ব্লেম গেমে দেশে কি কৃষক কম পড়িয়াছে!

বিশ্বজিৎ ঘোষ

খবরের কাগজে হয়তো নিছকই এক বিজ্ঞাপন৷ ‘কৃষক চাই’৷ তাও আবার, পশ্চিমবঙ্গের এক বাংলা খবরের কাগজে৷আর, ওই বিজ্ঞাপন যখন প্রকাশিত হয়েছে, তখন এ রাজ্যে ঘটে গিয়েছে রাজনৈতিক পালাবদল৷

ওই বিজ্ঞাপন যখন প্রকাশিত হয়েছে, সে সময় আবার পেরিয়ে এসেছে, ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যতে’র স্লোগানও৷ এই ধরনের আশ্বাসবাণী বিভিন্ন উপায়ে হোর্ডিং-বিজ্ঞাপনে ভর করে দেওয়া হয়েছিল এ রাজ্যের পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলের শেষের দিকে৷ তেমনই একসময়ে, বাংলা খবরের কাগজের ওই বিজ্ঞাপন দেখে হয়তো চমকিত-পুলকিত অথবা রোমাঞ্চিত হওয়ারই কথা ছিল কৃষককুলের৷ হয়তো, এমনও মনে হয়েছিল, তা হলে কি ফিরে এল কৃষকের সুদিন!  না কি, কৃষক কম পড়িয়াছে!

তার পরেও সময়ের নিয়ম মেনে প্রদর্শিত হয়ে গিয়েছে একের পর এক ঘটনা৷ যা থেকে কখনও পরিষ্কার হয়নি যে, সুদিন ফিরেছে কৃষককুলের৷ যা থেকে প্রমাণও হয়নি যে, কৃষক কি কম পড়িয়াছে!

- Advertisement -

তার পরেও, যখন, গত ২২ এপ্রিল রাজস্থানের গজেন্দ্র সিং রাজপুত দিল্লিতে মর্মান্তিক দৃশ্য ‘উপস্থাপনা’ করলেন, তখনও কি সুদিনের কথা ভাবতে পেরেছে কৃষককুল? না কি, তখন তা ভাবা সম্ভব ছিল? তখনও কি, স্বয়ং গজেন্দ্র সিং রাজপুতই কল্পনা করতে পেরেছিলেন, দুঃস্বপ্নেও হলেও, যে তাঁর এ ভাবে চলে যাওয়ার পর, এ ভাবে রাজনীতির রথী-মহারথীরা ঝাঁপিয়ে পড়বেন? না কি, তাঁদেরই এক প্রতিনিধির এমন মর্মান্তিক পরিণতির জেরে, কৃষককুলে এখন এমন কোনও প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে যে, তাঁদের জন্য এ বার আসবে সুদিন?

সুদিন ফিরবে কি না, সে বিষয়টি অবশ্য সময়ের হাতে এবং কাছে রয়েছে৷ তবে, আপাতত যেভাবে গজেন্দ্র সিং রাজপুত-এর ‘কাহিনি’ নিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মহল, তাতে কিছুটা হলেও চুঁইয়ে পড়া জলের মতো আশার সঞ্চারও হতে পারে কৃষকুলের অন্দর এবং অন্তরে৷কিন্তু, তাও কি সম্ভব! গজেন্দ্র সিং রাজপুত যে মুহূর্তে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলেন, তার প্রাক মুহূর্ত তো বটেই, ওই মর্মান্তিক ঘটনার পরেও কোনও কোনও মহলে এমনও ভাবনার উদয় হয়েছিল যে, গজেন্দ্র সিং রাজপুত কি আদৌ কোনও কৃষক?

কৌতূহলী অথবা হয়তো অতিমাত্রায় কৌতূহলী কিংবা অভিজ্ঞ ওই মহলের তখনও প্রশ্ন,  টেলিভিশনে গজেন্দ্র সিং রাজপুতের মর্মান্তিক ওই ঘটনার ‘লাইভ দেখা’র পরেও প্রশ্ন, তিনি কীভাবে একজন কৃষক হবেন? কেন? ওই মহলের এই ধরনের যুক্তির অন্যতম টার্গেট ছিল গজেন্দ্র সিং রাজপুতের পোশাক এবং তাঁর সেদিনের সাজগোজ৷ ওই মহলের প্রশ্ন ছিল, যেভাবে পোশাক পরে আছেন, যেভাবে সাজগোজ করে আছেন, তা দেখে কি মনে হচ্ছে গজেন্দ্র সিং রাজপুত আসলে একজন কৃষক? এমনটা হতেই পারে না৷ এই ঘটনায় নিশ্চয়ই কোনও রং চড়ানো হচ্ছে!

