মুকুলহীন দলে ছাত্র-যুবাদের রাজনীতির পাঠ নেবেন দলনেত্রী

দেবযানী সরকার ও সুমন বটব্যাল, কলকাতা: মুকুলহীন দলে জারি ভাঙন ও অবিশ্বাস৷ এই দুইয়ের বাতাবরণে উত্তেজনায় ফুটছে শাসকদল৷ যার জেরে নজিরবিহীনভাবে এবারেই প্রথমে নেতাজী ইনডোরের পরিবর্তে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের ছাত্র-যুবাদের জন্য পৃথক দুটি রাজনৈতিক সম্মেলন করতে চলেছে শাসক তৃণমূল৷ তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই দু’টি সভা থেকে দলীয় ছাত্র-যুবাদের রাজনীতির পাঠ নেবেন স্বয়ং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

দলীয় সূত্রের খবর, দক্ষিণবঙ্গের ছাত্র-যুবাদের রাজনৈতিক সম্মেলনটি হবে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি, হাওড়ার ডুমুরজোলা স্টেডিয়াম৷ ২দিনের ব্যবধানে ৫ ফেব্রুয়ারি শিলিগুড়ির কাঞ্চনজঙ্ঘা স্টেডিয়ামে উত্তরবঙ্গের সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হবে৷ আয়োজক, স্বয়ং দলের যুবরাজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়৷ দুটি সভারই প্রধান বক্তা, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ থাকবেন দলের শীর্ষ নেতৃত্বরাও৷ ঘাসফুলে ভরা বাংলায় গেরুয়া ঝড় রুখতে এই কর্মসূচিকে সফল করতে ইতিমধ্যেই কলকাতা থেকে কাকদ্বীপ কিংবা বেলপাহাড়ি থেকে বীরভূম- রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হয়েছে তৃণমূলের অন্দরে৷ উদ্দেশ্যে- যুব প্রজন্মের গেরুয়া ঝোঁক রুখে আরও বেশি করে নব প্রজন্মকে ঘাসফুলের ছত্রছায়ায় নিয়ে আসা৷

পড়ুন: মুকুল ম্যাজিক ভোঁতা করে ভোটের লড়াইয়ে স্বস্তিতে শাসক

- Advertisement -

দলের রাজ্যস্তরের এক নেতার কথায়, ‘‘রাজনীতিতে দ্বিতীয় বলে কিছু হয় না৷ এই মুহুর্তে আমরা বাংলার রাজনীতিতে ফার্স্টবয়৷ তা বলে আত্মসন্তুষ্টির কোনও জায়গা নেই৷ সেকথাটাই দিদিমণি ভাল করে সকলকে বুঝিয়ে দিয়েছেন৷ বলেছেন- বিরোধীদের যাবতীয় কুৎসার জবাব দিতে পঞ্চায়েতে ১০০ই ১০০ পেতে হবে৷ সেই লক্ষ্যেই ছাত্র-যুবাদের আরও বেশি করে সংগঠনের ছত্রছায়ায় আনতে এবারে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের জন্য পৃথক রাজনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে৷’’

দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, দক্ষিণ ও উত্তর ছাত্র-যুবাদের দুটি রাজনৈতিক সম্মেলনে ২০ বছরের দলের পথ চলা শুরুর সেই সব দুঃসময়ের ইতিহাস তুলে ধরবেন দলনেত্রী৷ বোঝাবেন, এরাজ্যে তৃণমূলের প্রাসঙ্গিকতা৷ তুলে ধরবেন, বাম আমলের সঙ্গে তাঁর আমলের উন্নয়নের খতিয়ান৷ দিদিমণি ঘনিষ্ঠ  শীর্ষস্তরের এক রাজ্য নেতার বক্তব্য, ‘‘এই মুহুর্তে রাজ্য এক অদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে৷’’

