মধুচক্র এখন শান্তিনিকেতনের ‘ওপেন সিক্রেট’

সৌমেন শীল, বোলপুর থেকে ফিরে: দেশজুড়ে পর্যটনের তালিকায় বহু দিনই পাকাপাকি ঠাঁই করে নিয়েছে রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতন। পশ্চিমবঙ্গে পর্যটনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ অবশ্যই শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক পরিবেশ তথা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়াও শান্তিনিকেতনের গ্রামাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী জঙ্গলগুলি সহ কোপাই-খোয়াই শহুরে পর্যটকদের বিশেষ পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

সপ্তাহান্তে দুটি ছুটির দিনে হাট বসে সোনাঝুরি জঙ্গলে। পৌষ মেলা বা বসন্ত উৎসব ছাড়াও তাই বছরভর শহুরে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। তবে শনি-রবিবার অর্থাৎ উইকএন্ডে ভিড়টা থাকে চোখ পড়ার মতো। শুক্রবার রাত থেকেই ‘বুক’ হতে শুরু করে শান্তিনিকেতন সংলগ্ন হোটেল ও রিসর্টগুলি। বেড়াতে গিয়ে ‘চেড়ানো’ অর্থাৎ আমোদ-প্রমোদে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে যৌনতার চাহিদা! হ্যাঁ, রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনেও৷ আর পর্যটকদের সেই চাহিদা থেকেই জন্ম নিয়েছে মধুচক্র।

- Advertisement -

শান্তিনিকেতনের এই মধুচক্রের বিষয়টি যেন অনেকটা কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতার মতো। রাজাকে উলঙ্গ দেখেও সকলে হাততালি দিচ্ছিল। কবিই খালি খুঁজেছিলেন সেই শিশুটিকে৷ যে সহজ ও পবিত্র সরলতায় বলে উঠবে: ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ এক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা সেই রকম। বোলপুর সহ শান্তিনিকেতন এবং শ্রীনিকেতন সব জায়গার প্রায় সকলেই জানে এই মধুচক্রের কথা এবং বিভিন্ন আড্ডায় তা নিয়ে আলোচনাও চলে। তবু আড্ডার শেষে জ্যাঠামশাই গোছের কেউ বাকি সকলকে সাবধান করে দেন, ‘‘দেখ, এটা যেন পাঁচ কান না হয়!’’

প্রতিকি ছবি, ছবির সঙ্গে প্রতিবেদনের কোন সম্পর্ক নেই

এভাবেই মধুচক্র হয়ে গিয়েছে শান্তিনিকেতনের ‘ওপেন সিক্রেট’। শান্তিনিকেতন পোস্ট অফিস সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানের আড্ডায় একজনকে বলতে শোনা গেল, ‘‘ভুবনডাঙায় হোটেলে জায়গা না পেয়ে গত হপ্তায় নাকি এক বাড়িতে তিনটে মেয়ে কারবার চালিয়েছে। জায়গাটা পুরো নষ্ট হয়ে গেল।’’ আক্ষেপের সুরে বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব সেই ভদ্রলোক। তাঁকে থামিয়ে অপর একজন বলে উঠল, ‘‘এ আর এমন কী! এসব অনেক দিন ধরেই চলছে। আপনি অনেক পরে জানলেন।’’

ঘণ্টাখানেক বাদে গেলাম রতনপল্লীর দিকে৷ সেখানে একটি দোকানে বসে দুই তরুণের থেকে পেলাম বিস্তারিত খোঁজখবর। তাদের কথায়, ‘‘শুধুমাত্র পৌষমেলা আর বসন্ত উৎসবের ভরসায় তো আর এই হোটেল কিংবা রিসর্টগুলো চলে না। সারা বছর ধরে ব্যবসা করতে তাই এই হোটেলগুলোর এখন একটা বড় ভরসার জায়গা হচ্ছে মধুচক্রের আসর। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বোলপুর বা শান্তিনিকেতন এলাকার অনেক স্থানীয় লোকও নিজেদের বাড়ির এক বা একাধিক ঘর ভাড়ায় দিচ্ছে। এর জন্য স্থানীয় দালাল রয়েছে। যারা পুরো ব্যাপারটা পরিচালনা করে।’’
পুলিশ বা প্রশাসন কিছু ব্যবস্থা নেয় না? মাঝে মাঝে পুলিশ রেড করলেও পরিবর্তন তেমন কিছুই হয়নি বলে জানালেন এক তরুণ। তাঁদের থেকেই জানা গেল এখন বোলপুর বা শান্তিনিকেতনের শহর এলাকাগুলি ছাড়িয়ে একটু ভিতর দিকে জঙ্গল-লাগোয়া এলাকায় গজিয়ে উঠছে অনেক হোটেল, রিসর্ট বা গেস্ট হাউস। আকাশছোঁয়া ভাড়া হলেও ওইসব এলাকাতেও হোটেলের চাহিদা এখন খুব বেশি। এই উজ্জ্বল দুই তরুণের মুখেও শোনা গেল একই সাবধানবাণী। ‘‘দাদা, এগুলো নিয়ে কিন্তু কোথাও আলোচনা করবেন না। বুঝতেই তো পারছেন, আমাদের এখানে থাকতে হয়।’’

প্রতিকি ছবি, ছবির সঙ্গে প্রতিবেদনের কোন সম্পর্ক নেই

ওই দুই সদ্য কৈশোর পার-হওয়া তরুণই জানাল, এইসব চক্রের ‘মধু’র জোগান আসে বাইরে থেকে। বাইরে মানে বিদেশ নয়। শান্তিনিকেতনের বাইরে থেকে নিয়ে আসা হয় ওই যৌনকর্মীদের। অনেক সময় তারাপীঠ বা কোপাই নদী সংলগ্ন গ্রামগুলি থেকেও সপ্তাহান্তের অতিথি বিনোদনের জন্য নিয়ে আসা হয় ‘রাস্টিক’, ‘এথনিক’ যুবতীদের। শান্তিনিকেতনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের গ্রামগুলির অর্থনৈতিক অবস্থা এখনও প্রতিকূল। যদিও এইসব মানুষের উন্নতির কথা ভেবেই রবীন্দ্রনাথ তৈরি করেছিলেন শ্রীনিকেতন৷ কিন্তু তাঁর স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গিয়েছে৷ গ্রামগুলির হাল ফেরেনি৷ আর সেই প্রতিকূলতাকেই হাতিয়ার করে মধুচক্রের দালালরা।

Advertisement ---
-----