RAW ৪৬

৪৭ বছর আগে গঠিত হয়েছিল ভারতের গুপ্তবাহিনী রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং বা ‘র’৷১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর৷ এই সংস্থার প্রথম অধিকর্তা ছিলেন রামেশ্বর নাথ কাও৷ ১৯৬২ সালের চিনা আগ্রাসন এবং

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

১৯৬৫ সালে পাক হানাদারির ফলস্বরূপ ভারতের একান্ত নিজস্ব একটি গুপ্তচর বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি করে অনুভূত হয়েছিল৷ বিশেষ করে, ১৯৬৫-র যুদ্ধের পর এই ধরনের গোয়েন্দা সংস্থা গড়ে তোলার উপর জোর দিয়েছিলেন ভারতের তদানীন্তন সেনাপ্রধান জেনারেল জয়ন্ত চৌধুরী৷ সাধারণভাবে এমন ধারণা প্রচলিত যে, ‘র’ গঠিত হওয়ার পিছনে আমেরিকার সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি অর্থাৎ সিআইএ এবং ব্রিটিশ গুপ্তচর সংস্থা এমআই-সিক্সের একটি বড় ভূমিকা ছিল৷তা কিন্তু পুরোপুরি সত্য নয়৷হতে পারে, কাঠামোগতভাবে এই দুই সংস্থার সঙ্গে ‘র’-এর অনেক মিল আছে৷ কিন্তু বাস্তবে ‘র’ গড়ে ওঠার পিছনে ভারতকে অনেক বেশি সহায়তা জুগিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের গোপন পুলিশ ও গুপ্তচর বাহিনী কেজিবি৷

এই বাহিনী গড়ে তোলার জন্য পিছন থেকে কাওকে অকাতরে সাহায্য করে সব থেকে বেশি ভরসা জুগিয়েছিলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী৷কাও যে তাঁকে নিরাশ করেননি তার সব চাইতে বড় প্রমাণ ১৯৭১-এ স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম৷একাত্তরে পাকিস্তান শুধু সামরিকভাবেই পর্যুদস্ত হয়নি, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেও তারা ধরাশায়ী হয়েছিল৷আন্তর্জাতিক স্তরে মার্কিন প্রশাসন ও লালচিনের মদত থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান যে ভারতকে কাবু করতে পারেনি তার একটি বড় কারণ যেমন ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক ও ফিল্ড মার্শাল মানেকশর সামরিক পরিকল্পনার সাফল্য, ঠিক তেমনই আর একটি কারণ হল ইন্দিরা গান্ধীর অনুগত অফিসার কাওয়ের গড়া ‘র’-এর কুশলী ও সুনিপুণ তৎপরতা ৷

- Advertisement -

পরবর্তীকালেও বিভিন্ন সংকটের মোকাবিলা ‘র’ করেছে৷ যেমন, ইন্দিরা গান্ধীর আমলেই পোখরানে ভারতের প্রথম পরমাণু পরীক্ষার কথা যে কাকপক্ষীও ভারত সরকার নিজে ঘোষণা করা না পর্যন্ত টের পায়নি, তার পিছনেও ছিল এই ‘র’-এরই চূড়ান্ত গোপনীয়তা রক্ষার নেটওয়ার্ক৷

দিন যত গিয়েছে, অত্যন্ত গোপন বা কভার্ট অপারেশনেও ‘র’ তার সাফল্য দেখিয়েছে৷ বিশেষ করে, পাঞ্জাবে খলিস্তান সন্ত্রাসবাদীদের দমন করতে ‘র’ নিজস্ব নেটওয়ার্ক আমেরিকাতেও মাটিতেও বিস্তার করেছিল৷তারা সেখানে এমন একটা ভেক ধরেছিল, যেন খলিস্তানি সন্ত্রাসবাদীদের রিক্রুট করতে কোনও গোপন ডেরা তৈরি করেছে পাক সামরিক গুপ্তচর বাহিনী আইএসআই৷অনেকটা রুশ বিপ্লবের পর লেনিনের অনুগত গোয়েন্দা প্রধান ফেলিক্স দজেরঝিনস্কি-র কায়দা আর কি! রাশিয়ার বাইরে, বিশেষ করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সে বসবাসকারী রাশিয়ানদের মধ্যে কারা জারের অনুগত, তা খুঁজে বের করার জন্য দজেরঝিনস্কিই প্রথম বিদেশের মাটিতে গড়েছিলেন জারপন্থী রুশ প্রবাসীদের একটি অ্যান্টি-বলশেভিক সংগঠন৷যদিও আসলে তা ছিল ফাঁদ৷ স্পাই-ক্যাচার৷

