‘‘দুর্নীতি ঢাকতে কাগজপত্র নষ্ট করা হয়েছে’’ নিজের দফতর নিয়েই চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি মন্ত্রীর

মানব গুহ, কলকাতা: ‘‘দুর্নীতি ঢাকতে কাগজপত্র নষ্ট করা হয়েছে’’ নিজের দফতর নিয়েই এবার বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি৷ কলকাতা 24×7 এর অন্তর্তদন্তের জেরে সামনে আসে বিদ্যুৎসংস্থায় দুর্নীতি নিয়ে ভিজিল্যান্স তদন্তের রিপোর্ট জমা পড়ার কথা৷ তারপরেই জানা যায়, তদন্তকারী ভিজিল্যান্স অফিসারদের তেমন কোন কাগজই দিতে পারে নি রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার অফিসাররা৷ ক্ষুব্ধ মন্ত্রী মৌখিক ভাবে বিদ্যুৎ সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের অফিসারদের সমস্ত ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার বাতিল করেছেন৷

গত ৭ ই জুলাই আমাদের এক্সক্লুসিভ রিপোর্টে আমরা জানিয়েছিলাম, ২০১৬ সালে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে বড়সড় অভিযোগ ওঠে রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থায়৷ দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ ওঠায় বন্ধ হয়ে যায় নিয়োগ৷ মন্ত্রীর নির্দেশে তদন্তে নামে ভিজিল্যান্স৷ বিদ্যুৎ দফতর সূত্রে খবর, ২০১৭ র মে মাসে রাজ্যের বিদ্যুৎ সচিবের কাছে তদন্ত রিপোর্ট জমা পরা সত্বেও এখনও কোন অজ্ঞাত কারণে প্রকাশ্যে আসে নি সেই রিপোর্ট৷ ভিজিল্যান্সের তদন্ত রিপোর্টের কথা জানেন না বিভাগীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও৷ কাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে? প্রশ্ন তুলেছিলাম আমরা৷

এই সংক্রান্ত আরও প্রতিবেদন: বিদ্যুৎ দফতরে কোটি টাকার নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত রিপোর্ট কোথায়?

- Advertisement -

আমাদের প্রতিবেদন দেখে, বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘‘তদন্ত রিপোর্ট পেয়েছি, রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থায় কাগজপত্র কোনকিছুই ঠিক নেই, কোন রেকর্ডস নেই, কোন কিছুই হদিস পাওয়া যাওয়া না, কোন রেফারেন্স পাওয়া যায় না’’৷ মন্ত্রীর চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি সম্পূর্ণ বেআব্রু করে দিল রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার দুর্নীর্তিকে৷ নিজের দফতর নিয়েই মন্ত্রীর পরিষ্কার স্বীকারোক্তি প্রকাশ্যে এনে দিল রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থার বড়সড় কেলেঙ্কারীর ঘটনাকে৷

ঠিক কি হয়েছিল? আর একবার জেনে নি৷ ২০১৬ সালে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে বড়সড় অভিযোগ ওঠে রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থায়৷ দুর্নীতি নিয়ে অভিযোগ ওঠায় বন্ধ হয়ে যায় নিয়োগ৷ গত বছরেই অর্থাৎ ২০১৬ র ২২ জানুয়ারী মোট ১০ টি পদে ৪২১ জন কর্মী ও আধিকারিক নিয়োগ করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ সংবহন সংস্থা বিজ্ঞাপন দেয়৷ সেই বিজ্ঞাপনের পরিপেক্ষিতে ২৫ হাজারেরও বেশি প্রার্থী চাকরীর জন্য আবেদন করেছিলেন৷ ২০১৬ র মার্চ মাসে লিখিত পরীক্ষার পর পরীক্ষার্থীদের ইন্টারভিউ হয়৷ কিছু বিভাগে ১২ আগষ্ট ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হয়৷ একদিকে কিছু বিভাগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চিঠি ছাড়া শুরু হয়৷ অ্যাপয়েন্টমেন্ট চিঠি ছাড়া ও ইন্টারভিউ চিঠি দেওয়া শুরু হতেই নিয়োগ নিয়ে অভিযোগের পাহাড় জমা পরে৷ বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রচুর অভিযোগ জমা হয়৷ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার (মানবসম্পদ) শ্রীমতি সুজাতা দত্ত ও অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার (মানবসম্পদ) চিরঞ্জিত ঘোষ এর বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ পাবার পর সমস্ত ইন্টারভিউ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেন মন্ত্রী৷ এই নিয়ে WBPDCL থেকে ভিজিল্যান্স অফিসার নিয়ে এসে তদন্তের নির্দেশ দেন মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়৷

