কলকাতা: ৮৯ বছরে প্রয়াত হলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। ৪০ বছরের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যা রেখে গেলেন, আজকের তরুণ নেতাদের কাছে তা পাথেয় হয়ে থাকবে।

বর্ধমান, যাদবপুর ও বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রের ১০ বারের সাংসদ একসময় বলেছিলেন, ‘লোকসভার অধ্যক্ষ হিসেবে আমার নিজের উপর সম্পূর্ণ আস্থা আছে। যখন অধ্যক্ষের চেয়ারে বসেছি, আমার ভূমিকা নিয়ে যাতে কারও কোনও প্রশ্ন বা সন্দেহ না জাগে সেবিষয়ে আমি সদা সতর্ক থাকি।”

Advertisement

দক্ষিণ কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে সোমবার সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন লোকসভার প্রাক্তন এই অধ্যক্ষ। সোমনাথ বাবু এমন একজন অধ্যক্ষ ছিলেন, যিনি দলমত নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের থেকে সম্মান এবং ভালবাসা পেয়েছেন। যার উদাহরণ, একজন বামপন্থী চরিত্র হিসেবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব বেশি নেই। স্বচ্ছতা এবং লৌহকঠিন মানসিকতা তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল। আর ওই মানসিকতার জন্যই ২০০৮ সালে সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত হন সোমনাথ বাবু।

আজ তিনি পরলোকগমন করার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে যাঁরা চর্চা করছেন, তাঁরা হয় খুঁজে পাবেন সোমনাথ বাবুর নামের শুরু থেকে ২০০৮ সালেই কমরেড শব্দটি খসে পড়লেও আমৃত্যু তিনি একজন কমরেড হিসেবে বেঁচে ছিলেন। কয়েক বছর আগেই বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সূর্যকান্ত মিশ্রের মত বামপন্থী নেতারা সোমনাথ বাবুকে দলে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজি হননি সোমনাথ।

লোকসভার ১৪ তম অধ্যক্ষ হিসেবে ২০০৪ সালের ৪ জুন স্থলাভিষিক্ত হন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। ত!আর অধ্যক্ষ হওয়ার পিছনে কংগ্রেসের তৎকালীন সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এবং ইউপিএ সরকারের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। লোকসভার অন্দরেই ১৭ জন অন্যান্য দলের সাংসদ সোমনাথ বাবুকে সমর্থন করেছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০০৯ লোকসভার অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি।

যেদিন পার্টি থেকে বহিস্কৃত হন, বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের সবথেকে দুঃখজনক দিন হল আজ। ২২ জুলাই, ২০০৮ সাল, ইউপিএ সরকারের অস্তিত্ব রক্ষার আস্থা ভোট সংসদে। সিপিএম ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইউপিএ-র বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য সিপিএমের সাংসদদের যে তালিকা তৈরি হয়েছিল, সেখানে নাম ছিল সোমনাথ বাবুর। পার্টির নেতারা ভেবে দেখেননি সংসদের অধ্যক্ষ হিসেবে, একজন সাংসদ হলেও, সোমনাথ বাবুর অবস্থান নিরপেক্ষ। সোমনাথ বাবুকে অধ্যক্ষের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বলা হয়।

সেইসময় সিপিএমের সংসদীয় দলের নেতা বাসুদেব আচারিয়া সোমনাথ বাবুকে তাঁর অবস্থান প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করতে যান অধ্যক্ষের বাসভবনে। বাসুদেব বাবুর সামনেই সোমনাথ বাবু প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ফোন করে বলেন, ”আমাকে অধ্যক্ষের পদ ছেড়ে দিতে হবে, আপনারা বিকল্প দেখুন।” পরে অবশ্য অধ্যক্ষের পদ ছাড়েননি সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। ইউপিএ-র বিরুদ্ধে ভোটও দেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, ইউপিএ-র বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অর্থ বিজেপির হাত শক্ত করা।

নিজের রাজনৈতিক গুরু জ্যোতি বসুর পরামর্শ ছিল, অধ্য়ক্ষের পদেই বহাল থাকুন সোমনাথ বাবু৷ শেষ পর্যন্ত তিনি গুরুর পরামর্শই মেনে নিয়েছিলেন৷ ১৯৬৮ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সিপিএমের সদস্য ছিলেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। বাম সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসেবে বর্ধমান কেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সালে জিতে সংসদে আসেন তিনি। এরপর ওই কেন্দ্রের রেকর্ড ১০ বার পরপর জেতেন সোমনাথ বাবু। তবে মাঝে ১৯৮৪ সালে প্রবল ইন্দিরা হাওয়ায় যাদবপুর কেন্দ্র থেকে কংগ্রেস প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এরে যান সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। জীবনে ওই একবারই হেরেছিলেন। তবে, নীতি, আদর্শ বজায় রেখে বিরোধী মতামতের বিরুদ্ধে কখনও হারেননি সোমনাথ বাবু।

১৯৮৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত সিপিএমের সংসদীয় দলের নেতা ছিলেন তিনি। ২০০৮ সালে তাঁকে সিপিএম বহিষ্কার করার পর বীরভূমের কংগ্রেস নেতা অসিত মাল বলেছিলেন, বীরভূমের সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় বেদনাহত। যেভাবে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হল, তা দলমত নির্বিশেষে মানুষের মনে প্রভাব ফেলেছে। আদ্যোপান্ত ফুটবল পাগল সোমনাথ বাবু লিওনেল মেসির অনুরাগী। রাশিয়া বিশ্বকাপে মেসির প্রতিপক্ষ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর খেলা দেখে কলকাতার একটি সংবাদপত্রকে তিনি বলেছিলেন, ”রোনাল্ডো বড় অহঙ্কারী।” একজন রবীন্দ্র সাহিত্য অনুরাগী নিজের পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আইনজীবী ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পা করার পর কেমব্রিজের জেসাস কলেজে পড়াশোনা শেষ করেন সোমনাথ বাবু।

নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে সম্প্রতি বলেছিলেন, ”ভাল অভিনেতা এবং নির্মম অভিনেতা। ১৯৯৬ সালে সংসদে অসাধারণ ভূমিকা নেওয়ার জন্য পার্লামেন্টারি অ্যাওয়ার্ড পান ‘বামনেতা’ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়।

----
--