মস্কো: নির্ধারিত সময়ে ম্যাচের ফল ছিল ১-১৷ দুই অর্ধে ১৫ মিনিট করে মোট আধ ঘণ্টার এক্সট্রা টাইমেও স্কোর লাইনে বদল হয়নি৷ স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচের নিস্পত্তি হয় পেনাল্টি শুট-আউটে৷ স্পট কিকে স্পেনকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় রাশিয়া৷

‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে রাশিয়ার বিরুদ্ধ প্রি-কোয়ার্টারে হোম জার্সি পরে মাঠে নামার সুযোগ পায় স্পেন৷ সেদিক থেকে ঘরের মাঠে অ্যাওয়ে টিম হিসাবেই মাঠে নামতে হয় রাশিয়াকে৷ এক ঝাঁক আশা-আশঙ্কা সঙ্গে নিয়েই লড়াই শুরু দু’দলের৷ ধারে ও ভারে রাশিয়ার থেকে সব দিক দিয়েই এগিয়ে ছিল স্পেন৷ তবু বিশ্বকাপের ইতিহাস তাদের বিপক্ষে ছিল৷ কেননা, এর আগে বিশ্বকাপে আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে কখনও জেতেনি তারা৷ চারবার হোস্ট টিমের মুখোমুখি হয়ে চারবারই হেরেছে স্পেন৷

Advertisement

তবু লুজনিকির গ্যালারি ছাড়া ম্যাচের আগে রাশিয়াকে নিয়ে বাজি ধরার লোক ফুটবলবিশ্বে খুব কমই ছিল৷ এহেন রাশিয়া যে এমন চমকে দেওয়া ফুটবল উপহার দেবে, তা বোধহয় কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি৷

শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে স্পেন৷ তবে সুযোগ সন্ধানী রাশিয়া একতরফা আত্মসমর্পণ করার মেজাজে ছিল না কখনই৷ বল দখলের লড়াইয়ে কোণঠাসা হলেও চকিত প্রতিআক্রমণে মাঝে মধ্যেই স্পেনের রক্ষণে ত্রাশ সৃষ্টি করে রুশরা৷

তুলনামূলক দূর্বল প্রতিপক্ষ৷ তা সত্ত্বেও নির্ধারিত ৯০ মিনিটে ম্যাচের ভাগ্য নিজেদের অনূকূলে টেনে নিতে পারেনি ২০১০’এর বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা৷ আয়োজকদের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টারের শুরুতেই ১-০ গোলে এগিয়ে যায় স্পেন৷ তা সত্ত্বেও ব্যবধান ধরে রাখতে ব্যর্থ রামোস-পিকে-ইনিয়েস্তারা৷ নিজেদের থেকে অনেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের চাপিয়ে দেওয়া গোল প্রথমার্ধেই শোধ করে ম্যাচে ১-১ সমতা ফেরায় রাশিয়া৷ নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ অমীমাংসিত থেকে যাওয়ায় এক্সট্রা টাইমে গড়ায় স্পেন বনাম রাশিয়া বিশ্বকাপের তৃতীয় প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল৷

ম্যাচের ১২ মিনিটের মাথায় রামোসকে আটকাতে গিয়ে অজান্তে নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে বসেন রাশিয়ান ডিফেন্ডার সার্জেই ইগনাশেভিশ৷ বক্সের বাঁ-দিক থেকে ইস্কোর ফ্রি-কিক উড়ে আসে রাশিয়ার তেকাঠির সামনে৷ সেকেন্ড পোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রামোসকে মার্কিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইগনাশেভিশ৷ স্প্যানিশ তারকাকে আটকাতে চেষ্টায় কসুর করেননি তিনি৷ রামোসকে সঙ্গে নিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়ার সময় বল এসে লাগে ইগনাশেভিশের বুটের ডগায় এবং তা রাশিয়ার জালে জড়িয়ে যায়৷

