লালদুর্গের সিপিএম পার্টি অফিস এখন ‘ভূতুড়ে বাড়ি’

আগাছায় ঢাকা সিপিএম দফতর ছবি- মিতুল দাস

কৌশিক সিনহা, সুমন বটব্যাল, জঙ্গলমহল: ঝাঁ চকচকে রাজ্য সড়কের ধারে দো-তলা ভবনটা যেন ভূতুড়ে বাড়ি৷ বাড়ির বাসিন্দারা দীর্ঘদিন বেপাত্তা থাকায় রাতের আঁধারে কে বা কারা খুলে নিয়ে গিয়েছে দরজা, জানালা৷ দীর্ঘদিন ব্যবহারের অভাবে বাড়ির সামনে বেশ বড় আগাছা গজিয়ে উঠেছে৷ ইতি উতি পড়ে রয়েছে আর্বজনার স্তুপ৷ ভেতরে ঢুকতে চোখে পড়ল দেওয়ালে দেওয়ালে ঝুল জমেছে৷ নিচের মেঝেতে ধুলোর স্তুপের আস্তরণ৷ দোতলার অবস্থাও তথৈবচ৷

সাত বছর পিছিয়ে গেলে, তখনও এই বাড়ি শাসন করত এলাকাকে৷ এলাকায় কে থাকবেন, আর কে থাকবেন না, তাঁরা কোন দল করবেন- সবই ঠিক করবেন এই বাড়ির বাসিন্দারা৷ পরিবর্তনের বাংলায় যা ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে৷ ঠিকই ধরেছেন, এটা সিপিএমের পার্টি অফিস৷ অকুস্থল, মেদিনীপুর শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরের মনিদহ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার এনায়েতপুর৷

সেইদিনের পার্টি অফিস- সুত্র-গুগুল

এই বাড়ির আরও একটা ইতিহাস রয়েছে৷ তখন মাওবাদী তাণ্ডবে জঙ্গলমহল উত্তপ্ত৷ অভিযোগ, মাও খেদাতে জঙ্গলমহলের সর্বপ্রথম ‘হার্মাদ’ (সিপিএমের সশস্ত্র বাহিনী) ক্যাম্পটি গড়ে উঠেছিল এই বাড়িতেই৷ যার জেরে ২০০৯ সালের নভেম্বরের এক রাতে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে জঙ্গলপথে এই বাড়িকে ঘিরে ফেলেছিলেন স্বয়ং মাওবাদী নেতা মাল্লেজুল্লা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজি৷

পিচ রাস্তার উল্টোদিকে একসময় ছিল ক্রংক্রিটের হাট৷ তার পাঁচিলের পিছন থেকেই পার্টি অফিস লক্ষ্য করে চলছিল কয়েক হাজার রাউন্ড গুলি৷ পাল্টা হিসেবে পার্টি অফিসের দো-তলায় গড়ে তোলা বাঙ্কার থেকেও লাগাতার পাল্টা গুলি চালিয়েছিল ‘হার্মাদ’ বাহিনী৷ অসমর্থিত সূত্রের খবর, রাতের অন্ধকারে গুলির লড়াইয়ের দু’পক্ষেরই বেশ কয়েকজন হতা-হত হয়েছিলেন৷ রাত দেড়টা নাগাদ গুলি থামার পর প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পুলিশের সঙ্গে হেঁটে এলাকায় ঢুকেছিল সংবাদ মাধ্যম৷ পার্টি অফিসে প্রবেশের ছাড়পত্র মেলেনি৷ তবে মিলেছিল রক্তের দাগ, অজস্র গুলির খোল৷

রাজনৈতিক মহলের মতে, সিপিএমের এনায়েতপুর জোনাল  কমিটি অফিস সেসময় কি ধরণের উন্নত অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছিল যে কিষেণজির মতো মাও নেতা স্বয়ং পার্টি অফিসের কাছে পৌঁছেও তার ঘেঁষতে পারেননি৷ বরং, গুলির লড়াইয়ে একরকম হার মেনেই বাহিনী নিয়ে সরে পড়তে হয়েছিল তাকে৷ তবে সংবাদমাধ্যমকে টেলিফোনে কিষেণজি দাবি করেছিলেন, ‘‘দীপক সরকারের (তৎকালীন সিপিএমের জেলা সম্পাদক, বর্তমানে রাজ্য সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য) দুর্গে লাশের পাহাড় তৈরি করে দিয়েছি৷ আপনারা এসে দেখে যান৷’’

বলার অপেক্ষা রাখে না, সেসময় সিপিএম নেতারা রসিকতা করে বলতেন- আমাদের জেলার গাছ পাতাও সিপিএম৷ বিরোধীহীন এই জেলায় সিপিএমের দাপট ছিল ইর্ষণীয়৷ এখন সেখানে সিপিএমের হাল কেমন, কেমনই বা রয়েছেন পার্টি কর্মীরা তা জানতে kolkata 24×7.com গিয়েছিল মেদিনীপুর সদর শহর লাগোয়া মণিদহে কি দেখলাম, তা তো শুরুতেই বর্ণনা করেছি৷

