কথাশিল্পীর ভালোবাসা ছিল তাঁর অবোলা কুকুর ভেলু

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: কুকুর খুন নিয়ে উত্তাল রাজ্য। ইতিমধ্যেই ১৬টি কুকুর মেরে গ্রেফতার হয়েছে দুই অভিজুক্ত। খোঁজ চলছে আরও কয়েকজনের। কুকুরের উপর এমন অত্যাচারের ঘটনা এখন প্রায়ই উঠে আসে খবরের পাতায়। কুকুরপ্রেমীও শহরে খুব কম নেই কিন্তু বিকৃত ঘটনার জেরে কোথাও হারিয়ে যায় এই পশুপ্রেম। মনিষীরাও অনেকে কুকুর পছন্দ করতেন। কিন্তু তাঁদের দেখে বা তাঁদের গল্প কথা শুনে মানুষ শেখে কম। যেমন কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।তাঁর ছিল অপার কুকুর প্রীতি।

তখন তিনি হাওড়ার বাজে শিবপুরে থাকেন। তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ভেলু নামের একটি কুকুর। কথা শিল্পী যেখানেই জান লেজ নাড়তে নাড়তে সেখানেই চলে যায় সে। যমুনা পত্রিকার অফিসেও সে চলে যেত। কথাশিল্পী এতে বিরক্ত হতেন না। উলটে আনন্দঈ পেতেন বেশি। পত্রিকার অফিসে এসে প্রায়ই ভেলুকে খাওয়াতেন চপ কাটলেট।

একবার তিনি খেলা করছিলেন ভেলুর সঙ্গে। এক বৈষ্ণব এসে হাজির। আলাপ হওয়ার পর এ কথা সে কথায় প্রসঙ্গ ঘুরে যায় জীব প্রেমের দিকে। বৈষ্ণব ধর্ম কতটা অহিংসা এই সব বিষয়ে কথা হচ্ছিল। এরই মাঝে কথাশিল্পীর পেয়ারের ভেলু অই বৈষ্ণবের রাখা ঝোলা টানতে শুরু করে। গল্পে মশগুল বৈষ্ণব খেয়ালই করেনি। ততক্ষণে তাঁর জপমালা ভেলুর মুখে। যখন তাঁর নজরে এল তখন ভেলুর মুখে খেলা করছে জপমালা।

রেগে গিয়ে ভেলুকে প্রায় এই মারে কি সেই মারে অবস্থা বৈষ্ণবের। শেষে টানা হ্যাচরা করে মুখ থেকে উদ্ধার করেন তাঁর জপমালা। শরতচন্দ্র এতক্ষণ কিচ্ছু বলেননি। চুপ ছিলেন। জপমালা বৈষ্ণবের হাতে আসার পর তিনি মুখ খোলেন। ব্যঙ্গ করে বললেন, “সে কী গোঁসাই বাবা, আপনার জীবপ্রেম দেখছি এখনও কুকুর পর্যন্ত পৌঁছয়নি।” শরৎচন্দ্রের এই কথায় লজ্জিত বৈষ্ণব স্থান ত্যাগ করেন নত মুখে।

এই ভেলু’র মৃত্যুর পর শরৎচন্দ্র শ্রাদ্ধ করেছিলেন ঘটা করে। তাঁকে খুশি করার জন্য তাঁর ভক্ত অবিনাশ ঘোষাল তাঁর নিজ পত্রিকা ‘বাতায়ন’ –এ প্রকাশ করেছিলেন ভেলু’র মৃত্যু সংবাদ। ‘শনিবারের চিঠি’’র সম্পাদক সজনীকান্ত দাশ তাঁর এই বিখ্যাত পত্রিকায় ছড়া করে লিখেন “ভেলুর নাই বিনাশ, ভেলু হলো অবিনাশ।”

প্রসঙ্গত তিনি কলকাতায় থাকার সময় তাঁর ই এক পোষা কুকুর তাঁকে কামড়ে দিলে নিজের জীবন বাঁচাতে তাঁকে নিতে হয়েছিলো ইনজেকশন । অবাক কান্ড, এ জন্য কোন দুঃখ না করে এই কুকুরের মৃত্যুতে তাঁর কণ্ঠে প্রকাশ পেয়েছিল অপরিসীম বেদনা, “একে অবোলা জীব, তাতে পাগল হ’ল, তার দোষ কি? আমি তো ইনজেকশন নিয়ে বাঁচলাম – আহা! সে মরে গেলো।”

তথ্য সূত্র – শরৎ সান্নিধ্যে – ডক্টর কালিদাশ রায় (কবি শেখর)