সারদাকাণ্ডের সত্য উদঘাটনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দুই পুলিশ আধিকারিক রাজীব কুমার আর অর্ণব ঘোষকে জেরার জন্য আর্জি জানানো হয়েছিল সিবিআইকে৷ কারণ, সারদার সত্য উদঘাটনের নামে সত্যকে আসলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ জানানো হয়েছিল৷

শুধুমাত্র তাই নয়৷ সারদাকাণ্ডে যাতে সিবিআই তদন্ত আটকানো যায়, তার জন্য প্রাক্তন বিচারপতি শ্যামল সেনের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়! যে কারণেই কি রাজ্য সরকারের কাছে শেষ পর্যন্ত পেশ-ই হয়নি ওই কমিশনের রিপোর্ট? চিটফান্ড সাফারার্স ইউনিটি ফোরামের আহ্বায়ক অসীম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে www.kolkata24x7.com-এর প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ ঘোষের কথোপকথনে প্রকাশ পেল এমনই নানা বিস্ফোরক তথ্য৷

সারদাকাণ্ডে সিবিআই তদন্তের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের তরফে এমন বলা হয়েছিল, চিটফান্ড কেলেঙ্কারির ঘটনায় বৃহত্তম ষড়যন্ত্র রয়েছে৷ এই জাল আন্তর্জাতিক স্তরেও ছড়িয়েছে৷ গোটা কাণ্ডে বেশ কয়েক জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে৷ মোট প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি৷ যার জেরে ২৫ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷ এমনকী, পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ যথাযথ তদন্ত করতে পারেনি বলেও জানানো হয়েছিল৷

- Advertisement -

আরও পড়ুন: বিপর্যয় মোকাবিলায় নিধিরাম মমতার ‘উন্নত’ দফতর

তেমনই, শুধুমাত্র সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার ক্ষতিগ্রস্ত এজেন্ট, আমানতকারী এবং তাঁদের পরিজনরা নন৷ ওই সব চিটফান্ড সংস্থার ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন স্তরের কর্মী এবং তাঁদের পরিজনরাও নন৷ সারদাকাণ্ডের জেরে অর্থনীতির উপরেও প্রভাব পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷ সব মিলিয়ে, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই নয়, অন্যান্য রাজ্যেও বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ: নির্বাচনী প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, সারদায় তো দুই হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি হয়েছে…
অসীম চট্টোপাধ্যায়: কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে প্রাক্তন বিচারপতি শ্যামল সেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনই বলেছে, শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই সারদা চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে অন্তত ২,৪০০ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে৷

: চিটফান্ড কেলেঙ্কারি মানে তো শুধুমাত্র আবার সারদা গোষ্ঠী-ও নয়…
: নিশ্চয়৷ সারদা গোষ্ঠীর পাশাপাশি রোজভ্যালি চিটফান্ড সংস্থার ৭,৬০০ কোটি টাকা এবং এমপিএস চিটফান্ড সংস্থার ১০ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি হয়েছে৷ তবে, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কে ডি সিংয়ের অ্যালকেমিস্ট চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির টাকার অঙ্ক এমপিএস, রোজভ্যালি এবং সারদার থেকেও অনেক বেশি৷ তেমনই, শুধুমাত্র আবার এই চারটি বড় মাপের চিটফান্ড সংস্থার দুর্নীতিও নয়৷ পশ্চিমবঙ্গেই আরও বহু চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারিও হয়েছে৷ ছোট-বড় মিলিয়ে ওই সব চিটফান্ড সংস্থার সংখ্যা অন্তত দুই হাজার হবে৷ এমন অনেক ছোট ছোট চিটফান্ড সংস্থাও ছিল, যে সব সংস্থা ২০-২৫ কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে৷ স্বাভাবিক ভাবেই, এই সব চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই বিশাল অঙ্কের টাকার দুর্নীতি হয়েছে৷

আরও পড়ুন: সারদা-নারদের সত্য এবং মদন বনাম মদন আর মিত্র

: আর, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ…? সারদাকাণ্ডের জেরে কলকাতার এক সাংবাদিককেও শেষ পর্যন্ত বেছে নিতে হয়েছে আত্মহত্যার পথ…
: সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার এই বিশাল অঙ্কের টাকার কেলেঙ্কারির জেরে এখনও পর্যন্ত শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই ১২৭ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি৷ এই ১২৭ জনের মধ্যে অধিকাংশই সারদা সহ বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার এজেন্ট৷ আর, অন্যরা সারদা সহ বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থার আমানতকারী৷ অন্য রাজ্যেও আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে৷ তেমনই,  আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন অনেকে৷ সব মিলিয়ে, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির জেরে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই অন্তত ৯০ লক্ষ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি৷ অর্থাৎ, গড়ে প্রতি পরিবারের পাঁচ জন করে সদস্য ধরা হলে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷

: নির্বাচনী প্রচারে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, সারদায় তিনি ৩০০ কোটি টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন৷ এবং, কেন্দ্রে কংগ্রেস আর, রাজ্যে বামফ্রন্ট পরিচালিত সরকারের আমলে সারদার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে…
: পশ্চিমবঙ্গে সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার বাড়বাড়ন্ত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে৷ কিন্তু, মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে সারদায় ক্ষতিগ্রস্তদের ৩০০ কোটি টাকা ফিরিয়ে দিয়েছেন?

