তেহট্টের স্কুলে সরস্বতী পুজো করল ‘শবনম-সাবিত্রীরা’

সৌমেন শীল, কৃষ্ণনগর: সরস্বতী পুজো এবং নবী দিবসের দ্বন্দ্বে যখন উত্তাল হাওড়ার উলুবেড়িয়ার তেহট্ট হাই স্কুল সেখানে অন্য ছবি দেখা গেল রাজ্যের আরেক তেহট্টে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের জেলার গোপীনাথপুর নেতাজী বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সামিল হল সরস্বতী পুজোয়। সৌজন্যে স্কুলের প্রধান শিক্ষক সায়ন্তন দাস।

নদিয়া জেলার প্রত্যন্ত একটিও গ্রামে অবস্থিত গোপীনাথপুর নেতাজী বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়, যেখানে সহপাঠী তানিয়ার সাথে হাসতে হাসতেই হাতের ফুলটা সামনের ছয় ফুট মৃন্ময় মূর্তি কে দিলো শবনম। হ্যাঁ নামটা ওটাই। নাম শুনেই যারা “ধর্ম” নামক উত্তরীয় হাতড়াতে থাকে তাদের জন্য শবনম আর তানিয়া অবশ্য যুযুধান দুই শিবিরের বাসিন্দা। শুধু গোপীনাথপুর নেতাজী বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ে তারা দুই বন্ধু, দুই বোন। আর তাদেরই কিশলয়েরা হাত লাগিয়ে সাজিয়ে দিলো “বাগদেবী”কে। প্রতিমা বায়না থেকে পুজোর বাজার, আলপনা, ফল কাটা, রান্নার ঘরে মাথায় করে বাজার পৌঁছানো, প্রসাদ দেওয়া, ভোগ পরিবেশন থেকে বিসর্জন সর্বত্র ‘গৌর’দের হাত ‘সাজ্জাক’দের হাতেই ধরা। ওরা যে আলাদা হতে পারেনি। আলাদা ওদের হতে দেয়নি ওদের বাবা মায়েরা, ওদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা ওদের বাড়ি, ওদের স্কুল। যখন চারপাশে বহু “ধর্ম”-এর ব্যবসায়ীদের হাতে বিভিন্ন জায়গায় ‘সাবির’ আর ‘সমীর’দের বন্ধন গুলো প্রবল রিরংসায় পায়ের তলায় পিষে থ্যাঁতলানো হচ্ছে, উন্মাদ লালসায় ‘তন্ময়’দের হাতে ‘সাবিনা’রা আর ‘তনবীর’দের হাতে ‘সাবিত্রী’রা ছিন্নভিন্ন হচ্ছে তখন গোপীনাথপুরের এই সবুজ থাকা চারাগাছ গুলো যেন সত্যিকারের বাঁচার জন্য বেশ খানিকটা অক্সিজেন ভরে দিলো সমাজের ট্রপোস্ফিয়ারে।

পুজোর কাজে ব্যস্ত পড়ুয়ারা

সরস্বতী পুজো এবং নবী দিবসের দ্বন্দ্বে বন্ধ হয়ে গিয়েছে হাওড়া জেলার তেহট্ট হাই স্কুল। স্কুলে সরস্বতী পুজো হলে দেশের ধর্ম নিরপেক্ষতার স্বার্থে নবী দিবস পালন করতে হবে। একদল মৌলবাদীদের হুমকির জেরে শুধু স্কুল বন্ধই হয়ে যায়নি। ইস্তফা দিতে হয়েছে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে। প্রকাশ্য জনসভায় তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল এক ধর্মীয় নেতা। এখানেই শেষ নয়, সরস্বতী পুজোর দাবিতে জাতীয় সড়ক অবরোধ করেছিল স্কুলের কিছু পড়ুয়া। পুলিশের লাঠির আঘাতপ্রাপ্ত ওই স্কুলের ছাত্রীর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন বেশ ভাইরাল। জাতীয় স্তরের সংবাদ মাধ্যমে দেখা গিয়েছে তেহট্টের স্থানীয় কিছু মানুষের বক্তব্য। তাঁদের দাবি, “এই এলাকায় শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ। মুসলিম। এখানের স্কুলে সরস্বতী পুজো হলে নবী দিবস হবে না কেন!”

- Advertisement -

অন্যদিকে এলাকায় ৮০ শতাংশ মুসলিম নিয়েও ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা রাজ্যের আরেক তেহট্টে। ধর্ম ব্যক্তিগত জায়গায় থাকলেও উৎসব যেন সকলের হয়। বিশ্বের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই প্রবাদটিকে আরও একবার সত্যি করে দেখালেন গোপীনাথপুর নেতাজী বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সায়ন্তন দাস। সমগ্র বিষয়টির জন্য তিনি স্কুলের পরিচালন সমিতি, তাঁর সহকর্মী এবং স্থানীয় মানুষদের অর্থাৎ স্কুলের পড়ুয়াদের অভিভাবকদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনার প্রভাব পড়তে পারে গোপীনাথপুরেও। সেই আশঙ্কা ছিল স্কুল কর্তৃপক্ষের। সমস্যার সমাধানে আসরে নামেন প্রধান শিক্ষক সায়ন্তনবাবু। স্কুলের পড়ুয়াদের ডেকে তিনি বলেন, “সরস্বতী পুজো একটা অনুষ্ঠান। ধর্মের সঙ্গে এটাকে এক করে দেখলে চলবে না। সবাই সেদিন স্কুলে আসিস পিকনিক করতে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো বা শুধু আনন্দ এটাই যেন মুখ্য উদ্দেশ্য হয়।” প্রধান শিক্ষকের নির্দেশ খুব ভালোভাবেই মেনেছে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। প্রতিমা নিয়ে আসা থেকে বিসর্জন, সব কিছুই হয়েছে নির্বিঘ্নে। এই স্কুলেও যদি নবী দিবস পালনের দাবি ওঠে? জবাবে সায়ন্তনবাবু বলেছেন, “যে কোনও দিবস পালনের বিষয়ে স্কুল পরিচালন কমিটির সঙ্গে আলোচনা করে মিটিয়ে নেওয়া উচিত। কোনও প্রকার বিশৃঙ্খলা না হলেই হলো।”

ছাত্রছাত্রীদের হাতেই হল দেবীর বিসর্জন

এই প্রতিবেদকের সঙ্গেই কথা হয়েছিল উলুবেড়িয়ার তেহট্ট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক উৎপল মল্লিকের। একরাশ ভয়ের সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “যেভাবেই হোক স্কুল চালু হওয়া উচিত। নাহলে অনেক সমস্যা হবে। সব থেকে বেশি সমস্যায় পড়বে ছাত্রছাত্রীরা।” সরস্বতী পুজোর আগেই অবশ্য তিনি নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। অন্যদিকে সরস্বতী পুজোর পর বেশ নিশ্চিন্ত নদিয়ার তেহট্টের নেতাজী বিদ্যামন্দির উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সায়ন্তন দাস। উৎপলবাবুকে সার্বিক পরিস্থিতির জন্য সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি। সায়ন্তনবাবুর কথায়, “চারপাশটায় এমন নেতাজী বিদ্যামন্দিরে ভরে যাক। আমাদের সবার সন্তান গুলো ভালো নম্বরের কবলে পড়ার আগে একটু ভালো করে বাঁচতে শিখুক।”

পরিবারের সঙ্গে সায়ন্তন দাস
Advertisement ---
---
-----