কলকাতার উড়ালপুলের কড়চা ও উলুখাগড়ার রোজনামচা

‌পার্থসারথি গুহ: ২০১৬ র বিধানসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে পোস্তায় নির্মীয়মান ব্রিজ ভেঙে পড়া নিয়ে উত্তাল হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। আর সেই ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা আরও আতঙ্ক বাড়িয়েছিল ২৭ জন মানুষের মৃত্যু। আহত হয়েছিলেন প্রায় শতাধিক মানুষ। যেহেতু বিধানসভা ভোট কড়া নাড়ছিল তখন বিরোধীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শাসকের দিকে।

আবার শাসক শিবির যুক্তি সাজাচ্ছিল পূর্বতন বাম জমানায় বরাত পাওয়া সংস্থার গাফিলতির দিকে। এতগুলি মানুষ মারা গেল সেদিকে কোনও রাজনৈতিক দলের কোনও নজর নেই। তাঁরা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে চাপানউতোরে। এই ছবিটাই অ্যাকশন রিপ্লের মতো যেন ফিরে ফিরে আসছে মাঝেরহাট সেতু ভাঙার ঘটনায়। এখনও পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২। যা আরও বাড়তে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। সেই একই ছকে শাসক-বিরোধী কাজিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে মাঝেরহাট ব্রিজ ভাঙাকে কেন্দ্র করে। বিজেপি নেতারা রাজ্য সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছে।

- Advertisement -

আবার শাসক তৃণমূল দায়ী করছে রেল দফতর তথা মেট্রো রেলের কাজকে। রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী যেমন ব্রিজ ধ্বংসের জন্য আঙুল তুলছেন কেন্দ্রের হাতে থাকা রেল দফতর ও রাজ্যের পূর্ত দফতরের দিকে। অর্থাৎ তার তির কেন্দ্র রাজ্য উভয়ের দিকেই। মতাবস্থায় রাজনীতির জলঘোলা চলতে থাকবেই। প্রাণ যাবে উলুখাগড়াদের।

মাঝেরহাট সেতু যখন ভেঙে পড়ে তখন ঘটনাচক্রে এই প্রতিবেদক ছিল অনতিদূরে দুর্গাপুর ব্রিজের ওপর। সবেমাত্র দুর্ঘটনার খবর ছড়াতে আরম্ভ করেছে। অটো, বাস, ট্যাক্সি সব যানবাহনই হঠাত করে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। সহযাত্রীদের মধ্যে শুরু হয়েছে ফিসফাস। কেউ আবার স্মার্টফোনে দুর্ঘটনার ছবি দেখতে ব্যস্ত। কারও বাড়ি থেকে ফোন এসেছে কুশল সংবাদ নেওয়ার জন্য। অনেকে হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে জানাতে ব্যস্ত যে তাঁরা নিরাপদ বলে। চেনা শহরটা আচমকাই যেন এক অদৃশ্য মন্ত্রবলে পালটে গিয়েছে। কেমন যেন একটা স্তব্ধতা গ্রাস করেছে সকলকে। দুর্ঘটনার পর দিন দুই তিন কেটে গিয়েছে। হয়তো সেদিনের আবহ নেই, তাও কেমন যেন একটা শূন্যতা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

‌সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে এই বিপর্যয় সম্পর্কিত নানা পোস্ট। তিলোত্তমার যে সিটি অফ জয় তকমা তা পালটে কেউ কেউ বলছেন সিটি অফ ভয়। আবার একদল নিজেদের সেফ দেখাতে ব্যস্ত দুর্ঘটনার এত পরেও। শহরে বিভিন্ন সময় নানা ব্রিজের ওপর সওয়ার থাকাকালীন আম পাবলিক অনেক আতঙ্কের কথাও শেয়ার করছেন একে অপরের সঙ্গে।

ভাবখানা এমন যে যখন তখন তাঁরাও এমন কোনও বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারেন। আসলে এটাই তো সাধারণ উলুখাগড়ার রোজনামচা। যা কদিন পরেই হয়তো অন্য কোনও এক খবরের ঠেলায় গা ভাসাবে। যেভাবে পোস্তার ঘটনা ভুলেছি আমরা। আরও কত কি, যা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে আমাদের চারপাশে তারও সলিল সমাধি হয়ে গিয়েছে একে একে।

ঠিক এমন ছবি চোখে পড়েছে পার্কস্ট্রিট স্টিফেন কোর্টের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর। অতগুলো মানুষের ওইরকম মর্মান্তিক মৃত্যু। সবাই আবার ওখানকার বাসিন্দাও নন। ওখানকার কোনও অফিসে কাজে এসেছিলেন। সেই ভয়াবহ ঘটনার পরেও শহরের ছন্দপতন দেখেছি। ততকালীন শাসক বাম নেতা মন্ত্রীদের দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা। আর প্রবল বিরোধী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করা তৃণমূল নেতাদের দাপট সব কিছুই প্রত্যক্ষ করেছে এই শহর। আমরি অগ্নিকাণ্ডের পর ফের এরকম নারকীয় দৃশ্য ফুটে উঠেছে চোখের সামনে।

অসুস্থ মানুষগুলি ওভাবে দগ্ধ হয়ে মারা গিয়েছেন, দমবন্ধ হয়ে শেষ হয়ে গিয়েছেন। সবক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন সেই সাধারণ জনগণ। তাঁদের জন্য কিছুদিন উত্তাল হয়েছে শহর। মোমবাতি মিছিল আর রাজনৈতিক উত্তাপে কান ঝালাপালা হয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তইই ব্যস। কালের নিয়মে আবার সবাই তা বিস্মৃত হয়েছে। স্টিফেন কোর্ট থেকে আমরি, পোস্তা থেকে মাঝেরহাট সর্বত্র সেই এক কোলাজ ফুটে উঠেছে।

কিছু সাধারণ মানুষ তথা জনতা জনার্দনের মৃত্যু, স্থানীয় কিছু সাহসী অকুতোভয় মানুষের সাহায্যের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া ও রাজনীতির কাণ্ডারীদের সেই চেনা আকচাআকচি। এভাবেই হয়তো আরও কোনও ঘটনা দুর্ঘটনার দিকে এগিয়ে যাব আমরা, এগিয়ে যাবে সমাজ। উলুখাগড়ার দিনলিপি বোধহয় একেই বলে।

Advertisement
---