৭১-এর যুদ্ধে ফাইটার জেট উড়িয়েছিলেন প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী রাকেশ শর্মা

৬০ পেরিয়ে ৭১-এর গোড়ায় এখন তিনি। আজও লোকজন এসে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি কি ভগবানকে দেখেছেন?’ না তিনি হয়ত ভগবানকে দেখেননি, তবে ভারতীয়দের জন্য তিনি একরকম ভগবানই। তাঁর নাম রাকেশ শর্মা। প্রথম ভারতীয় মহাকাশচারী।

তাঁর আকাশে ওড়া শুরু ভারতীয় বায়ুসেনার হাত ধরে। মাত্র ২১ বছর বয়সে বায়ুসেনায় যোগ দেন তিনি। ফাইটার জেট ওড়ানোর দায়িত্ব পান তিনি। ১৯৭১-এর যুদ্ধে যুদ্ধবিমান উড়িয়েছিলেন তিনি। তখন বয়স প্রায় ২৩। এর বছর দশেক বাদেই আকাশ ছেড়ে তাঁর উড়ান পৌঁছে যায় মহাকাশে। প্রথম ভারতীয় হিসেবে মহাকাশ যাত্রা করেন তিনি। স১৯৮৪ সালে স্পেস স্টেশনে আটদিন কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসেন তিনি।

সেটা ছিল ভারতের ইতিহাসে সবথেকে খারাপ একটা বছর। দেশভাগের পর সেবারই প্রথম ধর্মীয় সংঘর্ষ দেখেছিল দেশ। ‘শিখদাঙ্গা’য় জ্বলছিল ভারত। শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের শেষ করে দিতে ইন্দিরা গান্ধীর অভিযান। স্বর্ণমন্দির ছারখার করে দিয়েছিল ভারতীয় সেনা। আর প্রতিশোধ নিতে খুন হন ইন্দিরা গান্ধী। সবটাই ওই বছরে। বছর শেষ হওয়ার আগে বিশ্বের সবথেকে ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনার সাক্ষী থাকতে হয় এদেশকে। ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান কয়েক হাজার মানুষ। আর এই ক্ষতবিক্ষত দেশে আশার আলো দেখান এই যুবক।

- Advertisement -

৮৪ সালের আগেই ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন একজন ভারতীয় মহাকাশে যাক। আর তার জন্য বন্ধু দেশ রাশিয়ার সাহায্য চেয়েছিলেন তিনি। অভিযানের জন্য ৫০ জন পাইলটকে বেছে নেওয়া হয়। রাকেশ শর্মা তাঁর মধ্যে একজন। তিনি আজও মনে করতে পারেন, পরীক্ষা নেওয়ার জন্য এয়ারফোর্সের একটা ঘরে তিনদিন ধরে বন্ধ করে রেখে দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। কৃত্রিম আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছিল। ক্লসট্রোফোবিয়া হয় নাকি, সেটা দেখার জন্যই এই পরীক্ষা। ফাইনাল পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হয় দু’জনকে। ট্রেনিং-এর জন্য তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়ায়।

মস্কো থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে স্টার সিটিতে পাড়ি দেন রাকেশ শর্মা ও রবিশ মালহোত্রা। ভারতে এই ট্রেনিং-এর জন্য কোনও সুবিধা ছিল না। তাই সেখানে যেতে হয় তাঁদের। দ্রুত রাশিয়ান ভাষা শিখতে হয় তাঁদের। দিনে ৬-৭ ঘণ্টা ক্লাস করতে হয় তার জন্য। স্থানীয় খাবার দিয়ে বিশেষ ডায়েটে রাখা হয় তাঁদের। প্রত্যেকদিনের ডায়েট ৩২০০ ক্যালোরিতে বেঁধে দেওয়া হয়। অলিম্পিকের ট্রেনার এসে তাঁদের শক্তির পরীক্ষা নেন। ট্রেনিং চলাকালীনই রাকেশ শর্মাকে বলে দেওয়া হয়, তাঁকেই বেছে নেওয়া হয়েছে এই মিশনের জন্য। যে দেশে মহাকাশ অভিযানের কোনও ব্যবস্থা ছিল না, যে দেশে থেকে রাকেশ শর্মা নিজেও কোনোদিন স্বপ্ন দেখেননি যে তিনি মহাকাশচারী হবেন, তাঁর জন্য এটা অবশ্যই চরম সাফল্যের।

৩ এপ্রিল, দুই রাশিয়ান অ্যাস্ট্রোনট জুরি মালিশেভ ও গেন্নাদি স্ট্রেকালোভকে নিয়ে উড়ে যায় সোভিয়েত রকেট। টেলিভিশন জুড়ে ভেসে ওঠে তাঁদের ছবি। তবে রাকেশ শর্মার কথায়, এই মহাকাশযাত্রা নাকি কোনও ব্যাপারই ছিল না। এতটুকুও ভয় পাননি তিনি। তিনিই প্রথম যিনি মহাকাশে যোগা প্র্যাকটিস করেন। মস্কো অডিটোরিয়াম থেকে একটা লাইভ লিংকে ২৫০০ দর্শকের সামনে কথা বলেন তিনি।

সেই আবছা লাইভ লিংকে ইন্দিরা গান্ধী জিজ্ঞাসা করেন, ‘মহাকাশ থেকে ভারতকে কেমন লাগছে?’ তাঁর উত্তর ছিল ‘সারে জাঁহা সে আচ্ছে’। পরে এক সাক্ষাৎকারে শর্মা জানান, মহাকাশ থেকে ছবির মত সুন্দর লাগে ভারতকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের তিনদিক জুড়ে লম্বা উপকূল, নীল সমুদ্র। রয়েছে নদী, জঙ্গল, মরুভূমির সোনালি বালি। হিমালয়ের উপত্যকাগুলোকে বেগুনি দেখায়। আর রয়েছে বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়ো।’

৩৩ বছর পার। তিনি কি আবারও যেতে সেই ‘এলিয়েন’দের দেশে। তাঁর উত্তর, হ্যাঁ। তবে এবার তিনি নিছক বেড়াতে যাবেন। আগের বার অনেক কাজ ছিল।

তথ্যসূত্র- BBC

Advertisement ---
---
-----