একান্ত আলাপচারিতায় তিনি মানছেন- দল বড় হওয়ার জেরে দলের অন্দরে কোন্দল বেড়েছে৷ আদি বনাম নব্য তৃণমূলীদের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই ছিলই৷ মুকুল রায় দলত্যাগ করে গেরুয়া জার্সি গায়ে চড়ানোয় সেই দ্বন্দ তীব্র হয়েছে৷ মুকুল রায়ের দৌলতে রাজ্য রাজনীতিতে দ্বিতীয় প্লাটফর্ম হিসেবে হাজির হয়েছে বিজেপি৷ দলের ‘অভিমানী’ একাংশ গোপনে যোগাযোগ রাখছেন মুকুল রায়ের সঙ্গে৷ যার জেরে আপাত দৃষ্টিতে কম হলেও দলের অন্দরে ভাঙনের ঘটনা ঘটছে৷ দলের অন্দরে ক্রমেই জমাট বাঁধছে অবিশ্বাসের বাতাবরণও৷ এই অবস্থায় সদ্য যৌবনে পা দেওয়া দলের ভাঙন রুখতে স্বয়ং দলনেত্রী আসরে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন৷

পড়ুন: যুবরাজের দৌলতে স্ত্রীকে প্রার্থী করে হাসিমুখে মালদহমুখী লেবু

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, জন্মলগ্নের পর থেকে নেতাজী ইনডোরেই রাজ্য তৃণমূলের ছাত্র-যুবদের একটাই সভা হত৷ ফি-বারই সেখানে প্রধান বক্তা হিসেবে হাজির হতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এবারে নজিরবিহীনভাবে সেই ট্র্যাডিশন ভেঙে দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের জন্য একেবারে স্বতন্ত্র দুটি রাজনৈতিক সমাবেশ করা হচ্ছে৷

প্রকাশ্যে অবশ্য মুকুলহীন তৃণমূলে ভাঙন কিংবা অবিশ্বাসের বাতাবরণ মানতে নারাজ দলীয় নেতৃত্বরা৷ তাঁদের যুক্তি, পালাবদলের বাংলায় দল বড় হয়েছে৷ ফলে উত্তর ও দক্ষিণের ছাত্র-যুবাদের একসঙ্গে ডাকা হলে বসতে দেওয়ার জায়গা কুলবে না৷ অন্যদিকে এই ভরা শীতে সুদূর উত্তরবঙ্গের জেলা থেকে নেতা-কর্মীদের কলকাতায় আসাটাও অনেক বেশি ঝক্কির৷ তাই সুষ্ঠুভাবে কর্মসূচি রুপায়ণ করতেই উত্তর ও দক্ষিণকে বিভাজনের এই সিদ্ধান্ত৷ দলের রাজ্যস্তরের এক নেতার যুক্তি, ‘‘২১ জুলাই অনেক দূর থেকে মানুষ আসে৷ বছরে একদিনই ঠিক আছে৷ কষ্ট করে আসা যায়৷ কিন্তু বারবার কলকাতায় আসাটা তাদের পক্ষে সত্যিই কষ্টদায়ক৷ তাই এই বাস্তববাদী পদক্ষেপ৷’’

যদিও দলের আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর, দলের প্রধান চালিকা শক্তি এই ছাত্র-যুবা৷ তাই মুকুলহীন তৃণমূলে পঞ্চায়েত ভোটের আগে অবিশ্বাসের বাতাবরণকে আতসকাঁচের তলায় রাখতে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের পৃতক দুটি রাজনৈতিক সমাবেশ করা হচ্ছে৷ সেক্ষেত্রে- ‘দূরত্বে’র অজুহাত দিয়ে  কেউই সমাবেশে না আসা থেকে পার পাবেন না৷

রাজনৈতিক মহলের মতে, মুকুল রায়ের হাত ধরে বঙ্গ বিজেপি যে ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন স্বয়ং দলনেত্রী৷  পঞ্চায়েত ভোটের আগে ছাত্র-যুবদের গেরুয়া যোগ রুখতে তাই নজিরবিহীন এই কর্মসূচির উদ্যোগী নিয়েছেন দলনেত্রী৷ যেখানে দলনেত্রী হাজির হবেন কার্যত দিদিমণির ভূমিকায়৷

অগত্যা দলের নজিরবিহীন এই কর্মসূচিকে সফল করতে জেলায় জেলায় ঘাম ঝরছে তৃণমূলের মেজো-সেজো-ছোট নেতাদের৷

Advertisement ---
---
-----