এমনও যুক্তি ছিল, গজেন্দ্র সিং রাজপুত আসলে আত্মহত্যা করতে যাননি দিল্লিতে৷ তিনি গিয়েছিলেন, নেহাতই ‘শো’-এর জন্য৷এমনকী, এই ধরনের যুক্তিও খাড়া করা হয়েছে, অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই, এ ভাবে পোশাক-সাজগোজে গিয়েছেন, আর, সেই কারণেই তিনি ‘শো’ করছিলেন৷কিন্তু, তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি যে, শেষ পর্যন্ত ওই ফাঁসই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়াবে৷ তিনি এমনটাও ভাবতে পারেননি যে, সত্যি সত্যিই তাঁর অন্তিম শ্বাস বেরিয়ে যাবে৷

অথচ, টেলিভিশনে লাইভ প্রত্যক্ষ করেছে ওই অংশ৷ এবং, এ হয়তো আরও এক আশ্চর্য সমাপতন! পরের দিনই ওই অংশের মধ্যে প্রকাশ পেল গজেন্দ্র সিং রাজপুতের প্রতি আশ্চর্য এক টান! কৃষককুলের প্রতি আশ্চর্য এক আবেগ! এবং, পরের দিন ওই অংশ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করল, গজেন্দ্র সিং রাজপুত আসলে একজন কৃষকই৷এবং, তার আগের দিন টেলিভিশনে ওই রকম মর্মান্তিক এক লাইভ প্রত্যক্ষ করার ‘অপরাধে’, ওই অংশ আবার মনে মনে দংশিতও হল৷ অন্য মহল থেকে এমনও বলা হচ্ছে, ঘটনার দিন ওই অংশ একবারও মনে করল না যে, প্রত্যেকের মধ্যেই ভালো পোশাক এমনকী সাজগোজের বাসনা থাকে নিজেকে সুন্দর ভাবে উপস্থাপনার জন্য৷ একবারও ওই অংশের মনে হল না যে, তেমন কোনও সুপ্ত বাসনা থেকেও গজেন্দ্র সিং রাজপুতের সাজগোজ, ওই দিন ওই রকম ছিল!

কোনও কোনও মহল থেকে এমনও বলা হচ্ছে যে, গজেন্দ্র সিং রাজপুত একজন বিত্তবান ছিলেন৷ এবং, তিনিই বেশ কয়েকজন কৃষককে জীবিকার সংস্থান করে দিতেন৷ আসল ঘটনা কোনওদিন প্রকাশ্যে আসবে কি না, তাও সেই সময়ের হাতে এবং কাছেই রয়েছে৷ তবে, গজেন্দ্র সিং রাজপুতের কাছে যে সুইসাইড নোট মিলেছে, জানা গিয়েছে, ওই নোটে তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর সহকারে লিখেছিলেন, বৃষ্টিতে তাঁর ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে৷তাঁকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে৷ তাঁর তিন সন্তান রয়েছে৷তাই, তিনি কীভাবে আর ঘরে ফিরবেন? আত্মহত্যা ছাড়া তাঁর কাছে আর কোনও পথ ছিল না৷ জয় জওয়ান, জয় কিষাণ, জয় রাজস্থান-এরও জয়গান করেছেন তিনি৷এর পরেও কি বলা হবে, তিনি আসলে একজন কৃষক ছিলেন!

এমনও বলা হচ্ছে কোনও কোনও মহল থেকে যে, গজেন্দ্র সিং রাজপুত রাজস্থান থেকে দিল্লিতে গিয়েছিলেন আম আদমি পার্টি (আপ)-র কিষাণ র‍্যালিতে অংশ নেওয়ার জন্য৷ হয়তো, এটাও আশ্চর্য এক সমাপতন! আর, যে কারণেই হয়তো, গজেন্দ্র সিং রাজপুতের মর্মান্তিক ঘটনার তদন্তে স্থান পেয়েছে ৩০৬ নম্বর ধারা৷ ওই ধারার অর্থ হল, গজেন্দ্র সিং রাজপুত যখন আত্মহত্যার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাঁকে রক্ষা না করে, উলটে উসকানি দেওয়া হয়েছে, প্ররোচিত করা হয়েছে৷দিল্লি পুলিশও এই ঘটনাকে এখনও নিশ্চিতভাবে আত্মহত্যার বলতে রাজি নয়৷ বলা হচ্ছে, গাছের উপর থেকে পা পিছলে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও৷

এ দিকে, এমনও জানা যাচ্ছে, গজেন্দ্র সিং রাজপুত যখন আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন আপ-এর জনসভায় অংশ নেওয়া কর্মী-সমর্থক এবং উপস্থিত জনতা হাসিঠাট্টা করে তা অগ্রাহ্য করেছেন৷ তিনি যখন গাছের উঁচু শাখায় উঠে গিয়ে গলায় ফাঁস লাগাচ্ছিলেন, তখনও নীচে বসে থাকা জনতা হাততালি দিয়ে তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ সেই সময় চিৎকার করে স্লোগান দিয়ে আরও বেশি উত্তেজিত করা হয়েছে ৪২ বছরের গজেন্দ্র সিং রাজপুতকে৷ আর তার পর, দিনভর সম্প্রচারিত হয়েছে যন্তর মন্তরের নির্মম এক লাইভ টেলিকাস্ট৷কিন্তু, তার পর?

