মহাবীর কোলিয়ারির জলবন্দি শ্রমিকদের উদ্ধারে ‘ক্যাপসুল’ নজির

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং গুহায় আটকে পড়া ১২ খুদে ফুটবলার ও তাদের কোচকে জীবন্ত ফিরিয়ে আনতে শুরু হয়েছে উদ্ধার অভিযান৷ টানা পনের দিন তারা গুহাবন্দি৷ বন্যার জল ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে গুহার বাইরে বের হওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব৷ এই পরিস্থিতিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সেই তেরো জনকে বাঁচাতে মরিয়া থাই সরকার৷ বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা৷

এরকমই একদিন সারা দুনিয়ার নজর ছিল রানিগঞ্জের মহাবীর কোলিয়ারির দিকে৷ খনির গর্ভে আটকে পড়া কয়লা শ্রমিকদের উদ্ধারের প্রতিটা মুহূর্ত ছিল দমবন্ধকর৷ বিশ্বের খনি দুর্ঘটনা ইতিহাসে তো বটেই যে কোনওরকম উদ্ধার অভিযানে এই ঘটনা এক মাইলফলক৷

থাইল্যান্ডের গুহায় যারা আটকে পড়েছে তাদের উদ্ধারে ব্যবহার হচ্ছে জিপিএস প্রযুক্তি৷ গুহার অভ্যন্তরে বিশাল জলস্রোতের একপাশে কোনরকমে জড়সড় হয়ে থাকা খুদের দল ধরে রেখেছে দৃঢ় মানসিকতা৷ তাদের মনোবলই উদ্ধারকারীদের অন্যতম শক্তি৷ কী করে সেখান থেকে তাদের বের করা হবে ? এই প্রশ্ন ঘুরছে৷ প্রকৃতির তাণ্ডব ও বৃষ্টির জেরে অনবরত জল ঢুকছে গুহায়৷ বারে বারে ব্যহত হচ্ছে উদ্ধার অভিযান৷ উৎকণ্ঠার প্রহর পার করছে বিশ্ব৷

- Advertisement -

প্রায় তিন দশক আগে অনেকটা এমনই ঘটনার সাক্ষী ছিলেন ভারতবাসী৷ ১৯৮৯ সালের ঘটনা৷ এখনকার পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জের মহাবীর কোলিয়ারিতে ঘটে গিয়েছিল ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা৷ নভেম্বর মাস৷ শীতের চাদরে মুড়তে শুরু করেছিল ভারতের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য খনি অঞ্চলটি৷ ৮৯ সালের ১৩ নভেম্বরের দিন কোলিয়ারির ভিতর কয়লা কাটতে ঢুকেছিলেন শ্রমিকরা৷ ডিনামাইট চার্জ করে তার আগেই সুড়ঙ্গ পথ পরিষ্কার করা হয়েছিল৷ ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের(ইসিএল) মহাবীর কোলিয়ারি এরপরেই চলে এসেছিল খবরের শিরোনামে৷

কী ঘটেছিল সেবার ?
২৯ বছর আগের মুহূর্ত এখনো তাড়া করে রানিগঞ্জবাসীর কাছে৷ দিনের পর দিন খনি শুধুই চেনা মুখগুলোর ঘরে ফেরার দিকে তাকিয়েছিলেন সবাই৷ জানা যায়, সেদিন ‘ব্লাস্টিং’ করার হুড়ুমুড়িয়ে জল ঢুকতে শুরু করেছিল কোলিয়ারির ভিতরে৷ খনিতে এই ধরণের জল জমে থাকা স্বাভাবিক ঘটনা৷ মাটির বিভিন্ন স্তরে আটকে থাকে জল৷ সেইরকম একটি মাটির স্তর ফেটে যাওয়ার কারণে মহাবীর কোলিয়ারি হয়ে গিয়েছিল মৃত্যুকূপ৷ এদিকে কয়লা কাটতে নামা শ্রমিকরা আটকে পড়েন খনির ভিতরেই৷

দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত৷ সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে জলস্তর৷ আদৌ কি বাঁচানো যাবে শ্রমিকদের ? খনি অঞ্চল থেকে এই প্রশ্ন ঘুরতে শুরু করে দেশের সর্বত্র৷ ইসিএলের দিকে এমনিতেই অভিযোগের আঙুল ওঠে৷ এই ঘটনায় তারা যে বেশি করে বিদ্ধ হবে সেটা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তবে সবকিছু ছাপিয়ে খনি গুহায় আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবন বাঁচাতে শুরু হয়েছিল অভিনব লড়াই৷

সেদিনই দুপুর নাগাদ পাম্প করে জল বের করার কাজ শুরু হয়৷ কিন্তু সেটা দিয়ে পুরোপুরি জল টেনে বের করা সম্ভব হয়নি৷ এদিকে খনি গুহার ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকরা মাটির স্তরের মধ্যেই একটি উঁচু স্থানে যেতে পেরেছিলেন৷ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল যোগাযোগ৷ পার হচ্ছিল সময়৷ উদ্ধারের জন্য বিফল হয় একাধিক প্রচেষ্টা৷ এরপরেই শুরু করা হয় অভিনব উপায়৷

দুর্ঘটনার পরের দিন থেকে ঘটনাস্থলের কিছু দূরে মাটিতে গর্ত করে (বোরিং) ক্যাপসুল লিফট নামানোর চেষ্টা শুরু হয়৷ সেই সঙ্গে শুরু হয় টানটান উত্তেজনা৷ খনির ভিতরে আটকে থাকা শ্রমিকরা জীবন-মৃত্যুর টানাটানিতে পড়েছিলেন৷ বোরিং করে বিভিন্ন উপায়ে তাদের কাছে শুকনো খাবার, পানীয় জল পাঠানো হয়৷ নিচ থেকে তাঁরা বলে পাঠান-ভালো আছি..

অভিনব উপায়ের দ্বিতীয় পর্যায়টি আরও চমকপ্রদ৷ আটকে পড়া শ্রমিকদের অবস্থান মোটামুটি নির্ণয়ের পর মাটি খুঁড়ে ক্যাপসুল লিফট নামানোর কাজ শুরু হয়৷ সেই পদ্ধতি কাজে দেয়৷ ততদিনে পাঁচটি দিন কেটে গিয়েছে৷ অবশেষে ক্যাপসুল লিফট নামানো সম্ভব হয়৷ এই উদ্যোগের আবিষ্কার করে রীতিমতো নায়ক হয়ে গিয়েছিলেন চিফ মাইনিং ইঞ্জিনিয়র যশবন্ত সিং গিল৷

তাঁর নির্দেশেই পুরো উদ্ধারকাজ পরিচালনা হয়৷ হাজারে হাজারে মানুষ মহাবীর কোলিয়ারির চারপাশে জড় হয়েছেন৷ কেটে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা৷ পার হচ্ছে দিন৷ অবশেষে এল সাফল্য৷ ১৬ নভেম্বর খুব ভোরে শুরু হল আসল উদ্ধার অভিযান৷ ক্যাপসুল লিফট খনি গর্ভে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভব হল৷ তাতে চড়েই বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন আটকে পড়া শ্রমিকরা৷

অভিনব উপায়ে ৬৫ জন শ্রমিকের জীবন বাঁচিয়ে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন যশবন্ত সিং গিল ও তার সহকর্মীরা৷ পরে তাঁকে বিশেষ পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়৷ আশির দশকে রানিগঞ্জের মহাবীর কোলিয়ারি দুর্ঘটনা ও খনি গুহা থেকে শ্রমিকদের বেঁচে ফিরে আসা অভিনব মুহূর্ত৷ তিন দশকের মাথায় সুদূর থাইল্যান্ডের গুহার ভিতরে একইরকমভাবে জলবন্দি হয়ে থাকা ১৩টি জীবন বাঁচানোর লড়াই তেমনই সাফল্য আনুক৷

Advertisement ---
---
-----