রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় পৃথক দল গড়ছেন নারদে অভিযুক্তরা

বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: নতুন দল গঠনের পরিকল্পনা আগেই হয়েছিল৷ এ বার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা উসকে দিয়েছে সিবিআইয়ের তৎপরতা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি৷ যার জেরে, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে নারদকাণ্ডে অভিযুক্তরা পৃথক দল গড়তে চলেছেন বলে ফের চর্চা চলছে এখন খোদ ঘাসফুল শিবিরেরই বিভিন্ন অংশে৷

কিন্তু, নারদকাণ্ডে অভিযুক্তরা কেন তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গ ত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে? এক সূত্রের কথায়, ‘‘নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের নতুন দল গঠনের পরিকল্পনার পিছনে অন্যতম কারণ হিসাবে রয়েছে তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি৷ কারণ, দলের উপরে সারদাকাণ্ড সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি৷ কিন্তু, নারদ নিউজের ভিডিয়োর প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক৷’’ কেন সারদাকাণ্ড সেভাবে প্রভাব ফেলতে পারেনি? তা হলে কি, সারদাকাণ্ডে বিভিন্ন নথি-প্রমাণ নষ্ট করে দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই বিষয়টি মিথ্যা নয়? তার উপর, শুধুমাত্র সারদা গোষ্ঠীও নয়৷ রোজভ্যালি সহ অন্য বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির বিষয়টিও তো রয়েছে…৷

আরও পড়ুন: এফআইআর নাম নেই এমন এক সাংসদও নারদাকাণ্ডে ঘুষ নিয়েছিলেন

- Advertisement -

সারদাকাণ্ডে বিভিন্ন নথি-প্রমাণ নষ্ট করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও, ওই সূত্রের কথায়, ‘‘সারদাকাণ্ডে যে সব অভিযোগ উঠেছে, সাধারণ মানুষ সে সব দেখেননি৷ কিন্তু, নারদ নিউজের ভিডিয়ো ফুটেজ সাধারণ মানুষ দেখেছেন৷ শুধুমাত্র এই কারণেই সারদার তুলনায় নারদকাণ্ড মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে৷ তবে, নারদ নিউজের ভিডিয়ো যে সময় প্রকাশ্যে এসেছিল, সেই সময় পরিস্থিতি যেমন ছিল, এখন আর তেমন নেই৷ পরিস্থিতি এখন আরও কঠিন হয়েছে৷’’ একই সঙ্গে ওই সূত্র বলেন, ‘‘এই ধরনের পরিস্থিতিতে নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক জীবনের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে৷ যে কারণে, রাজনৈতিক জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিষয়টিই এখন নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ এই বিষয়ে ওই সূত্রের ব্যাখ্যা, ‘‘অভিযুক্তরা এমন বলতেই পারেন যে, নারদকাণ্ডে তাঁদের নামে অভিযোগ উঠেছে৷ এই ঘটনা সাজানো৷ কিন্তু, নারদ নিউজের ভিডিয়ো যাঁরা ভালো করে দেখেছেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া অস্বাভাবিক নয়৷’’

আরও পড়ুন: নারদে ঘুষ নিয়েছেন! বিজেপিতে যোগ দিলেন তৃণমূল সাংসদ ঘনিষ্ঠ শতাধিক মানুষ

একই সঙ্গে ওই সূত্র বলেন, ‘‘নারদকাণ্ডে তদন্ত চলছে৷ বিষয়টি এখন বিচারাধীন৷ আদালতের রায়ে অভিযুক্তরা শেষ পর্যন্ত নির্দোষ প্রমাণিত হবেন কি না, সেই বিষয়টি পরের কথা৷ কিন্তু, একবার যদি গ্রেফতারের পরে দীর্ঘ সময় জেল হেফাজতে রাখা হয় অভিযুক্তদের, তা হলে, পরবর্তী সময়ে জামিন মিললেও তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়বে৷ যে কারণে, রাজনৈতিক জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে, নারদকাণ্ডে অভিযুক্তরা যে এখন গ্রেফতারি এড়ানোর চেষ্টা করবেন না, তা কি হতে পারে?’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ এক সূত্রের কথায়, ‘‘নারদ নিউজের ভিডিয়োতে যেভাবে অভিযুক্তদের দেখা গিয়েছে, তা দলেরই অনেকে মেনে নিতে পারেননি৷ যেভাবে লাগাতার এবং দীর্ঘ আন্দোলনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক জমি শক্ত করেছে তৃণমূল কংগ্রেস, সেখানে এই ধরনের কাণ্ড দলেরই ক্ষতি করেছে৷ এই ঘটনায় দলনেত্রী প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ৷ গত বিধানসভা ভোটের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মনের কথাই বলে ফেলেছিলেন যে, আগে জানলে অভিযুক্তদের টিকিট দেওয়া হত না৷’’

