অভিমানে, দুঃখে সরকারি সম্বর্ধনা ফেরালেন একুশের সিরাজুল

নিবেদিতা দে, কলকাতা: ১৯৯৩ সালের একুশে জুলাই৷ আজকের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৎকালীন যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঁচাতে গিয়ে চাকরি খুঁইয়েছিলেন কনস্টেবল সিরাজুল মণ্ডল৷ ঘটনার প্রায় ২৮ বছরের মাথায় মিডিয়ার প্রচারে শিরোনামে উঠে আসেন চাকরিহীন সিরাজুল৷ নড়ে-চড়ে বসে সরকার৷ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সিরাজুলের সঙ্গে রাইটার্সে দেখা করে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম৷ কিন্তু মন্ত্রীর দেওয়া এই আশ্বাসেরও প্রায় দেড় মাস অতিক্রান্ত৷ মন্ত্রীর দফতর থেকে আসেনি কোনও খবর৷ চাকরি ফিরে পাওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা তৈরি হয়েও যেন চরম দূরাশায় ভুগছেন গোবরডাঙার সিরাজুল মণ্ডল৷

সম্প্রতি রাজ্যের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু সংবর্ধনা দেবেন বলে লোক মারফত সিরাজুলকে আমন্ত্রণ জানান৷ কিন্তু সম্বর্ধনা দিয়ে তো আর পেট চলবে না৷ তাই সেই সম্মান অচিরেই ফেরান প্রাক্তন কনস্টেবল সিরাজুল মণ্ডল৷ তাঁর সাফ কথা, ‘‘বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে আমার ৮ জনের পেট চালাতে হয়৷ দিন মুজুরি খেটে, সাইকেলে করে ফেরি করে অতি কষ্টে দিন কাটে৷ তাই কোনও সম্বর্ধনা নিয়ে আমার কাজ নেই৷ আর সম্বর্ধনা দিতে হলে শুধু আমাকে কেন? সেদিনের ঘটনায় চাকরি খুইয়েছিলেন আরও তিনজন৷ তাদেরকেও ডাকতে হবে৷’’

চাকরি ফিরে পেলে আর বছর আস্টেক চাকরি করার সুযোগ পাবেন বড়জোড়৷ কিন্তু ক্রমশ বয়ে চলেছে সময়৷ বেড়ে চলেছে সিরাজুলের বয়স৷ তবু চাকরি ফেরার কোনও পথ দেখছেন না তিনি৷ চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে প্রায় আশা ছেড়েছেন৷ কারণ মন্ত্রী জানিয়েছিলেন শীঘ্রই ফের ডাকা হবে তাকে৷ প্রমাণ স্বরূপ সমস্ত কাগজ তিনি জমা করে এসেছেন মন্ত্রীর দফতরে৷ কিন্তু ডাক আসেনি৷ আদৌও সে ডাক আসবে কিনা তা নিয়ে চরম ভারাক্রান্ত সিরাজুলের মন৷ তার কথায়, ‘‘চাকরিটা ফিরে পেলে শেষ জীবনে ছেলে পুলে নিয়ে একটু সুখের মুখ দেখতে পারতাম৷’’

পয়সার অবাবে আইনি লড়াইয়ে ব্যর্থ সিরাজুল৷ তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সভাপতি মুকুল রায় থেকে বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক সকলের হাতেই চিঠি দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন সিরাজুল৷ কিন্তু কাজ হয়নি৷ কেউ উদ্যোগ নিয়ে মেটায়নি সিরাজুলের সমস্যা৷ খাদ্যমন্ত্রী তথা উত্তর ২৪ পরগনার জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানিয়েছেন, ‘‘চিঠি দিয়ে কিছু কাজ হয় না৷ চাকরি ফিরে পেতে গেলে স্বশরীরে আসতে হবে৷ সিরাজুল আমার কাছে না এসে মিডিয়ার সামনে হাইলাইট হতে চাইছে৷ কিন্তু লাইম লাইটে আসলেই চাকরি ফিরে পাওয়া যায় না৷’’

খাদ্যমন্ত্রীর এ হেন বক্তব্যে খাদ্যমন্ত্রীকে বালু দা সম্বোধন করে সিরাজুল জানিয়েছেন, ‘‘উত্তর ২৪ পরগনার দায়িত্বে রয়েছেন উনি, আমি ওনার এলাকার একজন তৃণমূলকর্মী৷ আমি নগরোন্নয়নে মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করেছিলাম উনি সেটাও জানেন৷ কিন্তু তার পরেও বালু দা একবার কারোর মারফতও আমার খবর নেয়নি৷ তাহলে আমি কোন মুখে ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়াবো৷’’

দীর্ঘদিনের না পাওয়ার চাপা অভিমান থেকেই হয়তো ‘বালু দা’ কাছে যেতে পারেননি সিরাজুল৷ কিন্তু তবু চাকরিটা ফিরে পেলে হয়তো বেঁচে যাবে জীবন টা৷ এটাই আশা তার৷ এখন নগরোন্নয়ন দফতরের ফোনের অপেক্ষাতেই তাই দিন গুজরান গোবরডাঙার সিরজুল মণ্ডলের৷

Advertisement
---
-----