লোকসভা নির্বাচনের এজেন্ডা পালটে দিতে পারে অনেক সমীকরণ

‌পার্থসারথি গুহ: ‌গুটি গুটি পায়ে দেশ যখন আরও একটা সাধারণ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে তখন এই ভোটে নিজেদের এজেন্ডা ঠিক করতে ব্যস্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বলাবাহুল্য, এদের মধ্যে যেমন জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলি রয়েছে, ঠিক তেমনই আঞ্চলিক দলগুলিও নিজের মতো করে প্রস্তুতি আরম্ভ করেছে।

এখনও পর্যন্ত মোদী সরকার কি ইস্যুতে ভোটে যাবে তা ঠিক হয়নি। নাগরিকপঞ্জি নিয়ে মাঝে অসমের উত্তাপ ছুঁয়ে গিয়েছে সারা দেশকে। সেই অনুপ্রবেশকারী ও শরণার্থীর থিওরি যে বিজেপি এবার অস্ত্র করতে পারে তার একটা আন্দাজ ইতিমধ্যেই মিলতে শুরু করেছে। আবার যত নির্বাচন সামনে এগোবে তত ঝুলি থেকে রামমন্দির ও অন্যান্য হিন্দুত্বের তাস নয়া মডেলে বিজেপি সামনে আনতে পারে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

যদিও এই প্রসঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন ২০১৪ র লোকসভা ভোটে কিন্তু হিন্দুত্বের তাস সামনে আনেনি গেরুয়া শিবির। বেশি সংখ্যক যুব সমাজকে আকৃষ্ট করতে কর্পোরেট কায়দায় প্রচার করেছিল তারা। পরে অবশ্য উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা ভোট জিততে যোগি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী প্রোজেক্ট করার মাধ্যমে ফের আস্তিন থেকে হিন্দুত্বের তাস বের করেছিল বিজেপি।

- Advertisement -

‌এমনিতে প্রতি লোকসভা নির্বাচনে দেশ জুড়ে কিছু ইস্যু সামনে চলে আসে। বস্তুত, ২০১৪ র লোকসভা ভোটের অব্যবহিত আগে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপির প্রধান তুরুপের তাস হয়ে উঠেছিল ততকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের দুর্নীতি। ২ জি স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারি, কয়লা কেলেঙ্কারি, কমনওয়েলথ দুর্নীতি সহ ভুরি ভুরি অভিযোগের তির ছিল মনমোহন সিং সরকারের বিরুদ্ধে। যদিও ব্যক্তি মনমোহনের বিরুদ্ধে কারও কোনও অভিযোগ ছিল না কখনই। মূলত সরকার চালানোর ক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপারগতা বেশি আলোচিত ছিল।

এই জন্য সবাই চেয়েছিল একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রীকে যিনি প্রকৃত অধিনায়কের মতো দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তখন মনে হয়েছিল ৫৬ ইঞ্চির ছাতির অধিকারী মানুষটি নিশ্চিতভাবে সেই ব্যক্তি, সেই ক্যাপ্টেন যিনি শতাধিক কোটি মানুষের দেশের যোগ্য কাণ্ডারী হয়ে উঠবেন। এটা হল ২০১৪ র ঘটনা। যে লোকসভা নির্বাচন হয়ে উঠেছিল একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী পাওয়ার ভোট। সেই ইস্যু এখনও প্রাসঙ্গিক আছে কি না তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরও বেশ কিছুদিন। পরবর্তী নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত।

‌এর আগে বিভিন্ন সময় দেশের লোকসভা নির্বাচন নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছে। ইন্দিরা জমানার জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে কখনও সারা দেশ এককাট্টা হয়েছে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে। আবার রাজীব গান্ধির বিরুদ্ধে বফর্স কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলে রাজীব সরকারের অর্থমন্ত্রী বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংকে সামনে রেখে রাম ও বাম লড়াই করেছে একত্রিতভাবে। বৈপরীত্যে ভরা সংরক্ষণের দাবিতে একজোট হওয়া মণ্ডল ও রামরথে সওয়ার হওয়া কমণ্ডল মিলে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে।

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ভিপি সিংয়ের সঙ্গে যৌথভাবে মঞ্চ ভাগ করে নিয়েছেন অটলবিহারী বাজপেয়ী ও জ্যোতি বসুরা। পরে জ্যোতিবাবু যতই বিজেপি সরকারকে অসভ্য বর্বর সরকারের তকমায় ভূষিত করুন না কেন, তিনি যে একসময় কংগ্রেসকে হঠাতে বিজেপির সঙ্গে যৌথভাবে সভা করেছিলেন তা ইতিহাসই বলে দেয়।তাই এ রাজ্যে বিজেপিকে নিয়ে আসার জন্য যে বামেরা উঠতে বসতে তৃণমূলকে দোষ দেন, বিজেপির সর্বভারতীয়করণে তাদের অবদান কোনও অংশে কম নয়।‌

২০০৪ এ অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকারের পরাজয় ভারতীয় রাজনীতির পিচকে অচেনা ঠাউরেছিল। না হলে বাজপেয়ী সরকারের ৫ বছরের মার্কশিট এমন কিছু খারাপ ছিল না যে কামব্যাক করতে পারা যাবে না। অথচ সেটাই ঘটেছিল বাস্তবে। ট্রাজিক নায়কের মতো দিল্লির কুর্সি ছেড়ে প্রস্থান ঘটিয়েছিলেন এবি। এখন পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদীর দ্বিতীয়বার কামব্যাক করা নিয়ে সারা দেশ জুড়ে প্রচুর জল্পনা চলছে। আবারও একটা খিচুরি সরকারের আস্বাদন দেশ পেতে পারে এমন কথাও ভাসছে আকাশে বাতাসে। এমতাবস্থায় নমো যদি আবার ফিরে আসে ক্ষমতায় তখন বলতেই রাজনীতির অঙ্কটা সত্যি বড় কঠিন।

Advertisement ---
-----