চলতি বিশ্বকাপে এই নিয়ে দু’টি আত্মঘাতী গোল করে বসে রুশরা৷ ১৯৬৬ সালে বুলগেরিয়ার পর রাশিয়াই একমাত্র দেশ যারা একই বিশ্বকাপে একাধিক আত্মঘাতী গোল করে৷ ৩৯ বছরের দোরগোড়ায় কড়া নাড়া ইগনাশেভিশ বিশ্বকাপের ইতিহাসে আত্মঘাতী গোল করা সব থেকে বয়স্ক ফুটবলার৷

সার্জেইয়ের আত্মঘাতী গোলে স্পেন ১-০ এগিয়ে যায় ম্যাচে৷ তবে প্রথমার্ধেই লিড খোয়াতে হয় তাদের৷ ম্যাচের ৪০ মিনিটে নিজেদের বক্সেই হ্যান্ডবল করেন পিকে৷ রেফারি রাশিয়ার অনুকূলে পেনাল্টির নির্দেশ দেন৷ স্পট কিক থেকে গোল করতে ভুল করেননি অর্টেম জিউবা৷ পড়ে পাওয়া পেনাল্টি গোলে রাশিয়া ম্যাচে ১-১ সমতা ফেরায়৷

দ্বিতীয়ার্ধে দু’দলই বেশ কয়েকটা সুযোগ তৈরি করে৷ তবে তা থেকে গোল করতে পারেনি কেউই৷ ম্যাচের বয়স যত গড়িয়েছে, স্পেন মরিয়া আক্রমণ শানিয়েছে রাশিয়ার বক্সে৷ তবে রাশিয়ান গোলকিপার আকিনফিভ দূর্ভেদ্য হয়ে দাঁড়ানোয় স্পেনের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়৷

অতিরিক্ত সময়েও স্পেনের বেশ কয়েকটি আক্রমণ প্রতিহত হয় আকিনফিভের নির্ভরযোগ্য দস্তানায়৷ এক্সট্রা টাইমেও ম্যাচের ফলফল নির্ধারিত না হলে পেনাল্টি শুট আউটে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়৷ স্পেনের হয়ে প্রথম শটে গোল করেন অভিজ্ঞ ইনিয়েস্তা৷ রাশিয়ার হয়ে পাল্টা গোল করে স্পট কিকের লড়াই ১-১ করেন স্মোলোভ৷

স্পেনের হয়ে দ্বিতীয় শটে গোল করেন পিকে৷ পাল্টা গোল করে পোনাল্ট শুট-আউট ২-২ করেন ইগনাশেভিশ৷ স্পেনের হয়ে তৃতীয় শট নিতে আসেন কোকে৷ দুরন্ত আকিনফিভ সেভ করেন কোকের কিক৷ পাল্টা তৃতীয় শটে গোল করে রাশিয়াকে ২-৩ গোলে এগিয়ে দেন গোলোভিন৷

অধিনায়র রামোস স্পেনের চতুর্থ শট থেকে গোল করে স্কোরলাইন ৩-৩ করেন৷ জবাবি শটে গোল করে শুট-আউটের ফল ৩-৪ করেন শেরিশেভ৷ স্পেনের হয়ে মরণ-বাঁচন শেষ শট নিতে আসেন চলতি বছরে সব থেকে বেশি গোল করা স্প্যানিশ তারকা অ্যাসপাস৷ অনবদ্য ক্ষিপ্রতায় পা দিয়ে শট প্রতিহত করে ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন আকিনফিভ৷

নির্ধারিত সময়ে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচ পেনাল্টি শুট-আউটে ৪-৩ গোলে জিতে নেয় রাশিয়া এবং ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয়৷

স্পেনের বিরুদ্ধে জয়ের সুবাদে বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাস রচনা করে রাশিয়া৷ এর আগে বিশ্বকাপের এক্সট্রা টাইমে গড়ানো দু’টি নকআউট ম্যাচেই হারতে হয়েছিল তাদের৷ অবশ্য আরও একটা রেকর্ড অক্ষুন্ন থাকে এই ম্যাচেও৷ বিশ্বকাপে এর আগে শেষ চারবার আয়োজক দেশ পেনাল্টি শুট-আউটে জয় তুলে নিয়েছিল৷ রাশিয়া সেই ধারাটা বজায় রাখে লুজনিকিতে৷

----
--