ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি: দিল্লি থেকেই বাংলায় ভাষণ দিয়ে মোহিত করলেন বঙ্গবন্ধু

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: মঞ্চ থেকে প্রথা মাফিক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর ভাষণ শেষ করলেন৷ জনতা ফেটে পড়ল৷ মাইকের সামনে তখন দীর্ঘদেহী মুজিবুর রহমান৷ তিনি এবার ইংরাজিতে বক্তব্য শুরু করলেন- ‘প্রাইম মিনিস্টার শ্রীমতি গান্ধী, লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান প্রেজেন্ট…’, এরপরেই জনতার প্রবল দাবি-‘বাংলা…বাংলা…’৷ একটু থেমে গেলেন বঙ্গবন্ধু৷ পাশ থেকে ইন্দিরা মুচকি হেসে জানিয়ে দিলেন ‘বেঙ্গলি…বেঙ্গলি’৷ হাসি খেলে গেল শেখ মুজিবের মুখে৷ নিজের দেশ-বাংলাদেশের তরফে স্বাধীনতার শুভেচ্ছা দিয়েই আপামর ভারতবাসীকে বাংলায় সম্বোধন করলেন বঙ্গবন্ধু৷ দিল্লি থেকে বিশ্ব মহলে ছড়িয়ে পড়ল সেই বার্তা৷

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি৷ সেই ভাষণে হিন্দিভাষী দিল্লিবাসীর সামনে ইতিহাসের মহা সন্ধিক্ষণের আর একটা পর্ব রচিত হল৷ পাক কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ভারতের মাটিতেই বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রথম রাজনৈতিক ভাষণটি দিলেন৷ লাখো মানুষ শুনল সেই কথা৷ বঙ্গবন্ধু বলছেন-‘আমার ভাই ও বোনেরা…আপনাদের প্রধানমন্ত্রী, আপনাদের সরকার, আপনাদের সৈন্যবাহিনী, আপনাদের জনসাধারণ যে সাহায্য এবং সহানুভূতি আমার দুখী মানুষকে দেখিয়েছেন চিরদিন বাংলার মানুষ তা ভুলতে পারবে না…’৷

বঙ্গবন্ধুর সেই জলদগম্ভীর স্বরে বাংলায় ভাষণ উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক৷ জানুয়ারির হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা সেদিন প্রবল জব উল্লাসে তেতে গিয়েছে৷ নিজের দেশের মাটিতে পৌঁছানোর আগেই বন্ধু ভারতের জনগণের অনুরোধে বাংলায় ভাষণ দিতে হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে৷ সেও তো এক নজির বিহীন ঘটনা৷

বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ এবং ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হয় ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর৷ সেদিন ঢাকায় আত্মসমর্পণ করে ৯০ হাজারের বেশি পাকিস্তানি সেনা৷ মুক্তিযুদ্ধের একদম প্রথমেই শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল৷ যুদ্ধের আবহে এও রটে যায় শেখ সাহেবকে মেরেই ফেলবে পাক সরকার৷ প্রবল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী৷ সেই চাপের কাছে শেষপর্যন্ত নতি স্বীকার করে যুদ্ধ শেষে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয় পাক সরকার৷

করাচি থেকে লন্ডন হয়ে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অবশেষে দিল্লি পৌঁছে যান বঙ্গবন্ধু৷ ১০ জানুয়ারি তাঁর সেই প্রত্যাবর্তন দিবসটি স্মরণীয় করতে উদ্যোগ নেয় ভারত সরকার৷ সরাসরি বিমানবন্দরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানালেন বঙ্গবন্ধুকে৷ বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিত করিয়ে চমক দিলেন ইন্দিরা৷ তারপরের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিন্দিভাষী দিল্লির বাসিন্দারা সরাসরি বাংলায় ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন৷ কথা রেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু৷

১০ জানুয়ারি দিল্লি থেকে সরাসরি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উড়ে গিয়েছিল বিশেষ বিমান৷ দিনটি বঙ্গবন্ধুর ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’৷ ঢাকায় তখন রাজপথ-গলিপথে বিজয় মিছিল৷ লাখো মানুষের জমায়েত যেন মানব সমুদ্রের সুনামি৷ গণ গর্জনে কাঁপছে বাংলাদেশের রাজধানী৷ বিমান মাটি ছুঁয়ে ফেলতেই বাঁধভাঙা জনগণকে কে ধরে রাখবে৷ স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে বাংলাদেশে এলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান৷ আবেগে শিশুর মতো কেঁদে ফেললেন তিনি৷ পরে লাখো মানুষের সামনে তিনি বললেন-‘…আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে৷ আমার জীবনের স্বাদ আজ পূর্ণ হয়েছে৷ আমার বাংলার মানুষ আজ মুক্ত হয়েছে…’৷

এমনও ঐতিহাসিক দিনে প্রবল আফসোস করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গবাসী৷ কিছুক্ষণের জন্য একবার কলকাতায় মুজিবুর রহমানকে দেখতে চেয়েছিলেন এপারের বাঙালিরা৷ যে পদ্মাপারের বাংলার মুক্তিসংগ্রামে পশ্চিমবাংলা সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেদিন সেখানেই তিনি সময়াভাবে আসতে পারেননি৷ পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে কলকাতায় এসে সেই অপূর্ণ স্বাদ মিটিয়েছিলেন মুজিবুর রহমান৷ কলকাতা তো তাঁর কত চেনা- এখানেই যে কেটেছিল ছাত্রজীবনের উদ্দাম দিনগুলি৷

---- -----