প্রসেনজিৎ চৌধুরী: রাজপুতানার দখল নেওয়াটা আলাউদ্দিন খিলজির কাছে কঠিন হয়েছিল৷ হামলার পর হামলা চালিয়েছিলেন দিল্লির সুলতান৷ আর মরণপণ লড়াই চালিয়েছিলেন রাজপুতরা৷ বীরত্ব দেখানোয় তারা জগত প্রসিদ্ধ৷ কিন্তু কথায় আছে বারো রাজপুতের তের হাঁড়ি..অর্থাৎ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও পারস্পররিক দ্বৈরথেও তারা কম যাননা৷ না হলে বারবার রাজপুতনা আক্রান্ত হয়েছে একজোট হয়ে সব রাজপুত সর্দার ময়দানে নামেনি কেন এই প্রশ্ন বারবার উঠেছে৷

যাই হোক সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি যাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সেই চিতোর রানি পদ্মাবতী (পদ্মিনী) রাজস্থানের সম্মান হিসেবেই পরিচিত৷ যে রাজ্যে জলের দাবিতে যত না মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন তার থেকে অনেক বেশি জন নেমেছিলেন সঞ্জয় লীলা বনশালির ছবি পদ্মাবতী (পরে নাম পাল্টে পদ্মাবত) এর বিরোধিতায়৷ বিক্ষোভের কারণ, সিনেমায় খিলজি ও পদ্মাবতীর প্রেমের দৃশ্য দেখানো হয়েছিল৷ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে হরিয়ানা, গুজরাত সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে৷ পরে জেগে ওঠা বুদবুদের মতোই সেই আবেগ মিলিয়ে গিয়েছে৷

Advertisement

পড়ুন: ভোটের আগে বড় ধাক্কা, দল ছাড়লেন মোদীর সাংসদ

রাজস্থান বিধানসভা নির্বাচনের আগে পদ্মাবতী রয়েছেন স্ব-মহিমায়৷ সম্মান বাঁচাতে জীবন্ত আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার মিথ ঘিরে পদ্মাবতী মরুরাজ্যে অমর৷ আবার সিনেমার পদ্মাবত কল্যাণে সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশি জীবন্ত৷ তীব্র রাজপুত ভাবাবেগ ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলছে ? উত্তর বন্দি হবে শুক্রবার৷ নির্বাচনে তাই রানি পদ্মাবতী (পদ্মিনী) বনাম মুখ্যমন্ত্রী তথা ঢোলপুর রাজপরিবারের রানি বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার ছায়াযুদ্ধ চলছেই৷ দুই রানি আর তাঁদের কাহানি সেঁধিয়ে ঢুকেছে প্রতিটি ভোটারের হৃদয়ে৷

১৯৫২-১৯৭১ পর্যন্ত টানা কংগ্রেস থাকলেও প্রথম পরিবর্তন হয়েছিল ১৯৭৭ সালে৷ সেবার জয়ী হয়েছিল জনতা পার্টি৷ পরে আবারও দুই দফায় ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস৷ ১৯৯০ সালে এই রাজ্যে প্রথম ক্ষমতায় আসে বিজেপি৷ তারপর থেকে চলছে পালাবদল আর পরিবর্তনের হাওয়া৷ সেই রেশ ধরে এবার পরিবর্তনমুখী রাজপুতনার বাসিন্দারা নজর ঘুরিয়ে নিয়েছেন কংগ্রেসের দিকে৷ বিভিন্ন প্রাক নির্বাচনী রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজস্থানে তেমন কিছু মিরাক্যাল না হলে বিজেপির ক্ষমতা থেকে যাওয়া শুধু ভোট গণনার দিনের অপেক্ষা৷ ২০০টি বিধানসভার মধ্যে কারা কটা দখল করল সেটাই লক্ষণীয়৷

পড়ুন: এনডিএ থেকে পা বাড়িয়ে আরও এক জোট সঙ্গী

রাজপুতনার ঢোলপুর রাজপরিবারের কুলবধূ বসুন্ধরা৷ তাঁকে ঘিরে বিজেপির অভ্যন্তরেই রোষ বেড়েছে৷ এই সুযোগটি নিতে মরিয়া কংগ্রেস৷ দলের তরফে নেতৃত্বে রয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট ও নবীন নেতা সচিন পাইলট৷ পরিবর্তনের ধাক্কায় কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম দুই দাবিদার হচ্ছেন তাঁরাই৷
জয়পুর থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ পত্রের রিপোর্টেও বলা হয়েছে পরাজয়ের গন্ধ পেয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া৷ তিনি নিজে মধ্যভারতের সিন্ধিয়া রাজপরিবারের কন্যা৷ এবং সিন্ধিয়া পরিবারের জবরদস্ত কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার পিসি৷ যদিও ভাইপো জ্যোতিরাদিত্য রাজস্থানে নজর করেন না৷ তবুও লড়াইটা যেন রাজস্থানের সীমান্ত পেরিয়ে চলে গিয়েছে মধ্যপ্রদেশের সিন্ধিয়া পরিবারের ঘরেই৷

এ তো গেল সমকালীন রানি তথা মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরার কথা৷ তাঁর সঙ্গেই ক্রমাগত পাক খেয়ে চলেছে পদ্মাবতীর ইতিহাস৷ সিলভার স্ক্রিনে রানি পদ্মাবতীর অপমান সইতে পারব না বলে প্রকাশ্যে জহরব্রত( স্বেচ্ছায় আগুনে পুড়ে মরা) পালনের হুমকি দিয়েছিল শতাধিক রাজপুতানি৷ পরে অবশ্য তেমন কিছু করতে হয়নি৷ উগ্র রাজপুত সংগঠন কারনি সেনার নেতৃত্বে জন আন্দোলন গড়ে উঠেছিল৷ হিংসাত্মক সেই আন্দোলনে লেগেছিল হিন্দুত্ববাদী আবেগ৷ সেটা ভোটবাক্সে অনেক সমীকরণ তৈরি করে গিয়েছে৷

পড়ুন: ‘ধর্ম নিয়ে রাজনীতি … সব চেয়ে বড় দূর্নীতি’

মরু রাজ্যের মূল চাহিদা জল৷ তাকে ঘিরে চলেছে তীব্র সরকার বিরোধী ক্ষোভ বিক্ষোভ৷ তাতে সামিল হয়েছেন অসংখ্য কৃষক৷ সেটাও লক্ষণীয়৷ কারণ এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে বামেরা৷ এর ফলে বেশ কয়েকটি বিধানসভায় ফ্যাক্টর হয়েছে বামেরা৷ তবে রাজপুতনার আবেগ বলে কথা-সেটা গিয়ে মেশে রানি পদ্মাবতীর পদতলে৷

বালিয়াড়ির ফাঁকে ফাঁকে তবুও যেন লড়াইটা বড় বেশি রানি কেন্দ্রিক৷

----
--