খাতায় কলমে আছে সরকারী ভাতা, অন্ধকারে দিন গুনছেন প্রবীণরা

বিজয় রায়, কলকাতা: উন্নয়নশীল ভারতে অগ্রগতি হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানে৷বেড়েছে নাগরিকের গড় আয়ু৷ বিষয়টি সামগ্রিকভাবে যথেষ্ট আনন্দের হলেও প্রদীপের তলায় কোথাও লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকার!

কেন্দ্রীয় সরকারের এক রিপোর্ট অনুযায়ী গত চল্লিশ বছরে জনসংখ্যার নিরিখে প্রবীণ নাগরিকদের অনুপাত ৭ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশ হয়েছে৷ ফলে মৃত্যুর হার যে অনেকটাই কমেছে তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই এবং তা থাকারও কথা না ৷তবে এর সুফল আদৌ দেশের প্রবীণরা ভোগ করতে পারছেন কি না তা নিয়ে একটা বড়সড় প্রশ্ন রয়েছে৷ কারণ উন্নয়নশীল ভারতের জল-বাতাসে লেগেছে উন্নত দেশের ছোঁয়া৷ নবীনরা সেই হাওয়ার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারলেও প্রবীণরা এখনও খাপ খাওয়াতে পারছে না৷ এরজন্য সমাজবিজ্ঞানের কারবারিরা বেশ কয়েকটি যুক্তি দিয়েছেন৷ তাঁদের মতে, গড় আয়ু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পরিবার পরিকল্পনা৷ যৌথ পরিবার প্রথার ভাঙন যতটা না প্রবীণদের উপর প্রভাব ফেলেছে তার চেয়েও অনেক বেশি প্রভাব পড়েছে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সংখ্যা অনেক মাত্রায় বেড়ে যাওয়া৷

- Advertisement -

অধ্যাপক কুশল চট্টোপাধ্যায়ের মতে, কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে৷ পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারাও এখন পিছিয়ে নেই এটা ঠিক৷ তবে এর জন্য সমস্যায় পড়েছেন প্রবীনরা৷ কারণ মহিলারাই একটা পরিবারের শিড়দাঁড়া৷ তাঁদের বাড়িতে না থাকার ফলে প্রবীণদের দেখভালের লোকের অভাব দেখা দিচ্ছে৷এছাড়াও তিনি আরও বলেন, কাজের জন্য এখন তরুণদের কখনও রাজ্যের বাইরে আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে দেশের বাইরেও যেতে বাধ্য হচ্ছে৷ এর ফলে প্রবীণরা এখন অনেক একা৷তাঁদের নিজেদের কাজ নিজেদের করতে হচ্ছে৷ ব্যাংকের কাজ থেকে শুরু করে, নিত্য বাজার বা ডাক্তার দেখানো সমস্তটাই৷

আরও পড়ুন : প্রবীণ নাগরিকদের তহবিলে যাবে দাবিহীন বিমার টাকা

তবে প্রবীণদের সাবলীল হওয়ার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ কিন্তু সরকারের আছে৷ চালু আছে একাধিক প্রকল্প৷ তবে সেই প্রকল্পগুলির সুবিধা কি তাঁরা আদৌ পাচ্ছেন?

সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের UNPA ভারতের বেশ কয়েকটি সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রবীণ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন যাত্রার উপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়৷ সমীক্ষাটি মূলত দেশের সাতটি রাজ্যের প্রবীণদের নিয়ে হয়৷ এর মধ্যে রয়েছে হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ ও মহারাষ্ট্র৷ এছাড়াও দক্ষিণ ভারতের কেরল ও তামিলনাড়ুকেও এই সমীক্ষার আওতায় রাখা হয়েছিল৷ তাতে মূলত যে যে বিষয়গুলির উপর আলোকপাত করা হয় সেগুলি হল, প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা, সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থানের জন্য সরকারের গৃহীত প্রকল্প এবং তার সুফল, কল্যাণমূলক প্রকল্পের সুযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রবীণদের সীমিত উৎসাহ ও বয়স্কদের জন্য সর্বজনীন পেনসন প্রকল্পের সম্পাদন যোগ্যতা৷ তবে সেই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে দেশের বেশিরভাগ প্রবীণরাই এই একাধিক সরকারি প্রকল্পগুলি সম্পর্কে বিশদে কিছুই জানেন না৷ এর ফলে সরকার তাঁদের জন্য বছরের পর বছর যে অর্থ বরাদ্দ করছে তার অধিকাংশটাই ফেরত চলে যাচ্ছে সরকারি কোষাগারে৷