শুরু হয়ে গিয়েছে দোষারোপ আর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার পালা৷কৃষককুলের সংকটকে গজেন্দ্র সিং রাজপুত উন্মোচনের চেষ্টা করলেও, এখন শুরু হয়ে গিয়েছে আত্মহত্যা বনাম দুর্ঘটনার প্রবল টানাপোড়েন৷ গজেন্দ্র সিং রাজপুতের শেষকৃত্যে ভিড় করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা৷ তাঁর পরিবারকে সাহায্যের আশ্বাসে, শাসক-বিরোধী উভয় তরফেই দেওয়া হয়েছে ভূরি ভূরি প্রতিশ্রুতি৷ গজেন্দ্র সিং রাজপুতের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা সহায়তার কথা বলেছে আপ৷ আর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, তাঁদের সরকার এ ভাবে কৃষকদের আর অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারে না৷ যদিও, এমনটাও জানিয়েছেন, কৃষককুলের সমস্যা এখনকার নয়৷ এই সমস্যা অনেক পুরনো৷ তবে, একই সঙ্গে পুরনো সরকারের বিভিন্ন ভুলের পাশাপাশি, গত ১০ মাসে তাঁদের সরকারের বিভিন্ন ভুলেরও পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী৷আর সেজন্য সকলের সাহায্য আর পরামর্শও চেয়েছেন তিনি৷

আর, কী করলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল? গজেন্দ্র সিং রাজপুতের মর্মান্তিক ঘটনার পরেও, জারি রেখেছিলেন তাঁর বক্তৃতা, দিল্লির ওই কিষাণ র‍্যালির সভায়৷ যে সভা আবার ডাকা হয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের প্রস্তাবিত জমি বিলের বিরুদ্ধে! আশ্চর্য সমাপতনই হয়তো! সেজন্যই হয়তো, রাজনীতির এমন ‘মোক্ষম সুযোগ’ ওই দিন আর হাতছাড়া করতে চাননি দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী! কিন্তু, আদৌ কি এ বার সুদিন আসতে চলেছে আরও অনেক গজেন্দ্র সিং রাজপুত তথা এ দেশের কৃষককুলের জন্য?  খোদ দেশের কৃষিমন্ত্রকের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর ১২ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেন৷ অন্য একটি পরিসংখ্যান বলছে, গত তিন বছরে তিন হাজারেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন৷এ রাজ্যের পূর্বতন বামফ্রন্ট সরকারের আমলেও আত্মহত্যা করেছেন কৃষক৷ এ দিকে, এ রাজ্যের বর্তমান সরকারের আমলে এখনও পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ১২৫ জন কৃষক৷ আর, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ২৩ জন আলুচাষি আত্মহত্যা করেছেন৷

যদিও, রাজ্য সরকার আলুচাষিদের এই আত্মহত্যার কথা স্বীকার করেনি৷ বলেছে, ওই সব আত্মহত্যার পিছনে পারিবারিক অশান্তি অথবা অন্য কোনও কারণ রয়েছে৷ এখানেও সেই একই ছবি৷ ওই একটি মহলের মতোই৷ যে মহল প্রথমে মনে করেছিল, গজেন্দ্র সিং রাজপুত আদৌ কি কৃষক?  কার্যত, তেমনই বলছে পশ্চিমবঙ্গের সরকারও৷বলা হচ্ছে পারিবারিক অশান্তি অথবা অন্য কোনও কারণ৷ কিন্তু, ওই পারিবারিক অশান্তি অথবা অন্য কোনও কারণ তো আসলে ফল৷আর, কারণটি হল আলুচাষে ক্ষতি৷তার জের হিসেবেই তো পারবারিক অশান্তি অথবা অন্য কোনও কারণের জন্ম৷ গজেন্দ্র সিং রাজপুতের ঘটনায় সরব হয়েছে বিভিন্ন মহল৷আর, পশ্চিমবঙ্গের আলুচাষিদের আত্মহত্যার ঘটনায়, অভিনেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়রা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছেন৷ রাজ্য সরকার অবশ্য আলুচাষিদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ঋণ মকুবের আবেদন জানিয়েছে৷

বহু বছর আগে, মণ্ডল কমিশনের বিরোধিতায়ও আত্মহত্যা প্রত্যক্ষ করেছে এ দেশ৷ তা হলে, গজেন্দ্র সিং রাজপুতের মর্মান্তিক লাইভ টেলিকাস্টে কি এ বার সুদিন ফিরবে কৃষককুলের! না কি, শেষ পর্যন্ত, রাজনীতির ব্লেম গেমে এ দেশে কম পড়বে কৃষকের সংখ্যা!

============================================

Advertisement ---
---
-----