প্রতীকী ছবি

সুমন বটব্যাল ও দেবযানী সরকার, কলকাতা: অবশেষে পঞ্চায়েত ভোটের দামামা বাজিয়ে দিল কমিশন৷ নির্ধারিত সময়ের প্রায় আড়াই মাস আগেই হতে চলেছে পঞ্চায়েত ভোট৷ স্বভাবতই, শনিবাসরীয় বিকেল থেকেই প্রার্থীপদ পাওয়ার হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গিয়েছে শাসকের অন্দরে৷

কারণ, মনোনয়ন পত্র তোলা ও জমা দেওয়ার কাজ শুরু হবে ২এপ্রিল থেকে৷ শেষ তারিখ ৯ এপ্রিল৷ অর্থাৎ হাতে মাত্র ন’দিন৷ স্বভাবতই রাজ্যের জেলায় জেলায় ব্লকে ব্লকে ‘কে বা প্রাণ, আগে করিবেক দানে’র ন্যায় প্রার্থী পদ পেতে শাসকদলের অন্দরে শুরু হয়ে গিয়েছে জোর প্রতিযোগিতা৷ যে যাঁর এলাকায় নিজের মতো করে ‘হট লাইনে’ প্রার্থীপদ ছিনিয়ে নিতে মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছেন৷ একান্ত আলাপ চারিতায় নেতৃত্বরা সেকথা মেনেও নিচ্ছেন৷

Advertisement

ফলে প্রার্থীপদ পাওয়ার জন্য কাড়াকাড়িকে কেন্দ্র করে গোষ্ঠীকোন্দল চরম আকার নেওয়ার আশঙ্কা থাকছে৷ একান্ত আলাপচারিতায় নেতৃত্বরা মানছেন: এখন সংসার বড় হয়েছে৷ আর মানুষের চাহিদার তো কোনও শেষ নেই৷ ফলে দলের অন্দরে সকলেই ক্ষমতার স্বাদ পেতে মরিয়া৷ যে যাঁর মতো করে সেই প্রচেষ্টা শুরুও করে দিয়েছেন৷ ফলে শেষ পর্যন্ত যাঁরা প্রার্থীপদ পাবেন না, সেই বিক্ষুদ্ধদের একাংশের অন্তর্ঘাতের সম্ভবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না৷

যদিও প্রকাশ্যে রাজ্যের দাপুটে মন্ত্রী, শাসকদলের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলছেন, ‘‘আমাদের কোনও অসুবিধে হবে না৷ আমরা আগে থেকেই গোছানো৷ নির্বাচনে লড়াইয়ের জন্য আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত৷’’ প্রাক্তন পরিবহণ মন্ত্রী মদন মিত্র নিজস্ব ঢঙে বলেছেন, ‘‘আমরা প্রফেশনাল৷ ফলে প্রফেশনাল ম্যাচ খেলতে অভ্যস্ত৷ ভোট যখনই হোক না কেন, আমাদের কোনও প্রবলেম নেই৷’’

তবে একান্ত আলাপচারিতায় জেলা নেতারা মানছেন- প্রার্থীপদ নিয়ে কাড়াকাড়ির বিষয়টি৷ তৃণমূলের উত্তর দিনাজপুরের জেলা সভাপতি অমল আচার্যর অকপটে স্বীকারোক্তি, ‘‘লক্ষ্মী পুজো, সরস্বতী পুজো যেমন বাংলার ঘরে ঘরে হয়, পঞ্চায়েত ভোটটাও তেমনই৷ সবাই প্রার্থী হতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক৷ তবে সবাইকে খুশী করা তো সম্ভব নয়৷’’ আরও একধাপ এগিয়ে শাসকদলের পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা সভাপতি অজিত মাইতি বলেছেন, ‘‘সবাই চান প্রার্থী হতে৷ দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এই ধরণের চাহিদা থাকাটা স্বাভাবিক৷ প্রচুর মানুষ চাইছেনও প্রার্থী হতে৷ তবে দলের তো একটা নিজস্ব গাইড লাইন রয়েছে৷ আমরা সেই গাইড লাইন মেনেই প্রার্থী তালিকা তৈরি করব৷’’

ইতিমধ্যেই বাংলার মাটিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে বিজেপি নেতা মুকুল রায়ের সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘‘কোকিলের বাসায় কাকের ডিম পাড়ার কথা মনে আছে তো?’’ স্বভাবতই অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা থাকছেই৷ একান্ত আলাপচারিতায় সেকথা মেনে নিলেও শাসকদলের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, ‘‘উনি যত চেষ্টায় করুন না কেন, বাংলায় কিস্যু করতে পারবেন না৷ পঞ্চায়েতের ফল প্রকাশের পরই প্রমাণিত হয়ে যাবে কার কতখানি শক্তি রয়েছে৷’’

ক’দিন আগেই প্রশাসনিক বৈঠক থেকে দলের জনপ্রতিনিধিদের পঞ্চায়েতের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী৷ বলেছিলেন, ‘‘জুলাই-অগস্টে ভোট হতে পারে৷ এখন থেকেই প্রস্তুত হন৷’’ দলের নেতারা জানাচ্ছেন, নিয়ম অনুযায়ী ১৯ জুলাই পর্যন্ত ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের বর্তমান নির্বাচিতদের মেয়াদ রয়েছে৷ সেক্ষেত্রে জুলাই মাসে ভোট হলে হাতে অনেকখানি সময় পাওয়া যেত৷ তাতে কোন্দল মিটিয়ে বড় সংসার অনেকখানি গুছিয়ে নেওয়া সম্ভব হত৷

তা না হওয়ায়, স্বভাবতই প্রার্থী পদ নিয়ে দলের অন্দরের কোন্দল ক্রমেই ঘন হচ্ছে- যা কপালের চিন্তার ভাঁজ ক্রমেই চওড়া করছে শাসকদলের নেতাদের৷ আক্ষেপের সুরে বলছেনও, ‘‘হয়তো সিংহভাগ আসনে আমরাই জিতব৷ তবে আরেকটু সময় পেলে ঘরটা ঠিকভাবে গুছিয়ে নেওয়া যেত!’’

তৃণমূলের অন্দরে যিনি ভোটের ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হিসেব পরিচিত ছিলেন, অধুনা সেই বিজেপি নেতা কি পারবেন তৃণমূলের কোন্দলের ফসলকে নিজেদের দিকে টানতে? লাখ টাকার এই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলার মাটিতে৷

----
--