ইন্দিরার প্রতি আনুগত্যের জন্যই আরপি গোয়েঙ্কার হাজতবাস

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় : রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কার দুর্বলতা ছিল নেহরু পরিবারের প্রতি ৷ ইন্দিরা গান্ধীর হয়ে প্রচারের সরঞ্জাম ছাপিয়ে সত্তরের দশকে তার ডাক নাম হয়ে গিয়েছিল ‘পোস্টার গোয়েঙ্কা’৷ প্রিয়দর্শিনীর প্রতি আরপিজি-র এই আনুগত্যের জন্য চরম মূল্য দিতে হয়েছিল বৈকি৷ ১৯৭৭ সালে ইন্দিরার পরাজয়ের পর মোরারজি দেশাইয়ের জনতা সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার শুধু তাঁর বাড়িই তল্লাসি হয়নি জেলেও যেতে হয়েছিল এই শিল্পপতিকে৷

১৯৭৭ সালের ৩অক্টোবর পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রমাপ্রসাদকে ঠাঁই নিতে হয়েছিল নৈনিতালের জেলখানায়৷ পুজো আসন্ন আর কয়েকদিন বাদেই দেওয়ালি উৎসবে মাতবে গোটা দেশ৷ সকালে পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে এসেছে জেলে৷ ওই সেলে তিনি একাই৷ আর কোনও সঙ্গী নেই৷ পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করতে এলে বেশ কিছুক্ষণ উত্তেজিত হয়ে তর্কাতর্কি এবং ফোনাফুনি করার পরে তিনি হতাশ হয়ে বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর ওইদিন আর জামিন পাওয়া সম্ভব নয়, ঠাঁই নিতে হবে গারদের ওপারেই৷

কোটিপতি ধনী ওই ব্যবসায়ী জেলের মেঝেটায় বসে বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করেছিলেন৷ এক পুলিশকর্মী দয়াপরবশত হয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন একটা কম্বল৷ কিন্তু মোটা ওই ময়লা ফুটো কম্বলের দুর্গন্ধে তাঁর ঘা ঘিন ঘিন করে উঠেছিল৷ ওই অবস্থায় তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না ওটা পেতে শোবেন না গায়ে দেবেন৷

- Advertisement -

তবে নৈনিতালে গোয়েঙ্কাকে যখন পুলিশ ধরছে ঠিক তখনই সেখান থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দিল্লিতে এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটতে চলেছে ৷ দেশের রাজধানীতে সিবিআই রওনা দিয়েছে শ্রীমতী গান্ধীর বাসভবন ১২ উইলিংডন ক্রিসেন্ট (12 Willingdon Crescent)-এর দিকে ৷ প্রথমে ঠিক  হয়েছিল ১ অক্টোবরই প্রিয়দর্শিনীকে গ্রেফতার করা হবে ৷

কিন্তু শনিবার গ্রেফতার করলে জটিলতা বাড়তে পারে এবং ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধী জন্মজয়ন্তী৷ ফলে একেবারে ৩ অক্টোবর প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রেফতারের করা হবে বলে ঠিক হয়৷ সেই মতো পুলিশ অফিসারেরা গেলে ইন্দিরা চেয়েছিলেন তাঁকে যেন হাতকড়া পরিয়ে গ্রেফতার করা হয় তবে সে অনুরোধ রাখা হয়নি৷ সেদিন তাঁর সঙ্গে ইন্দিরা মন্ত্রীসভার চার মন্ত্রী কেডি মালব্য, এইচ আর গোখেল, পিসি শেঠি এবং ডি পি চট্টোপাধ্যায়কেও গ্রেফতার করেছিল সিবিআই৷

ইন্দিরার পাশাপাশি তাঁর ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিদের দিকেও নজর রেখেছিল সরকার৷ গ্রেফতারের খবর আগাম পেয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন কৃষ্ণকুমার বিড়লা৷ বেশ কয়েকজন ছিলেন ওই এফআইআর তালিকায় ৷ একটা দিন জেলে কাটিয়ে ছাড়া পেয়েছিলেন রমাপ্রসাদ৷ কিন্তু সেই একদিনের হাজতবাসই ছিল যথেষ্ট বলে মনে করতেন এই শিল্পপতি৷ তবে গ্রেফতার হওয়ার আগে থেকে তিনি শঙ্কিত ছিলেন একটা ব্যাপারে- এ নিয়ে পরিবার কি বলবে? তাছাড়া তাঁর আর কোনও ভয় ছিল না বলেই দাবি করতেন৷ এটাও ঘটনা জনতা জমানায় (১৯৭৭-৭৯) প্রশাসন তাঁর বাড়িতে ৪৩বার তল্লাসি চালিয়েছিল৷

