এক গুলিতেই শেষ ৩০ বছরের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন

মানব গুহ, কলকাতা: একদমই তাই৷ এক গুলিতেই শেষ ৩০ বছরের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন৷ রাজ্য ভাগ আটকানোর লড়াইয়ে শহীদ পুলিশের সাব ইন্সপেক্টার অমিতাভ মালিক৷ দার্জিলিংয়ে সাহসী এই পুলিশ অফিসারের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারের সঙ্গে চোখের জল ফেলেছে গোটা রাজ্যই৷ কিন্তু শোকের দিনে সত্যি এটাই, বন্দুকের গুলি দিয়ে না পারলেও নিজে শহীদ হয়ে এক পুলিশ অফিসার এক লহমায় থামিয়ে দিয়েছেন গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকে৷ রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্যকে স্বস্তি দিয়ে বিমল গুরুংয়ের হঠকারী আন্দোলন শেষ করে দিয়েছে ৩ দশকের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকেই৷

আরও পড়ুন: হাসতে থাকা রক্তাক্ত পাহাড়ে এত মৃত্যুর দায় কার ?

মারা গিয়েছেন পুলিশকর্মী অমিতাভ মালিক৷ শেষ হয়ে গিয়েছে একটা সংসার, একটা পরিবার৷ এক বুলেটেই সব স্বপ্নের পরিসমাপ্তি৷ কিন্তু একটি মৃত্যু চোখ খুলে দিয়েছে পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলির৷ চোখ খুলে সত্যি বুঝতে পেরেছেন পাহাড়বাসীও৷ গুরুংয়ের হঠকারী আন্দোলন থেকে সরে গেছে সমস্ত সমর্থন৷ শুক্রবারের মর্মান্তিক ঘটনার পর শনিবার তাই স্বাভাবিক পাহাড়৷ কোথাও নেই বিমল গুরুং ও তার মোর্চার রক্তচক্ষু৷ উড়ে গেছে গোর্খাল্যান্ডের দাবীতে আন্দোলন৷ রাজ্যকে স্বস্তি দিয়ে আপাতত: ঠান্ডা ঘরে সুভাষ ঘিসিংয়ের হাত ধরে উঠে আসা ‘অপরাধী’ গুরুংয়ের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন৷

- Advertisement -

সুভাষ ঘিসিংয়ের হাত ধরে ৮০ র দশকে পাহাড়ে শুরু হয় গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন৷ ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল৷ সুভাষ ঘিসিং এর নেতৃত্বে গোর্খা ন্যাশান্যাল লিবারেশন ফ্রন্ট বা GNLF, পৃথক গোর্খাল্যান্ডের জন্য পাহাড়ে আন্দোলন শুরু করে৷ বনধ, অবরোধ, হিংসা, রক্তপাতের সেই শুরু৷ ভয়ংকর আন্দোলনে ২ বছরে মারা যান কয়েকশো মানুষ৷

পাহাড়ে অশান্তি থামাতে জ্যোতি বসুর উদ্যোগে ভারত সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও সুভাষ ঘিসিং এর গোর্খা ন্যাশান্যাল লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়৷ ১৯৮৮ সালের ২২ আগষ্ট কলকাতার রাজভবনে মাথা তোলে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল৷ তৈরি হলো ‘দি দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল অ্যাক্ট ১৯৮৮’৷ তারপর, ১৯৮৮ থেকে ২০০৭, পাহাড়ে রাজত্ব করলেন সুভাষ ঘিসিং৷

বামেরাও চায় নি গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন আর মাথা চাড়া দিক৷ কিন্তু, দীর্ঘ ২০ বছরে মাঝে মাঝেই পাহাড়ে আগুন জ্বলেছে, আন্দোলন হয়েছে৷ কিন্তু খুব সোজা ভাবে বলতে গেলে সবটাই হয়েছে নিজস্ব দাবী আদায়ের জন্য৷ ১৯৮৮ থেকে ২০০৭, টানা ৩টি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জিতলেন সুভাষ ঘিসিং৷

কিন্তু, সময় সবসময় এক যায় না৷ ‘সুভাষ ঘিসিং বিরোধী’দের অস্তিত্ব টের পয়ে ২০০৫ এ দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল নির্বাচন বাতিল করে দেয় বামফ্রন্ট৷ বিরোধীদের দাবী উড়িয়ে দিয়ে সুভাষ ঘিসিংকে কেয়ারটেকার করে শুরু হয় নতুন গোর্খা হিল কাউন্সিলের পথ চলা৷ কিন্তু এই সুখ দীর্ঘদিন স্থায়ী হল না ঘিসিং এর৷ ২০০৭ এ আবার শুরু হল গোর্খাল্যান্ডকে সামনে রেখে আন্দোলন৷ এবার নেতৃত্বে বিমল গুরুং ও তার গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা৷

