‘ব্রেস্ট ফিডিং’ আর ‘মেয়েবেলা’র ভাবনায় অভিনব কাশী বোস লেন

কাশীবোস লেনে পুজো প্রস্তুতি তুঙ্গে৷ ছবি-মিতুল দাস

দেবযানী সরকার, কলকাতা:  কয়েক মাসের ছোট্ট সন্তানকে কোলে নিয়ে অনেক মায়েরাই মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ঠাকুর দেখেন৷ নিজেরা উৎসবের আনন্দে মশগুল থাকেন ঠিকই, কিন্তু ছোট্ট শিশুটিকে খাওয়াবেন কোথায়? তুমুল ভিড়ের মধ্যে প্রবল সমস্যায় পড়েন মায়েরা৷ সে সমস্যা মেটাতেই এবার অভিনব উদ্যোগ নিল কাশী বোস লেন পুজো কমিটি৷ এবার তাদের পুজো আয়োজনে থাকছে মায়েদের জন্য ‘ব্রেস্ট ফিডিং জোন’৷

আসলে এবারে কাশী বোস লেনের সমস্ত আয়োজনই মায়েদের কথা তথা মেয়েদের মনে রেখে৷ এ বছর তাঁদের থিম “মেয়েবেলা”৷ এ দেশ ঘটা করে মাতৃপুজো করে৷ কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে অধিকাংশ মেয়ে এখনও অবহেলিত৷ আধুনিকতার বড়াই করা এই সভ্য সমাজে ধর্ষণ আর কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সমাজে মেয়েদের সত্যিকারের অবস্থান৷ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে মেয়েরা পাল্লা দিলেও এখনও অনেক পরিবার আছে যাঁরা শুধুমাত্র পুত্রসন্তানের আকাঙ্ক্ষা করেন ৷ ছেলে হলে মিষ্টি বিলোয় ঘরে ঘরে৷ আর মেয়ের জন্ম দিলে মায়ের কপালে জোটে গঞ্জনা আর তাচ্ছিল্য৷ দেবী দুর্গার পুজোর মধ্যে দিয়েই এবার নারীকে সম্মান জানাচ্ছেন উত্তর কলকাতার কাশী বোস লেন সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির উদ্যোক্তারা৷ এ বছর ৭৮-এ পা দিল কাশী বোস লেনের পুজো৷ প্রতি বছরই তারা চমক রাখেন দর্শনার্থীদের জন্য৷ এবছর তাঁদের মণ্ডপে প্রবেশ করে দেখা যাবে একটা শিশুকন্যার জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা৷ কন্যাভ্রূণ থেকে মাতৃত্বের পরিপূর্ণতা৷KASHI-BOSE-LANE-2

মূলত তিনটি পর্যায়ে গোটা মণ্ডপটাকে ভাগ করা হয়েছে৷ একটা অংশে তৈরি করা হচ্ছে গর্ভগৃহ৷ যেখানে রাখা থাকছে কন্যাভ্রূণ৷ তার পরের অংশে থাকছে নারীত্ব এবং একদম শেষে থাকছে নারীর পরিপূর্ণ রূপ মাতৃত্ব৷ দেবী দুর্গাকেই সেই স্থানে রেখেছেন তাঁরা৷ কমিটির সহকারী সম্পাদক সৌম্য মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ফাইবার, আয়রন, প্লাস্টার অফ প্যারিস, অ্যাক্রিলিক মিরর ও নানা রকম রঙ ব্যবহৃত হচ্ছে মণ্ডপসজ্জায়৷ আরও বিশেষ কিছু উপকরণ ব্যবহৃত হচ্ছে মণ্ডপসজ্জায়, যেগুলি এখনই প্রকাশ্যে আনতে চাইছেন না পুজো উদ্যোক্তারা৷ তাঁদের দাবি সেগুলোও দর্শনার্থীদের কাছে বড় চমক হবে৷  উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, মণ্ডপের মূল আকর্ষণ হল গর্ভগৃহ৷ পদ্মফুল দিয়ে তৈরি এক বৃত্তের মধ্যে দেখা যাবে অসংখ্য কন্যাভ্রূণ৷ গাছরূপী মা তাদের ছায়ায় ঢেকে রেখেছেন৷ কর্ণিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই গাছটি ৷ এছাড়াও গোটা গর্ভগৃহ জুড়ে দেখা যাবে কাঁথা স্টিচের কাজ৷ নারীদের কথাই লেখা থাকবে সেই কাঁথাস্টিচের ফোঁড়ে৷ ওই বৃত্তের মধ্যে বাচ্চাদের জন্য অনেক ত্রিমাত্রিক খেলনা রাখা থাকবে৷ এবার মা যেহেতু অশ্বে আসছেন তাই চারটি বড় ঘোড়া সাজানো থাকবে মণ্ডপে৷

- Advertisement -

এবছর কাশী বোস লেন সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির মণ্ডপশিল্পী প্রদীপ দাস ও প্রতিমাশিল্পী নব পাল৷ শিল্পীরা জানিয়েছেন, সাবেকি ও থিমের সংমিশ্রণে তৈরি করা হচ্ছে প্রতিমা৷ থিমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গোটা মণ্ডপে ধ্বনিত হবে থিম মিউজিক৷ আর এসবের পাশাপাশি মহিলা নিরাপত্তারক্ষীর কড়া ঘেরাটোপে মণ্ডপের মধ্যে একটা ব্রেস্ট ফিডিং জোন তৈরি করছে তারা৷ যেহেতু অনেক মায়েরাই সন্তান কোলে ঠাকুর দেখতে বেরোন এবং দীর্ঘক্ষণ বাইরে ঘোরার পর তাঁদের ছোট্ট শিশুটির খিদের জ্বালায় কেঁদে ওঠে, তাদের শান্ত করতে এই আয়োজন বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা৷

শুধু প্রতীকী নারীশক্তি বা প্রতীকে মায়েদের কথা ভাবা নয়, বাস্তবেও মায়েদের অসুবিধা সমস্যাগুলির কথা ভেবেই এবার পুজোয় ‘ইউনিক’ হতে চাইছে কাশী বোস লেন৷