কার পাপের ভারে ভূমিকম্প ঘটে? বাপুজির ব্যাখ্যায় সায় দেননি রবীন্দ্রনাথ

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: সমসাময়িক হলেও বয়েসে গান্ধিজীর চেয়ে কিছুটা বড় ছিলেন কবিগুরু ৷ দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যেএকে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল চরম ৷ যদিও এই দুই মনীষীর মধ্যে বহু ক্ষেত্রেই মত পার্থক্য দেখা গিয়েছিল৷ তার মধ্যে গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে বিহারের ভূমিকম্পের নেপথ্যে কারণ ঘিরে মহাত্মা এবং রবীন্দ্রনাথের মতপার্থক্য প্রকট হয়ে উঠেছিল৷ বাপুজির সেদিনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পিছনে ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে মানতে পারেননি বিজ্ঞানমনস্ক রবিঠাকুর৷ গান্ধীজী সেই ধ্বংসলীলার জন্য মানুষের পাপকেই দায়ী করেছিলেন৷ কিন্তু বিজ্ঞান সচেতন বিশ্বকবির সেই ব্যাখ্যা সঠিক মনে হয়নি৷ ফলে সেদিন একে অপরের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধেছিল৷

১৯৩৪ সালে বিহারে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। সেই ব্যাপক ধ্বংসকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিল বহু মানুষ। মহাত্মা গান্ধী তখন দক্ষিণ ভারতে। সেখান থেকে তিনি ‘হরিজন’পত্রিকায় একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন। সেই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, বিহারের বর্ণহিন্দুদের অস্পৃশ্যতা-পাপই ঐ ধ্বংসলীলার মূল কারণ। রুদ্র বিধাতার কাছ থেকে পাপের শাস্তিরূপেই এমন ধ্বংসের কঠোর শাস্তি নেমে এসেছে। কিন্তু এই বিবৃতিটি প্রকাশের পরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ইউনাইটেড প্রেসে’র মাধ্যমে একটি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন । সেই প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়েছিল, “প্রাকৃতিক জড় ঘটনাসমূহের একটি বিশেষ সমাহারই হল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অনিবার্য এবং একমাত্র কারণ।’’ এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অভিমত ছিল, যদি নৈতিক সত্যগুলিকে বাহ্যসৃষ্টির ঘটনাসমূহের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলি তাহলে স্বীকার করিতে হবে যে, নৈতিক দিক থেকে বিধাতার থেকে মানবপ্রকৃতি অনেক বড়৷

কিন্তু দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের এমন তীব্র প্রতিবাদের পরও মহাত্মা গান্ধী তাঁর পূর্বমত থেকে সরে আসেননি। বরঞ্চ নিজের মতের সপক্ষে যুক্তি দেখাতে ফের বিবৃতি দিয়েছিলেন৷। রবীন্দ্রনাথের বিবৃতির উত্তরে ‘হরিজন’পত্রিকায় গান্ধীজী লেখেন, কবিগুরু শুধু শান্তিনিকেতনের আশ্রমবাসীদেরই ‘গুরুদেব’নন, তাঁরও ‘গুরুদেব’। যদিও অতি অল্পকালের মধ্যেই গুরুদেব এবং তাঁর মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যগুলি তিনি আবিষ্কার করে ফেলেন। তখন তিনি দাবি করেন, তিনেভেলিতে বসে তিনি যখন বিহারের প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে অস্পৃশ্যতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন তখন তিনি যতদূর সম্ভব চিন্তাভাবনা করেই তা করেছিলেন এবং তা পরিপূর্ণ অন্তর থেকে প্রকাশ পেয়েছিল। তিনি যা বিশ্বাস করেছেন সেটাই বলেছেন। গান্ধীজী সেখানে লিখেছিলেন,বহুদিন ধরে এই কথা বিশ্বাস করে এসেছেন যে, প্রাকৃতিক ঘটনা বাস্তব এবং আধ্যাত্মিক এই উভয়বিধ ফলই উৎপাদন করে। এর উলটোটাও একই রকম সত্য বলে বিশ্বাস করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি নিশ্চিত, পাপ ভুলভ্রান্তি যত বিপুলই হোক না কেন তা এত শক্তিশালী নয় কে বলে যাতে সৃষ্টির কাঠামোটাকে নীচে টেনে নিয়ে একেবারে ধ্বংস করে দিতে পারে। বরং তাঁর বিশ্বাস, কোনও প্রাকৃতিক ঘটনার চেয়ে নিজেদের পাপসমূহ এই কাঠামোটিকে ধ্বংস করে দিতে অধিক শক্তিশালী এবং জড়বস্তু ও আত্মার মধ্যে একটা অচ্ছেদ্য বন্ধন রয়েছে।

- Advertisement -

গান্ধীজীর ধর্মচেতনা যেমন মুখ্যত গীতাকে আশ্রয় করে পরিপুষ্ট লাভ করেছিল তেমনই রবীন্দ্রনাথের ধর্মচেতনার অবলম্বন ছিল উপনিষদ। রবীন্দ্রনাথের জীবনে যে-পথে ধর্মবোধের জাগরণ ও ধীরে ধীরে তা ঘনীভূত হয়েছে গান্ধীজীর জীবনে হুবহু সেভাবে ঘটেনি। গান্ধীজীর জীবনে ধর্মবোধের প্রথম জাগরণ ঘটেছিল ছোটবেলায় রাজা হরিশচন্দ্র পালা দেখার মধ্যে দিয়ে৷ অর্থাৎ, শুধু শাস্ত্র, পারিবারিক প্রভাব বা সামাজিক পরিবেশের ভিতর দিয়েই এঁদের ধর্মবোধের জাগরণ ঘটেনি, সত্যদর্শনের একটা তাড়নাও তাঁদের মনের ভিতর থেকে কাজ করেছিল। পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় তলস্তয় ফার্ম গঠন এবং লাঞ্ছিত মানুষের জন্য সত্যাগ্রহ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আরম্ভ হয়েছিল গান্ধীজীর কর্মজীবন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলেছিল তাঁর এই সংগ্রাম। অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চেতনার উন্মেষের গোড়া থেকেই সহজাত প্রবণতায় একইসঙ্গে দেশ এবং বিশ্বকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন। আসলে তিনি মানুষকে ভালোবেসে ছিলেন৷ পরবর্তীকালে জগদীশচন্দ্র বসু, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন প্রমুখ রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতাকে আরও পরিপুষ্ট করে তোলেন ৷

Advertisement
---