২০০৮ এর মার্চে সরতেই হলো ঘিসিংকে৷ ততদিনে তার ও তার আত্মীয়দের সম্পত্তির পরিমাণ দেখে চোখ কপালে উঠেছে সবারই৷ ঘিসিং সরার পর পাহাড়ে উঠে এলো নতুন মুখ বিমল গুরুং৷ এরপরই শুরু হলো গুরুং এর নেতৃত্বে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার লড়াই৷ ফের উত্তপ্ত পাহাড়৷ ৩ বছর ধরে আবার লড়াই৷ ফের সেই চেনা গোর্খাল্যান্ডের ডাক৷ এবার গুরুং এর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতৃত্বে৷

এর মধ্যে রাজ্যে হয়ে গেছে পট পরিবর্তন৷ বাম থেকে ক্ষমতায় এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরেই বাতিল হলো গোর্খা হিল কাউন্সিল৷ বাতিল হলো সব কিছুই৷ মাথা তুলে দাঁড়ালো গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনেস্ট্রেশন৷

সুভাষ ঘিসিং এর মুকুট এবার বিমল গুরুং এর মাথায়৷ ২০১১ সালের ১৮ জুলাই, দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল অ্যাক্ট বাতিল হয়ে পাহাড়ে মাথা তুললো গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ৷ ২০১২ তে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনেস্ট্রেশন নির্বাচনে ৪৫ টা আসনেই জয় পায় বিমল গুরুং এর গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা৷

পাহাড় আবার হাসলো৷ কিন্তু ৫ বছর পরই ২০১৭ এ তে এসে আবার কাঁদছে পাহাড়৷ জ্বলছে পাহাড়৷ বাম আমলে যেগুলো কোনদিন হয় নি ঠিক সেইগুলোই হতে শুরু করলো ২০১৬ তে দ্বিতীয়বার তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পরে৷ বারবার পাহাড়ে যেতে শুরু করলেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান৷ ২০১৬ থেকে ২০১৭ এই এক বছরে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতবার পাহাড়ে গেছেন, ৩৪ বছরের বাম রাজত্বে রাজ্যের সবমন্ত্রী সবমিলিয়েও এতবার পাহাড়ে যান নি৷

পাহাড়ে পুরভোটে শুধু সমতলের প্রথম দল হিসাবে আসন জিতে খাতা খোলাই নয়, একটি পুরসভা দখল করে বসলো তৃণমূল কংগ্রেস৷ মিরিক পুরসভা বিমল গুরুং এর দলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল রাজ্যের শাসকদল৷ দার্জিলিং এ একটি আসনে জিতে খাতা খুললো ঘাসফুল৷ কার্শিয়াং, কালিম্পং এও খাতা খুলল তৃণমূল৷ যা ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করা বামেরা কোনদিন ভাবতেই পারে নি৷ টাকা পয়সার হিসাব চাওয়া শুরু করল মমতা সরকার, যেটাও আগে হয় নি৷ বিপদ দেখেই ফের মাথাচাড়া দিল গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন৷

ইতিমধ্যেই ঠিক সুভাষ ঘিসিংয়ের মতই, বিমল গুরুং ও মোর্চা নেতাদের সম্পত্তির পরিমাণ দেখে চোখ ছানাবড়া পাহাড়বাসির৷ তবুও ইস্যু গোর্খাল্যান্ড বলেই এবারও পাহাড়বাসী প্রথমদিকে গুরুংয়ের সঙ্গেই ছিল৷ কিন্তু প্রায় ১০০ দিনের আন্দোলনের শেষের দিকে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন পাহাড়বাসী৷ আর শুক্রবার একটি গুলি আপাতত: শেষ করে দিয়েছে সমস্ত পাহাড়বাসীর স্বপ্ন৷

জঙ্গলমহলের মাওবাদীদেরও প্রথমদিকে সমর্থন করেছিলেন সাধারণ মানুষ৷ অনুন্নয়ন ও বঞ্চনার হিসাব নিতে মাওবাদীদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন জঙ্গলমহলের বাসিন্দারা৷ কিন্তু, কয়েক বছর পরেই বন্দুকের গুলি, রক্তপাত ও খুনের রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন তাঁরা৷

ঠিক সেই ভাবেই বিমল গুরুংয়ের গোর্খাল্যান্ড আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন পাহাড়বাসী৷ পুলিশ অফিসার অমিতাভ মালিকের হত্যার ঘটনায় সমর্থন নেই পাহাড়বাসীর৷ গুরুং থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তাঁরা৷ গুরুং গ্রেফতার হলে বা কিষানজির মত পুলিশের সঙ্গে লড়াইয়ে মারা গেলেই গোর্খাল্যান্ড শব্দটা আপাতত: হিমঘরে চলে যাবে৷

তবে, আশঙ্কার কালো মেঘ কিন্তু থেকেই যাবে৷ সুভাষ ঘিসিং, বিমল গুরুংদের নেতা থেকে পাহাড়ের একচ্ছত্র রাজা বানিয়ে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ গড়ে তোলার পিছনে রাজ্যের রাজ্য সরকারদের ভূমিকাই বিরাট৷ এখন কাছের লোক বিনয় তামাং যে, সরকারের প্রশ্রয় পেয়ে পাহাড়ের রাজা হয়ে ফের গোর্খাল্যান্ড নিয়ে আন্দোলন শুরু করবেন না, এই গ্যারান্টি কে দেবে ???

Advertisement
---