ঋণের পর ঋণে দেনার দায়ে ডুবতে চলেছে বাংলা

মানব গুহ, কলকাতা: বাজার থেকে ফের ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চলেছে রাজ্য সরকার৷ বাজার থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, বেড়েই চলেছে৷ প্রথমে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দুই মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে ঋণের বোঝায় ডুবে যাচ্ছে বাংলা৷ বামফ্রন্ট সরকার যে ঋণের বোঝা বাংলার মাথায় চাপান শুরু করেছিল, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ঠিক সেখান থেকেই শুরু করে আজ গলা পর্যন্ত ধারের বোঝায় ডুবে বাংলা ও বাঙালি৷ দুই সরকারের হাত ধরে মাথায় ধারের বোঝা নিয়েই জন্মাচ্ছে প্রতিটি রাজ্যবাসী৷ ঋণের বোঝা বাড়ছে আমার আপনার সন্তানদের মাথায়৷

রাজ্য অর্থ দফতর সূত্রে যেটুকু জানা গিয়েছে, ২০১২-১৩ সালে তৃণমূল সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা৷ ২০১৩-১৪ সালে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে হয় ২১ হাজার কোটি টাকা৷ ২০১৬-১৭ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে হয় ৩২ হাজার কেটি টাকা৷ ২০১৭-১৮ আর্থিক বর্ষে সেই ঋণের বোঝা আরও বাড়বে, সেই আভাস এখনই পাওয়া যাচ্ছে৷

গল্প হলেও সত্যি৷ বাজার থেকে ঋণ নাও৷ তৎকালীন সমস্যা মেটাও৷ বাজার থেকে ঋণ নাও৷ সস্তার চটকদারী রাজনীতি চালিয়ে যাও৷ ঠিক এই নীতি নিয়েই বাংলার মাথায় ঋণের বোঝা চাপানো শুরু করেছিল বাম সরকারগুলি৷ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তা চরমে পৌঁছায়৷ ২০১১ সালে ৩৪ বছরের রাজত্ব শেষে বিদায় নেয় ‘লাল’ সরকার৷ বিপুল ভোটে জিতে বাংলার ক্ষমতায় আসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার৷ ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস বলে গিয়েছিলেন, ‘ছাপ রেখে যা’৷ যা অক্ষরে অক্ষরে মেনে, বিদায় নিলেও ‘ছাপ’ রেখে যায় বুদ্ধদেবের সরকার৷ বাংলার মাথায় রেখে যায় ১.৮৬ লাখ কোটি টাকার ঋণ৷ ঠিকই পড়ছেন৷ এক-দুই-একশো কোটি নয়, ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ৷

- Advertisement -

২০১১ তে সেই ১.৮৬ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়েই পথ চলা শুরু করে মমতার সরকার৷ কিন্তু ঋণের বোঝা কমার বদলে বাড়তেই থাকলো৷ কাস্তে তারার সরকারগুলির মতই সেই একই ফর্মুলায় চলছে ঘাসফুল সরকারও৷ সমস্যা হলেই বাজার থেকে ঋণ নাও৷ ২০১৭-১৮ সালে এই ঋণের পরিমাণ দাঁড়াতে চলেছে ৩.৬৬ লাখ কোটি টাকা৷ অর্থাৎ ৩ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা৷ দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে প্রায় ২৫ টি বাজেট পেশ করে বাম অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত রাজ্যের ঘাড়ে ১.৮৬ লাখ কোটি টাকার ঋণ চাপিয়েছিলেন৷ আর, গত ৬ বছরে মাত্র ৭ টি বাজেট পেশ করেই তৃণমূল অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র সেই ঋণ প্রায় দ্বিগুণ করে দিয়েছেন৷