তবে ওই সময় গ্রেফতারের চেয়েও তাঁকে বেশি আঘাত করেছিল পরিচিত অন্যান্য ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের আচরণ৷ গ্রেফতার হওয়ার আগে থেকেই তিনি যেন তাঁদের কাছে অচ্ছুৎ হয়ে গিয়েছিলেন৷ বিশেষ করে বম্বের শিল্পপতিদের আচরণ তাঁকে অবাক করত৷ যারা এক সময় তাঁর সঙ্গে যেচে কথা বলতেন এবং কারও সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া উদ্দেশ্যে তারাই যেন কেমন করে তাঁকে এড়িয়ে চলতে লাগলেন৷ ব্যবসা ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে৷ অন্য সংস্থা কেনার ব্যাপারেও তখন তিনি ধাক্কা খেয়েছিলেন৷ আসাম ফ্রন্টিয়ার কেনার সব কিছু ঠিক হয়ে ১৬ মার্চ অনুমোদন পেয়ে যান৷ কিন্তু লোকসভা ভোটের ফলে সরকার বদলে যাওয়া সেই লেনদেন আটকে যায়৷ অথচ ইন্দিরা গান্ধীর আমলে যে বাজাজ অটোর সম্প্রসারণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল নতুন প্রশাসন রাহুল বাজাজকে সেই সম্প্রসারণ অনুমোদন করে দেয়৷

এটাও ঘটনা খোদ ইন্দিরা গান্ধীও রমাপ্রসাদকে সতর্ক করেছিলেন এভাবে যেন কংগ্রেস প্রতি আনুগত্য না দেখাতে৷ কারণ ভোটের ঠিক আগে ১মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হতে ইন্দিরা সরাসরি জানিয়ে ছিলেন, তিনি হারলে আরপিজির মতো অনুগত ব্যবসাদারেরা বেকায়দায় পড়বেন তাই উচিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যালান্স করে চলা৷ কিন্তু জবাবে আরপিজি জানিয়েছিলেন, তাঁর একটাই ভোট এবং সেটা তিনি শ্রীমতী গান্ধীকেই দেবেন৷ গ্রেফতারের পরে এক সময় ইন্দিরা দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন তার জন্যই গোয়েঙ্কার এমন দশা হল বলে৷

রমাপ্রসাদের এমন আনুগত্যের পিছনে ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়া লুকিয়ে আছে বলে সেই সময় অনেক শিল্পপতিই মনে করতেন৷ আরপিজি তা নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়তেন৷ সেই সব সমালোচক শিল্পপতিদের মধ্যে অন্যতম হলেন জেআরডি টাটা৷ তিনি ইন্দিরা বিরোধী হয়ে উঠেছিলেন সেই সময় কারণ এই শিল্পগোষ্ঠীর টাটা কেমিক্যালস সারের কারখানা গড়তে গেলে ইন্দিরা সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেন৷ ওই টাটা কর্তা মনে করতেন ওই প্রকল্পটি যদি বিড়লা অথবা গোয়েঙ্কাদের হত তাহলে এমন ভাবে তা নাকচ হত না৷ জেআরডি-র সঙ্গে ইন্দিরা নাকি কোনও দিনই গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেননি ৷

দেখা হলে জেআরডি কাছ থেকে কোনও পরামর্শ চাইতেন না বরং তাঁকে সামনে বসিয়ে কথা বলতে বলতে চিঠিপত্রের খাম খুলতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে৷ কিন্তু ওই প্রধানমন্ত্রীই আরপিজিকে যোজনা কমিশনে আসার জন্য অফার দিয়েছিলেন৷ ইন্দিরার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক পরিসরে থাকা দুই অনুগত প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং আর কে ধাওয়ানের সঙ্গে রমাপ্রসাদের বন্ধুত্বের সুবাদে তিনি আদৌ কোনও ব্যবসায়িক সুবিধা পাননি বলেই দাবি করতেন আরপিজি৷

তথ্য ঋণ স্বীকার
Business Maharajas By Gita Piramal
Tycoon who didn’t mind jail for Indira,By MANI SANKAR MUKHERJI ( The Telegraph)
October 4, 1977, Forty Years Ago: Mrs Gandhi Arrested (Indian Express)
Indira Gandhi’s arrest seen as Janata Party’s first major political blunder(India Today)

Advertisement ---
---
-----