এছাড়াও সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ প্রবীণরা এখনও অন্যের উপর নির্ভরশীল৷তাঁদের নিজেদের কোনও আয় নেই৷কর্ম জীবনের উপার্জনের অর্থ যতটা সম্ভব জমিয়ে রাখলেও পরিকল্পিত পরিবার কল্যাণের অভাবে তা অনেকটাই ফুরিয়ে গিয়েছে অধিকাংশের ক্ষেত্রে৷

তবে এইসকল প্রবীণদের নিয়ে যে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার একেবারেই ভাবে না তা নয়৷ দুই সরকারের তরফেই বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে৷ যেমন ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় বার্ধক্য ভাতা প্রকল্প, ইন্দিরা-গান্ধী জাতীয় বৈধব্য ভাতা প্রকল্প৷ আবার কয়েকটি রাজ্য সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে পণ্য ও পরিষেবা সরাসরি দেশের প্রবীণদের পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে৷ তাছাড়াও কেরলের শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের পেনসন স্কিম বা স্বামীপরিত্যক্তা মহিলাদের জন্য তামিলনাড়ু সরকারের ভাতা প্রদান বা বাংলায় বৃদ্ধাশ্রী সাঁজবাতীর মতো প্রকল্প ৷ এগুলি সমস্তটাই দেশের প্রবীণ নাগরিকদের জন্য আছে৷ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে এই প্রকল্পগুলি প্রসঙ্গে সঠিক জ্ঞান না থাকার ফলে তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রবীণরা৷ এরজন্য উপযুক্ত শিক্ষার অভাব স্পষ্ট বলেই দাবি করেছেন সমীক্ষকরা৷ এছাড়াও ভারতের মতো দেশে যেখানে ‘রাজনৈতিক দাদাগিরি’ সর্বাঙ্গে জড়িয়ে আছে সেখানে বিরোধী দলের সমর্থক হওয়ায় অনেক সময় শাসক দলের হোতারা ইচ্ছে করে ভাতা সংক্রান্ত পরিষেবা আটকে দেয়৷

আরও পড়ুন: এবার ৬০-এই বিশেষ ছাড় পাবেন এয়ার ইন্ডিয়ার প্রবীণ বিমানযাত্রীরা

২০১১ এর দেওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী যার ফল ভোগ করছেন প্রায় ১০ কোটিরও বেশি প্রবীণ নাগরিকগণ৷সমীক্ষার প্রায় শেষ অধ্যায়ে এবিষয়ে একটি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে৷ তাতে বলা হয়েছে বছরের পর বছর সংখ্যাটা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে৷এমনটা চলতে থাকলে এই পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার সংখ্যাটা ২০ কোটি কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াবে৷ফলে কেন্দ্র বা রাজ্যের একাধিক প্রকল্প মিলিয়ে গড়ে যেখানে প্রতি মাসে প্রবীণরা দু’ থেকে তিন হাজার টাকা নগদ সংগ্রহ করতে পারেন তা নির্দিষ্ট জ্ঞানের অভাবে আর সম্ভব হয় না৷ফলে সেই টাকার একটা বড় অংশ প্রতি বছর ফিরে যায় সরকারের কোষাগারে৷

বছরের পর বছর প্রবীণদের জন্য বরাদ্দ অর্থের অধিকাংশটা ফেরত যাওয়াতে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন খোদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর৷তবে আগামী দিনে প্রান্তিক মানুষের হাতে সমস্ত প্রকল্প যথাযথ ভাবে পৌঁছে দেওয়া যায় তা নিয়ে নরেন্দ্র মোদীর সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিতে চলেছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি৷ তবে ভারতের মতো দেশে যেখানে শিক্ষার হার অনেকটাই কম সেখানে সেই উদ্যোগ আদৌ কাজে লাগবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়৷তবে এতকিছুর মধ্যে ভালো খবর একটাই৷ আর তা হল, দেশের প্রবীণদের নিয়ে কাজ করে বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা৷ তাদের উদ্যোগে অনেকেই সরকারী প্রকল্পের সুবিধা ভোগ করেন৷ কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গুলির কাজ মূলত বড় শহরগুলিতেই সীমাবদ্ধ থাকে৷ ফলে গ্রামের প্রবীণদের যেখানে এই প্রকল্প প্রসঙ্গে সঠিক ধারণা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাঁরা তা জানতেই পারেন না৷হয়তো সঠিকভাবে তাঁদের কাছে এই সকল তথ্য পৌঁছালে বিজ্ঞাপনের ভাষায় বলা যেতেই পারত, ‘না মাথা কখনও ঝুঁকেছে, না কখনও ঝুঁকবে৷’

Advertisement
---