লেনিনের খোদ বলশেভিক সরকারেরই গোপন পুলিশ বাহিনী৷প্রায় সেই একই কৌশল খাটিয়ে ১৯৮০-র দশকে আমেরিকার মাটিতে ঘাঁটি গেড়ে খলিস্তানি চক্রান্তের একাধিক ব্লু-প্রিন্ট বানচাল করে দেয় ‘র’৷বিশেষ করে, পাকিস্তানি আইএসআইয়ের সঙ্গে খলিস্তানিদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ তারা ছিন্ন করে দিতে সক্ষম হয়৷ঠিক একইভাবে সিয়াচেন হিমবাহে পাকিস্তানি হানাদারির পূর্বাভাস দিয়েছিল ‘র’-ই৷সেই খবর আগে পেয়ে গিয়েছিল বলেই ভারতের সেনাবাহিনী অতি দ্রুত ‘অপারেশন মেঘদূত’ চালায় এবং সিয়াচেন হিমবাহকে বরাবরের জন্য পাকিস্তানের গ্রাস থেকে রক্ষা করে৷বিদেশেও ‘র’-র সাফল্যের উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে৷ অপারেশন লাল ডোরা৷ ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের গণতন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী অনিরুদ্ধ জগন্নাথের সরকারকে সামরিক অভ্যুত্থানের হাত থেকে রক্ষা করতে ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে এই অভিযান সফল হয়েছিল ‘র’-এরই নেতৃত্বে৷

তবে এই ‘র’কেও নানা সময়ে কলঙ্কের ভাগীদার হতে হয়েছে৷ যে কোনও দেশের গুপ্তচর বাহিনীকেই এ ধরনের ফ্যাসাদে পড়তে হয়৷যেমন, এলটিটিই-র বিরুদ্ধে লড়ার সময় র-এরই ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক কর্তা উন্নিকৃষ্ণন ভারত তথা তার নিজের সংস্থার নাম ডুবিয়ে দেন৷মধুচক্রের ফাঁদে পড়ে বহু গোপন তথ্য তিনি মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-কে জুগিয়ে দেন৷সিআইএ-র কাছ থেকে সেইসব তথ্য পাচার হয়ে যায় এলটিটিই-র মদতদাতা ও প্রশিক্ষক ইজরায়েলি গুপ্তচর বাহিনী মোসাদের কাছে৷ যার ফলে প্রভাকরণের এলটিটিই-র যেমন সুবিধা হয়, ঠিক তেমনই উৎখাত হতে হয় জাফনা উপদ্বীপের তামিলবাসীর নির্বাচিত সরকার ইপিআরএলএফকে৷

পরবর্তীকালেও ঘটেছে এ রকম একাধিক ঘটনা৷ দুর্নীতি এবং স্বজনপোষণ সহ আর্থিক কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়েছে ‘র’-এর একাধিক কর্তার নাম৷ ‘র’-এর এক কর্তব্যনিষ্ঠ পদস্থ মহিলা অফিসারকে সংস্থারই বিভিন্ন মহল থেকে এমন হেনস্তা করা হয়েছিল যে তিনি শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সামনে আত্মহত্যা করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন৷ বিভিন্ন মিডিয়াতেও তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল৷ শেষ পর্যন্ত গত বছর সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ওই অফিসার ভারতের নাগরিক হিসাবে তাঁর পূর্ণ মর্যাদা ফিরে পান৷

তা সত্ত্বেও বহু ভাষা, ধর্ম-বর্ণ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সহ বিপুল জনসংখ্যার দেশ এই ভারতে ‘র’-এর মতো বাহিনীর প্লাস পয়েন্টের পাল্লা এখনও পর্যন্ত মাইনাসের চাইতে অনেক বেশি ভারী৷কাশ্মীরে পাক আইএসআইয়ের মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বাড়বাড়ন্ত রুখতে ‘র’-এর ধারাবাহিক চোরাগোপ্তা অভিযান ‘অপারেশন চাণক্য’র সাফল্য যে কোনও দেশের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা গুপ্তচর বাহিনীর কাছে ঈর্ষণীয়৷

Advertisement
---