মন্ত্রীর নির্দেশে তদন্তে নামে ভিজিল্যান্স৷ দুর্নীর্তি নিয়ে ভিজিল্যান্সের তদন্ত রিপোর্ট জমা পরে বিদ্যুৎ সচিব এস কিশোরের কাছে৷ রাজ্য বিদ্যুৎ সচিব এস কিশোর সেই তদন্ত রিপোর্ট WBSETCL এর চেয়ারম্যান রাজেশ পান্ডের কাছে পাঠিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিতে বলেন৷ বিদ্যুৎ দফতর সূত্রে খবর, গত মে মাসেই জমা পরেছে সেই তদন্ত রিপোর্ট৷ যদিও কোন বিশেষ কারণে সেই দুর্নীতির তদন্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আসে নি৷ এমনকি তদন্ত রিপোর্টে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেবার কথা থাকা সত্বেও এখনও পর্যন্ত কারোর শাস্তি হয় নি৷

কি আছে সেই রিপোর্টে? বিদ্যুৎ দফতর সূত্রে খবর, ভিজিল্যান্সের জমা দেওয়া তদন্ত রিপোর্টে রাজ্য বিদ্যুৎ সংস্থা বা WBSETCL এর তৎকালিন জেনারেল ম্যানেজার সমীর ব্যানার্জী ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেনারেল ম্যানেজার (মানবসম্পদ) শ্রীমতি সুজাতা দত্তর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে৷ বিদ্যুৎ দফতর সূত্রে খবর, ভিজিল্যান্স তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে আর এক অভিযুক্ত অ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজার (মানবসম্পদ) চিরঞ্জিত ঘোষকে৷

ভিজিল্যান্স রিপোর্টে কোন কাগজপত্রই ঠিক না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে৷ বিদ্যুৎ দফতরের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে ও অন্যান্য সমস্ত কাগজপত্র ‘ট্যাম্পার’ অর্থাৎ কাগজপত্র নষ্ট করে দেবার অভিযোগ করা হয়েছে৷ বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের স্বীকারক্তি তদন্তের সেই রিপোর্টকেই স্বীকৃতি দিল৷ তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখনই কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবার কথা ঘোষণা করেন নি বিদ্যুৎমন্ত্রী৷ তবে বিদ্যুৎ সংস্থার উচ্চ পর্যায়ের অফিসার ও কর্তাদের সমস্ত ক্ষমতা খর্ব করেছেন মন্ত্রী৷ ইস্যু ভিত্তিক রিপোর্ট নিয়েই তবে সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রী৷

সব জেনে বুঝেও কেন অভিযুক্ত অফিসারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বিদ্যুৎমন্ত্রী? না কি ‘কান টানলে’ অনেক রাঘব বোয়ালের নামও উঠে আসতে পারে এই কেলেঙ্কারীতে, সেটা বুঝেই এই বিষয়টায় ক্ষুব্ধ হলেও চেপে গেলেন মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়? সব জেনেবুঝেও অফিসারদের ক্ষমতা খর্ব করেই কি দুর্নীতির তদন্ত রিপোর্টে জল ঢাললেন মন্ত্রী? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

Advertisement ---
-----