সংবাদমাধ্যমের গাড়ি দেখে এগিয়ে এলেন স্থানীয় কিছু কৌতুহলী মানুষ৷ তাঁরা জানালেন, পালা বদলের আগে পর্যন্ত এই পার্টি অফিসের দাপট কেমন ছিল৷ তাঁদের কথায়, ‘‘সবসময় আতঙ্কে থাকতে হত৷ এই বুঝি ওই পার্টি অফিসের বাসিন্দাদের ফতোয়ার মুখে পড়তে হয়৷ মিটিং, মিছিলে না গেলে বন্ধ হয়ে যেত মুদিখানায় জিনিস কেনা থেকে শুরু করে পুকুরে স্থান করা৷’’ বাসিন্দারা জানালেন, এখন সে সব ইতিহাস৷ পরিবর্তনের পর এই পার্টি অফিসে ‘শাসকদল’ একবার হামলা চালায়৷ তারপর থেকে পার্টি অফিসে দেখা মেলেনি কোনও কমরেডের৷ তার বদলে রাতের অন্ধকারে সেখানে বসে মদ-জুয়ার আড্ডা৷ চলে অসামাজিক কার্যকলাপ৷

নাম প্রকাশ করব না এই শর্তে বাসিন্দাদের কেউ কেউ একথাও জানালেন, ‘‘তখন সিপিএম ছিল, এখন তৃণমূল৷ আমাদের অবস্থা একই রয়ে গিয়েছে৷ তখন ওদের মিছিলে হাঁটতাম, এখন এদের মিছিলে!’’ শুধু মণিদহ নয়, ওই পথ ধরে ধেড়ুয়া, ঝাড়গ্রাম হয়ে বেলপাহাড়ি  ‘কলকাতা এক্সপ্রেস’ যত এগিয়েছে ততই দেখা মিলেছে সিপিএমের একের পর এক বন্ধ পার্টি অফিস৷ পথে ঘাটে কোথাও দেখা মেলেনি লাল পতাকার৷ দেখলে বোঝা দায়, এই জেলায় এক সময় পুলিশ-প্রশাসন নয়, সিপিএমই ছিল শেষ কথা৷

বিরোধী শূন্য জেলায় এবারের ত্রিস্তরে সিপিএমের মনোনয়ন জমা দেওয়ার চিত্র থেকেই স্পষ্ট জেলায় সংগঠন ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু৷ গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদে মোট আসন সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৪০, ৬১১ এবং ৫১টি৷ তিনটি স্তরে সিপিএম যথাক্রমে প্রার্থী দিতে পেরেছে ৭৮২, ২৮৫ ও ৫২টি৷ অন্যদিকে ক’বছর আগে এই জেলায় বিজেপির কোনও অস্তিত্বই ছিল না৷ অথচ সেই বিজেপি যে এবারে এই জেলায় সিপিএমকে টপকে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, তা পঞ্চায়েতে তাঁদের মনোনয়নের পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট৷ তিনটিস্তরে বিজেপি যথাক্রমে মনোনয়ন জমা দিয়েছে ১হাজার ৭৬৭, ৪১৯ ও ৫২ টি আসনে৷

শুধু তা নয়, যে কেশপুর, গড়বেতা-১, পিংলা ব্লক সিপিএমের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল সেখানে সিপিএম তো বটেই বিরোধীরা এবারের নির্বাচনে দাঁতই ফোটাতে পারেনি৷ তিনটি পঞ্চায়েত সমিতি ভোটের আগেই বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জয়ী হয়েছে তৃণমূল৷ কেন এই হাল? সিপিএমের জেলা সম্পাদক তরুণ রায় বলছেন, ‘‘আপনারা তো দেখছেন-শাসকদলের অত্যাচার৷ ওরা গায়ের জোরে গণতন্ত্রের গলা টিপতে চাইছে৷ ফলে বহু আসনে যেমন প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হয়নি, তেমনি ওদের লাগাতার সন্ত্রাসে আমাদের বহু পার্টি অফিস দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে৷’’

যা শুনে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সভাপতি অজিত মাইতি৷ তিনি বলছেন, ‘‘ওদের মুখে সন্ত্রাসের অভিযোগ মানায় না৷ পশ্চিম মেদিনীপুরের মানুষ দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে দেখেছে ওদের অত্যাচারের নমুণা৷’’ মনে করিয়ে দিয়েছেন ছোট আঙারিয়া, নেতাই গণহত্যার ঘটনা৷ বলেছেন, ‘‘সিপিএম এত পাপ করেছে যে মানুষ ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে৷ ফলে ওদের নেতারা তো দলটাকে বিজেপির কাছে বন্ধক দিয়ে দিয়েছে৷ তাই তো এ জেলায় বিজেপির কিছু বাড়বাড়ন্ত৷ তা না হলে বিজেপি এখানে দাঁতই ফোটাতে পারত না৷’’

একসময়ের দাপুটে বাড়ি এখ ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত৷ অদূরে বয়ে চলা কংসাবতী নদীটা যার উত্থান থেকে পতন প্রতি মুহূর্তের সাক্ষী থেকেছে৷

 

Advertisement
----
-----