২০১৮ তে আলাদা করে রাজ্যকে ৪৫,৩৩৯ কোটি টাকা সরিয়ে রাখতে হবে ঋণের বোঝা কমানোর জন্য৷ যেটা এই বছরের চেয়েও ৩০ শতাংশ বেশি৷ কারণ, ১০ বছরে লোন ম্যাচিওরিং এর জন্য আগামী বছরে ৪৫,৩৩৯ কোটি টাকা শোধ দিতে হবে৷ এবারে যেখানে ঋণ পরিশোধের জন্য লেগেছিল ৩৬,৮৬৯ কোটি টাকা সেখানে পরের বছর আরও ৩০ শতাংশ টাকা বেশি লাগবে৷ তাই, টাকার অঙ্কটা গিয়ে দাঁড়াবে ৪৫, ৩৩৯ কোটি টাকা৷ এর কারণ হল ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ১০ বছরের বেশ কিছু ঋণের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে৷

যদিও অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র এই বছরের অগাস্টে জানিয়েছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাজার থেকে মোট ৮২,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে৷ যদিও বাস্তবের হিসাবে তা মিলছে না৷ কালীপুজো-ভাইফোঁটার ছুটির পর ফের আরও প্রায় ২০০০ কোটি টাকা ঋণ নেয় অর্থ দফতর, এমনটাই ছিল নবান্ন সূত্রে খবর৷

বিপদটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ট্যাক্স হিসাবে রাজ্য সরকার যা আয় করবে তার দ্বিগুণ টাকা রাজ্য সরকারকে পেমেন্ট করতে হবে৷ সরকারী কর্মীদের মাইনে, ঋণ শোধ, পেনশন ও ভর্তুকী খাতে ২০১৭-১৮ সালে সরকারকে প্রায় ১.০৬ লাখ কোটি টাকা পেমেন্ট করতে হবে৷ আর ২০১৭-১৮ তে রাজ্য সরকার ট্যাক্স হিসাবে আয় করবে প্রায় ৫৫,৭৭৩ কোটি টাকা৷ অর্থাৎ আয়ের দ্বিগুণ খরচা করতে হচ্ছে মমতা সরকারকে৷ ফলে সেই বাড়তি টাকাটাও যে বাজার থেকেই ঋণ হিসাবে তুলতে হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷

অর্থাৎ, যে টাকাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের উন্নতির জন্য বা অন্যান্য দান খয়রাতির জন্য খরচা করবেন তার জন্য তাঁকে অন্য কোন টাকার সোর্সের জন্য অপেক্ষা করতে হবে৷ সেটা রাজ্যের সম্পত্তি বিক্রীই হোক বা বাজার থেকে লোন নেওয়াই হোক, সবটাই রাজ্যের পক্ষে অন্তত ক্ষতিকারক হতে চলেছে৷ ট্যাক্স না বাড়িয়ে, আয়ের অন্যান্য উৎস না খুঁজে, চটকদারী রাজনীতি করতে করতে রাজনৈতিক দলগুলি বাংলার মাথায় ঋণের পাহাড় চাপিয়ে দিচ্ছে, অর্থনীতিবিদদের মতে এটাই সস্তা রাজনীতির সবচেয়ে সরল ও সহজ পদ্ধতি৷

কিন্তু ভবিষ্যতে কি হবে? ঋণ শোধ করতে আরও ঋণ, আরও……৷ ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই জন্মাচ্ছে প্রতিটি রাজ্যবাসী৷ মনমোহন সরকারের আমল থেকে মোদী সরকার, সুদ মুকুবের জন্য প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভাকে বারবার চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ রাজ্যের জন্য আলাদা আর্থিক প্যাকেজের জন্যও বহুবার কেন্দ্র সরকারকে চাপ দিয়েছেন মমতা৷ কিন্তু কংগ্রেস বা বিজেপি কোনও সরকারই রাজ্যের আর্থিক দিকটা ভেবে দেখেনি৷

বর্তমান পরিস্থিতিটা খুবই ভয়ংকর হতে চলেছে৷ কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের দোহাই দিয়ে শুধুমাত্র বাংলার জন্য আলাদা আর্থিক রিলিফ প্যাকেজ ঘোষণা করতে নারাজ৷ তাই, বামেদের হাত ধরে রাজ্যের যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্গতির শুরু হয়েছে তা তৃণমূলের হাত ধরে আরও চরমে পৌঁছাচ্ছে৷ অর্থনৈতিক এই সংকট থেকে বাংলা কিভাবে মুক্তি পাবে, সে প্রশ্নের কোন জবাব নেই৷

Advertisement ---
---
-----