আরও পড়ুন: নারদের স্টিংয়ে ঘুষ দেওয়ার ‘সহজ পাঠ’ ইকবালের

একই সঙ্গে ওই সূত্র বলেন, ‘‘পরিস্থিতি এখন আর গত বিধানসভা ভোটের সময়ের মতো নেই৷ নারদ নিউজের ভিডিয়ো জাল নয় বলে আদালত জানিয়েছে৷ সিবিআইয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে৷ নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের কয়েক জনের সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়েছে৷ আগামী দিনে অন্য অভিযুক্তদের ধীরে ধীরে দলে ব্রাত্য করে দেওয়া হবে৷’’ কিন্তু, পৃথক দল গঠন করলেই কি রাজনৈতিক জীবনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব? তার উপর, পৃথক দল গঠন করলে-ই-বা কীভাবে গ্রেফতারি এড়ানো যাবে? এক সূত্রের কথায়, ‘‘নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের কেউ সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিতে পারবেন না৷ কিন্তু, যদি তাঁরা পৃথক দল গঠন করেন, তা হলে বিজেপির সমর্থন পাওয়া তাঁদের পক্ষে অসম্ভব নয়৷ কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসকে ভেঙে দিতে চাইছে বিজেপি৷ এই ধরনের পরিস্থিতিতে নতুন দল গঠনের পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল৷ কিন্তু, সম্প্রতি সিবিআইয়ের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং কয়েকজন অভিযুক্তর সঙ্গে যেভাবে দলের দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তাতে পৃথক দল গঠনের পরিকল্পনা এ বার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে৷’’

আরও পড়ুন: হেডফোন পোর্টে সেলফি ক্যামেরা বসিয়ে হয়েছিল নারদা স্টিং অপারেশন

নারদকাণ্ডে অভিযুক্তরা পৃথক দল গঠন করলে, সেই দলকে কি সমর্থন করবে বিজেপি? এই বিষয়ে জানার জন্য রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষকে একাধিকবার ফোন কল করা হয়৷ তবে, তিনি ফোন কল না ধরায় তাঁর বক্তব্য মেলেনি৷এ দিকে, এক সূত্রের কথায়, ‘‘নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের তালিকায় প্রথম এবং দ্বিতীয় নম্বরে যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁদের কিন্তু সিবিআই এখনও তলব করেনি৷ আর, ন্যাশনালিস্ট তৃণমূল কংগ্রেস দলটির অস্তিত্বও কিন্তু এখনও রয়েছে৷’’ শুধুমাত্র তাই নয়৷ একই সঙ্গে ওই সূত্র বলেন, ‘‘সারদা এবং নারদকাণ্ডে অভিযুক্ত প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে কিন্তু আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করার কথা বলেছেন৷ আগামী নভেম্বর মাসের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে যাওয়ার ইঙ্গিতও তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে দিয়েছেন৷ আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচন৷ যে কারণে, নতুন দল গঠনের জন্য এই নভেম্বর মাসের মধ্যে সময়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷’’

আরও পড়ুন: নারদ কাণ্ড: এখনও গ্রেফতার হয়নি কেউ , এটাই ভরসা অভিযুক্ত নেতাদের

কিন্তু, নারদকাণ্ডে সব অভিযুক্তই কি পরিকল্পনা অনুযায়ী পৃথক দলে যোগদান করতে চলেছেন? এক সূত্রের কথায়, ‘‘নতুন দল গঠনের এই পরিকল্পনায় নারদকাণ্ডে অভিযুক্তরা সকলেই ছিলেন৷ তবে, কেউ যেমন এখনও পরিস্থিতির উপর নজর রেখে জল মেপে চলেছেন৷ তেমনই কেউ আবার সম্প্রতি নতুন দলে না যাওয়ার কথাও ভেবেছেন৷’’ একই সঙ্গে ওই সূত্র বলেন, ‘‘তৃণমূল কংগ্রেসের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে নারদকাণ্ডে অভিযুক্তদের কারও কারও শিবিরের অনেকেই পরিকল্পিত নতুন দলে যোগ দিতে চলেছেন৷’’

আরও পড়ুন: নারদ-আবহে দলীয় নির্ধারিত বৈঠক বাতিলে ঘাসফুল বাগানে সন্দেহের বাতাবরণ

Advertisement
---