সিদ্ধান্ত বদলও করতেন৷ এজন্যই বয়সে অনেক ছোট হলেও জিডি বিড়লাকে তাঁর অন্যতম ‘মেন্টর’ বলেও সম্বোধন করেছেন মহাত্মা গান্ধী৷

ধনী হলেও জিডি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাজে খুশি ছিলেন মহাত্মা৷ কারণ, তাঁরা তাঁর অহিংসা ও সত্যাগ্রহের অত্যন্ত ভক্ত ছিলেন৷ প্রয়োজন হলে অর্থ বা অন্য যে কোনও প্রয়োজনে তাই এই মাড়োয়ারি পরিবারের কাছে সহায়তা চাইতে কুন্ঠাবোধ করতেন না গান্ধীজি৷ যেমন দেশবন্ধু মেমোরিয়াল ফান্ডের জন্য জিডির কাছ থেকে টাকা চেয়েছিলেন গান্ধীজি এবং এজন্য এক লক্ষ টাকা পাওয়ায় অভিভূত হয়ে তাঁকে ধন্যবাদও জানান৷ আবার এই গান্ধীজিই জয়প্রকাশ নারায়ণের কাজের একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন জিডি বিড়লাকে৷ গান্ধীর সেই চিঠি নিয়ে জয়প্রকাশ নারায়ণ জিডি-র সঙ্গে দেখা করলে জিডি বিড়লা জয়প্রকাশ নারায়ণকে তাঁর ব্যক্তিগত সচিবের পদে চাকরি দেন৷

- Advertisement -

১৯৩৬ সালেও বিশ্বভারতীর আর্থিক সংকট মোচনে নানা দেশে এবং নানা জনের কাছে তদ্বির করতে হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে৷ সেই উদ্দেশ্যে গুরুদেব কলকাতায় একটি ব্যালে নৃত্যের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন৷ অনুষ্ঠানের খবর পান গান্ধীজি৷ কেন এই নৃ্ত্যের অনুষ্ঠান জানতে পেরে বিড়লাকে সাহায্যের জন্য অনুরোধ করেন মহাত্মা৷ জিডি তাঁর নাম গোপন রেখে সেই সময়কালেই ৬০ হাজার টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করে দেন৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অনেক ব্যাপারেই জাতির জনক জিডি বিড়লাকে গুরুদায়িত্ব দিতে চাইতেন৷ এমনকী জিডি বিড়লাকে হরিজন সেবক সঙ্ঘের সভাপতিও করেছিলেন ৷

দেশজুড়ে স্বাধীনতা আন্দোলন চলাকালীন বহু সময়েই গান্ধীজি থাকতেন বিড়লাদের বাড়িতে৷ থাকাকালীন সেখানে অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরও আনাগোনা বাড়ত৷ চলত বৈঠক, আলাপ-আলোচনা৷ ১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন কর্মসূচি গান্ধীজি গ্রহণ করেছিলেন বম্বের বিড়লা হাউসে বসেই৷ সেই সময় অবশ্য ঘনশ্যামদাস বিড়লাকে ডেকে বাপুজি বলেছিলেন যে, গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার কারণে তিনি একটা বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চলেছেন৷ যার জন্য ব্রিটিশ পুলিশ বিড়লাদেরও হয়রান করতে পারে৷ তিনি সেটা চাইছেন না৷ তাই তিনি অন্যত্র গিয়ে এই আন্দোলন শুরু করতে ইচ্ছুক৷ জিডি বিড়লা জানিয়ে দেন, তিনি এর জন্য ভীত নন৷ বরং তিনি চান, বাপুজি এই বাড়ি থেকেই তাঁর আন্দোলন শুরু করুন৷ অতঃপর বম্বের বিড়লা হাউসেই ৮ অগস্ট আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয় ৷ পরের দিন ৯ অগস্ট বাপুজি-র জেল হয়৷

