একদিন রাত আড়াইটায় তড়িঘড়ি আব্দুল কালামকে ডেকে পাঠালেন বাজপেয়ী

তন্নিষ্ঠা ভাণ্ডারী: ১১ মে, ১৯৯৮। তড়িঘড়ি প্রেস কনফারেন্স ৭ নম্বর রেস কোর্স রোডের লনে। পোডিয়ামের সামনে এসে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। তাঁর দিকে তাক করে আছে সংবাদমাধ্যমের একগুচ্ছ ক্যামেরা। একটা সংক্ষিপ্ত ঘোষণা। আর তাতেই চমকে গেল গোটা বিশ্ব। ”দুপুর ৩টে ৪৫ মিনিটে তিনটে আন্ডারগ্রাউন্ড নিউক্লিয়ার টেস্ট করেছে ভারত।”

কড়া নজর রেখেও ভারতের সেদিনের পরমাণু পরীক্ষা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি আমেরিকা। এতটাই সন্তর্পণে হয়েছিল সেই কাজ। ৫ নম্বর রেসকোর্স রোডের ঘরে রুদ্ধশ্বাস কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েছিলেন বাজপেয়ী ও তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও অফিসার। সাফল্যের খবর আসতেই কারও ঠোঁটে হাসি, কারও চোখে জল। কিন্তু বাজপেয়ী ফেললেন স্বস্তির নিশ্বাস। দেশকে সুরক্ষিত করতে পেরেছেন, দায়িত্ব পালন আর দেশবাসীর বিশ্বাস রাখার এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া কাজ করেছিল তাঁর মধ্যে। তিনি যেন সেদিন অনেকটাই নিশ্চিন্ত হলেন।

- Advertisement -

শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৬ তেই। বাজপেয়ীর ব্যক্তিগত সচিব শক্তি সিনহা পরে লিখেছেন সেই অভিজ্ঞতার কথা। সদ্য ক্ষমতায় এসেছে বাজপেয়ী সরকার। হঠাৎ এক রাতে বাজপেয়ী তাঁর এই সচিবকে ডেকে বললেন, ”কালাম কোথায়, ওকে খুঁজে বের কর।” কলকাতায় ডিআরডিও-র এক গেস্ট হাউসে ছিলেন পরবর্তীকালের রাষ্ট্রপতি তথা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী এপিজে আব্দুল কালাম। রাত আড়াইটায় তাঁর কাছে ফোন যায়। পরের দিন সকালের প্রথম ফ্লাইটে দিল্লি আসতে বলা হয় তাঁকে। কিন্তু সেবার ১৩ দিনেই পড়ে যায় বাজপেয়ী নেতৃত্বাধীন সরকার। ফলে পরমাণু পরীক্ষার সময় পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন: করিমের হাতের কোর্মায় মজতেন ব্রাহ্মণ সন্তান বাজপেয়ী

১৯৯৮ তে ফের ক্ষমতায় আসেন বাজপেয়ী। শুরু হয় সেই অসম্পূর্ণ কাজ। অনেকেই হয়ত জানেন না, আসলে ৭ নম্বর রেস কোর্স রোড নয়, ৫ অথবা ৩ নম্বর রেসকোর্স রোডেই থাকতে হয় প্রধানমন্ত্রী। ৭ নম্বরটা শুধুই অফিস। বাজপেয়ী থাকতেন ৩ নম্বরে। আর পোখরানের পরীক্ষার আগে কার্যত ওয়াররুম তৈরি করা হয়েছিল ৩ নম্বর রেসকোর্স রোডকে। সেখান থেকে পোখরানে সরাসরি যোগাযোগ করার ব্যবস্থা ছিল।

১১ মে। সামনে লম্বা টেবিল। মুখোমুখি বসে আছেন বাজপেয়ী, আদবাণী, জর্জ ফার্নান্ডেজ, যশবন্ত সিং, ব্রজেশ মিশ্র, প্রমোদ মহাজন ও ব্যক্তিগত সচিব শক্তি সিনহা। প্রহর কাটছে, কথা বলছেন না কেউ। অবশেষে খবরটা এল। প্রত্যেকেই মুখেই তখন ‘আমরা পেরেছি’ গোছের আত্মবিশ্বাসে ছাপ। প্রমোদ মহাজনই প্রেস কনফারেন্সের আইডিয়াটা দিয়েছিলেন। তিন লাইনের ব্রিফ তৈরি করে দেন সচিব শক্তি সিনহা।

আরও পড়ুন: গান্ধীজির ‘ভারত ছাড়ো’ থেকেই যাত্রা শুরু বাজপেয়ীর!

পোখরান আর বাজপেয়ীর প্রতিক্রিয়ার বর্ণনা দিতে গিয়ে শক্তি সিনহা বলেছিলেন, ”অনেকেই হয়ত সমালোচনা করেন। তবে তাঁরা জানেন না যে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা বাজপেয়ী কোনও স্লোগান বা প্রচারের জন্য করেননি। দেশবাসীর বিশ্বাস অর্জন আর সুরক্ষা দেওয়াটাই ছিল তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য।

তবে বাজপেয়ী পরে জানিয়েছিলেন, আসলে নাকি সরঞ্জাম তৈরি করে রেখেছিলেন নরসিমা রাও। তিনি বাজপেয়ীকে বলে গিয়েছিলেন, ”সব তৈরি আছে। তুমি এগিয়ে যাও।” আমেরিকার স্যাটেলাইটের নজরদারি এড়িয়ে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা সফল করতে পারেননি নরসিমা রাও। প্রস্তুতি শুরু হতেই জেনে গিয়েছিল আমেরিকা। মার্কিন সংবাদপত্রে ফাঁস হয়ে গিয়েছিল সেই খবর। এরপরই বাধা আসে আমেরিকার তরফ থেকে।

আরও পড়ুন: ১৩ দিনের সরকার থেকে সড়ক যোজনা: নজরে বাজপেয়ীর কৃতিত্ব

বাজপেয়ী সরকারের আমলে আমেরিকাকে কার্যত বোকা বানিয়ে সফল পরীক্ষা সেরে ফেলে ভারত। রাতের অন্ধকারে ট্রাকে চাপিয়ে পরমাণু পরীক্ষার সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ভোরের আলো ফোটার আগে সে সব লুকিয়ে ফেলা হত। মাটি খোঁড়ার জন্য ব্যবহৃত ড্রিল মেশিন সকাল হওয়ার আগে পোখরান থেকে সরিয়ে দেওয়া হত। মরুভূমির বুকে বিছিয়ে থাকা বৈদ্যুতিক তারগুলিকে গুল্ম জাতীয় গাছ দিয়ে ঢেকে রাখা হত। এপিজে আবদুল কালাম সেখানে যখনই যেতেন, সেনার পোশাক পরে যেতেন এবং বাহিনীর সঙ্গে একা যেতেন, অন্য কোনও বিজ্ঞানীকে সঙ্গে নিতেন না। অবশেষে ১৯৯৮ সালের ১১ মে। ভারত পাঁচটা পরমাণু বোমা ফাটিয়ে দেয় পোখরানে। সেই বিপুল বিস্ফোরণ ঘুম ভাঙে সিআইএ-র। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে।

Advertisement ---
-----