আরও পড়ুন: সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

: কেন?
: সারদা কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠনের কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী৷ শেষ পর্যন্ত, ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে রিলিজ করা হয়েছিল ২৬৭ কোটি টাকা৷ ওই ২৬৭ কোটি টাকার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়েছে ১৩০ কোটি টাকা৷ কিন্তু, ওই ১৩০ কোটি টাকার মধ্যেই আবার ফেরত এসেছে ১০৩ কোটি টাকার চেক৷ অর্থাৎ, ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৭ কোটি টাকা৷ তা হলে, কীভাবে ৩০০ কোটি টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে? তার উপর, ওই ২৭ কোটি টাকা যে তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে৷

: কোন তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে?
: সারদায় ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য শ্যামল সেন কমিশন ১০ হাজার মানুষকে ইন্টারভিউ করেছিল৷ অথচ, ৯০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরি করেছিল ওই কমিশন৷ এটা কীভাবে সম্ভব? এই তালিকার বিষয়টিও তো স্পষ্ট নয়৷ আর, সারদায় ক্ষতিগ্রস্তদের যে তালিকা তৈরি করেছিল বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট, সেই তালিকা অনুযায়ী ওই ২৭ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে৷

আরও পড়ুন: রাজ-‘কুৎসা’য় যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা…!

: টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য অন্য ক্ষতিগ্রস্তদের কোনও সম্ভাবনা রয়েছে?
: সব টাকা ফেরত পাওয়া কঠিন৷

: তা হলে, সারদা সহ বিভিন্ন চিটফান্ড সংস্থাগুলির দুর্নীতির জেরে অন্য ক্ষতিগ্রস্তদের কী হবে! আর, সারদায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার সময় সুপ্রিম কোর্ট এমন বলেছিল যে, কাজ চালিয়ে যেতে পারে শ্যামল সেন কমিশন…
: সারদাকাণ্ডে যাতে সিবিআই তদন্ত আটকানো যায়, তার জন্য প্রাক্তন বিচারপতি শ্যামল সেনের নেতৃত্বে কমিশন গঠন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ কিন্তু, সুপ্রিম কোর্টে যখন আর সিবিআই তদন্ত আটকানো সম্ভব হল না, তখন শ্যামল সেন কমিশনের কাজও বন্ধ করে দেওয়া হল৷csuf

: শ্যামল সেন কমিশনের সর্বশেষ পরিস্থিতি…
: শ্যামল সেন কমিশন যে রিপোর্ট তৈরি করেছিল, সেই রিপোর্টই তো রাজ্য সরকারের কাছে পেশ হল না৷

: কেন?
: শ্যামল সেন কমিশনের ওই রিপোর্ট নেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের তরফে কেউ ছিলেন না৷ তবে, ওই রিপোর্ট প্রকাশের জন্য আমরা দাবি জানিয়েছি৷ আমরা চাইছি শ্যামল সেন কমিশনের ওই রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হোক৷

: সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার এই বিশাল অঙ্কের টাকার কেলেঙ্কারির জেরে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য এখন কী করছে চিটফান্ড সাফারার্স ইউনিটি ফোরাম?
: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের নামে আসলে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে৷ এই সরকারের আমলে সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কিছু আর হবে না৷ নতুন সরকারের জন্য আমরা অপেক্ষা রয়েছি৷ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য নতুন সরকারকে আমরা জানাব৷

আরও পড়ুন: সারদা ভিত্তি হলে বাংলার ভবিষ্যৎ তবে এখন নারদ!

: নতুন সরকার বলতে…?
: আমরা আশা করছি, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসছে বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের জোট সরকার৷

: তা হলে, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির প্রভাব নির্বাচনের উপর পড়ছে বলে মনে করছেন?
: নিশ্চয় পড়ছে৷

: কিন্তু, ২০১৩-য় ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০১৪-য় লোকসভা নির্বাচন এবং ২০১৫-য় কলকাতা সহ রাজ্যের ৯২টি পুরসভার নির্বাচনে কি সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির প্রভাব সেভাবে পড়েনি?
: ওই সব নির্বাচনেও প্রভাব পড়েছিল৷ তবে, ওই সব নির্বাচনে গুন্ডামির মাধ্যমে ভোট করিয়েছিল রাজ্যের শাসকদল৷ তাই, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারির প্রভাব সেভাবে বোঝা যায়নি৷

আরও পড়ুন: এক ক্যুইজ মাস্টার আর বাংলার ‘সবুজ লাড্ডু’র কাহিনি

: কিন্তু, আবার যদি ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস?
: তা হলে বুঝতে হবে, সারদা সহ অন্যান্য চিটফান্ড সংস্থার কেলেঙ্কারি সেভাবে প্রভাব ফেলেনি৷ সারদাকাণ্ড তখন চাপা পড়ে যাবে৷

: সারদাকাণ্ডে রাজ্য সরকারের তরফে তদন্তের সময় বহু প্রামাণ্য নথি লোপাট করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল৷ সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারে কলকাতায় এসে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ ফের ওই অভিযোগ করেছেন…
: তদন্ত শুরু করার পরে সিবিআইকে আমরা স্মারকলিপিতে জানিয়েছিলাম, সারদাকাণ্ডের সত্য উদঘাটনের জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দুই পুলিশ আধিকারিক রাজীব কুমার আর অর্ণব ঘোষকে জেরা করা হোক৷ কারণ, সারদার সত্য উদঘাটনের নামে রাজ্য সরকারের তদন্তে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে৷

আরও পড়ুন: মমতা আইনের ঊর্ধ্বে কি না নিষ্পত্তি হবে সুপ্রিম কোর্টে

____________________________________________________________

Advertisement
---