দিল্লিতে অবস্থিত গান্ধী স্মৃতি নামে যে মিউজিয়ামটি গড়ে উঠেছে সেটি এক সময় ছিল বিড়লা হাউস বা বিড়লা ভবন৷ এই বাড়িটিতেই জাতির জনক জীবনের শেষ ১৪৪টি দিন কাটিয়েছিলেন৷ ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি বিড়লা পরিবারের ওই ভবন চত্বরেই নাথুরাম গডসে-র গুলিতে মৃত্যু হয় মহাত্মার৷
ঘনশ্যামদাস বিড়লা বা তাঁর পরিবার শুধু যে গান্ধীজি-র সত্যাগ্রহ আন্দোলন ও ভারতের জাতীয় কংগ্রসের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এমন নয়, লালা লাজপত রায়, মদনমোহন মালব্য এবং হিন্দু মহাসভার পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন৷ এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত ইংরেজি দৈনিক The Leader বিড়লাদের সাহায্যেই চলত৷ পত্রিকাটি চালাতেন মদনমোহন মালব্য৷ তাছাড়া লালা লাজপত রায় মদনমোহন মালব্যের দল ইন্ডিপেনডেন্ট কংগ্রেস পার্টির প্রার্থী হয়ে ১৯২৬ সালে কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে জয়ী হন জিডি বিড়লা স্বয়ং৷ মতিলাল নেহরুর সঙ্গে মতভেদের দরুন লালা লাজপত রায়ের নেতৃত্বে ওই পার্টির জন্ম হয়েছিল৷

১৯৩০-এর দশক থেকেই মাড়োয়ারি ব্যবসাদারদের সঙ্গে হিন্দু মহাসভার যোগাযোগ বাড়তে থাকে৷ তার কারণ, ওই দশক থেকেই ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু-র মতো নেতাদের উত্থান ঘটতে শুরু করে৷ এই সময় পদ্মনাথ জৈন নামে এক মাড়োয়ারি বাংলায় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সম্পাদক হন৷ ১৯৩৯ সালে কলকাতায় বীর সাভারকারের সভাপতিত্বে ২৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বর সারা ভারত হিন্দু মহাসভার বার্ষিক অধিবেশন হয়৷ সেই সময় বাংলায় হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যিনি কিছুদিনের মধ্যেই সর্বভারতীয় সভাপতি হন৷ ওই সময় ঘনশ্যামদাসের বড় ভাই যুগলকিশোর বিড়লা, বদ্রিদাস গোয়েঙ্কা, বংশীধর জালান কানোরিয়া, খৈতান প্রমুখ মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী কলকাতায় মহাসভার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন৷ ওই সময় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের এই পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়নি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ-ও (আরএসএস)৷ কলকাতায় বিড়লাদের শিল্প বিদ্যালয়ে এদের কার্যালয় ছিল৷

এছাড়া ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার ঠিক পরেই, ৫ জুন বিএম বিড়লা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন৷ যদিও বাংলা ভাগের মাধ্যমে সেদিন স্বাধীনতা আসছিল ৷ নিন্দুকদের মতে, দেশভাগজনিত কারণে যখন বহু বাঙালি দুর্ভাবনা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল তখন রীতিমতো খুশি হয়ে উঠেছিল এই মাড়োয়ারি গোষ্ঠী৷ যদিও তাদের খুশির মূল কারণ ছিল বাপুজির নেতৃত্বে স্বাধীনতালাভ৷ পশ্চিমবঙ্গের আইনসভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কংগ্রেসের দলনেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য বিএম বিড়লা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কাছে অনুরোধ জানান৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন ঠিকই, আবার কংগ্রেসের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হননি৷ সে কারণেই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের কাছে বিএম বিড়লা ওই অনুরোধ জানাতে পেরেছিলেন৷

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার পর যখন প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করা হয় সেই সময় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রথমে শ্যামাপ্রসাদকে তাঁর মন্ত্রিসভায় নিতে রাজি হননি৷ মহাত্মা গান্ধী নির্দেশ এবং সর্দার প্যাটেলের আরজিতে তিনি শেষ পর্যন্ত রাজি হন ৷ অতঃপর শ্যামাপ্রসাদ হন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্পমন্ত্রী৷ গান্ধীজি ও সর্দার প্যাটেলের মতো শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও বিড়লাদের সম্পর্ক ছিল নিবিড়৷

তথ্য ঋণ
KK Birla: Brushes with history
বাংলা বিভাজনের রাজনীতি অর্থনীতি : সুনীতিকুমার ঘোষ

Advertisement ---
---
-----