রাবণ-মন্দোদরীর মেয়ে ছিলেন সীতা?

মন্দোদরীর গল্প
রামায়ণে রামের প্রধানতম প্রতিপক্ষ রাবণের কথা কে না জানে? তাঁর স্ত্রী মন্দোদরীর কথাও কারোর অজানা নয়৷ কিন্তু তাঁর জীবনের কথা কতজন জানে? রামায়ণে রাম ও সীতার খবর সবাই রাখে৷ তাদের বনবাস, রাম-রাবণের যুদ্ধ সবার জানা৷ কিন্তু মন্দোদরীর ইতিহাস রয়ে গিয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে৷ রাবণের স্ত্রী হিসেবেই মহাকাব্যে বেঁচে রয়েছেন তিনি৷ কিন্তু মন্দোদরীর একটি আলাদা ইতিহাস রয়েছে৷

স্বর্গের অপ্সরা মধুরা ছিলেন মধুরা৷ একদিন তিনি শিবের সান্নিধ্য পেতে কৈলাসে যান৷ তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন না দেবী পার্বতী৷ তাঁর অনুপস্থিতিতে শিবকে মোহবিষ্ট করার চেষ্টা করেন মধুরা৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেখানে উপস্থিত হন পার্বতী৷ শিবের ভষ্ম তিনি মধুরার শরীরে মাখামাখি অবস্থায় দেখতে পান৷ আর যায় কোথায়? তৎক্ষণাৎ মধুরাকে তিনি শাপ দেন৷ পার্বতীর শাপে ১২ বছর কুয়োর মধ্যে ব্যাঙ হয়ে কাটাতে হয় মধুরাকে৷

কিন্তু পার্বতী এতটাও কঠোর ছিলেন না৷ শিবের অনুরোধে নিজেকে শান্ত করেন তিনি৷ মধুরাকে বলেন, ১২ বছর পর নিজের রূপে আবার ফিরতে পারবেন মধুরা৷

- Advertisement -

অসুরের রাজা মায়াসুর ও তাঁর স্ত্রী হেমার ২ পুত্র ছিল৷ কিন্তু কোনও কন্যা সন্তান ছিল না৷ তাই তাঁরা মেয়ের জন্য তপস্যা শুরু করেন৷ এর মধ্যেই মধুরার ১২ বছরের শাপিত জীবন কেটে গিয়েছিল৷ তিনি স্বমহিমায় ফিরে এসেছিলেন৷ কুয়োর মধ্যে বসেই কাঁদছিলেন তিনি৷ কাছেই তপস্যারত মায়াসুর ও হেমা তাঁর কান্যা শুনতে পান৷ মধুরাকে কুয়ো থেকে উদ্ধার করে প্রাসাদে নিয়ে যান তিনি৷ মধুরা হয়ে যান মন্দোদরী৷

একবার রাবণ মায়াসুরের প্রাসাদে বেড়াতে আসেন৷ সেখানে মন্দোদরীকে দেখেন তিনি৷ মন্দোদরীর রূপমুগ্ধ রাবণ তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন৷ কিন্তু মায়াসুর রাবণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে অস্বীকার করেন৷ কিন্তু রাবণ হার মানবার পাত্র নয়৷ মন্দোদরীকে জোর করে বিয়ে করেন তিনি৷ বাবার অবস্থা নিয়ে চিন্তিত ছিল মন্দোদরী৷ তাই বিয়েতে তিনি বাধা দেননি৷ রাবণ ও মন্দোদরীর ৩ ছেলে হয়৷ মেঘনাদ, অতিকায় ও অক্ষয়কুমার৷

নিজের দায়িত্ব নিয়ে সচেতন ছিলেন মন্দোদরী৷ তাই যখন তিনি শুনলেন রাবণ বিপথে যেতে চাইছেন, বারবার স্বামীকে সতর্ক করেছিলেন তিনি৷ রাবণের কাছে তিনি ভিক্ষা চেয়েছিলেন, সীতাকে যেন তাঁর স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷ কারণ তিনি জানতেন, অভিশাপ অনুযায়ী একদিন রাম আসবেন ও রাবণ বধ করবেন৷ যখন রাম ও রাবণের যুদ্ধ হয়, স্বামীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রেই উপস্থিত ছিলেন তিনি৷ সাহস জোগাচ্ছিলেন স্বামীকে৷ যদিও তিনি জানতেন তাঁর ভাগ্যে কী রয়েছে৷

রাবণের মৃত্যুর পর যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিলেন মন্দোদরী৷ স্বচক্ষে দেখেছিলেন স্বামীর মৃতদেহ৷ দেখেছিলেন স্বামীর সঙ্গে মারা গিয়েছেন তাঁর ছেলেরা ও দেওররা৷ শোক সামলে ওঠার পর রামের দিকে ঘুরে তাকিয়েছিলেন মন্দোদরী৷ বুঝেছিলেন, এই ব্যক্তি অমর৷ সাধারণ মানুষ তিনি নন৷ তিনি সাক্ষাৎ বিষ্ণু৷

রাবণের লঙ্কার ভার রাম বিভীষণকে সঁপে দেন৷ মন্দোদরীকে বিয়ে করার পরামর্শও তিনি বিভীষণকে দিয়েছিলেন৷ মন্দোদরীকে তিনি লঙ্কার রানি ও বিধবার কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন৷

রাম, সীমা ও লক্ষণ বানর সেনাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফেরা পর নিজেকে প্রাসাদের মধ্যে আবদ্ধ করে দিয়েছিলেন মন্দোদরী৷ কিছুদিন পর তিনি প্রাসাদের বাইরে বের হন ও বিভীষণকে বিয়ে করেন৷ লঙ্কাকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন তিনি৷

মন্দোদরীর মেয়ে সীতা?
রাবণের একটি অভ্যাস ছিল৷ তিনি যে কজন সাধুকে হত্যা করতেন, তাঁদের রক্ত একটি পাত্রে সঞ্চিত করতেন৷ রাবণ বিশ্বাস করতেন এই রক্ত তাঁকে মহাশক্তি দেবে৷ ঋষি ঘৃতসমাধাকে যখন তিনি হত্যা করেন তখন তাঁর থেকে একটি দুধভর্তি ঘড়া পান রাবণ৷ ঋষি সেখানে দুর্বা ঘাসের দুধ বের করে সেটি শুদ্ধ করেছিলেন৷ দেবী লক্ষ্মীকে নিজের মেয়ে হিসেবে পাওয়ার বাসনা ছিল তাঁর৷ তারই আয়োজন চলছিল৷ তাঁকে হত্যার পর সেই ঘড়া রাবণের হাতে আসে৷ নিজের রক্তপূর্ণ পাত্রে তিনি সেটি মিশিয়ে দেন৷ এদিকে রাবণের কাজে ক্রুদ্ধ মন্দোদরী সেই পাত্রের সমস্তটা পান করেন৷ আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন তিনি৷ কিন্তু যেহেতু সেই তরলটি দেবী লক্ষ্মীকে মেয়ে হিসেবে পাওয়ার বাসনা থেকে তৈরি হয়েছিল, গর্ভবতী হয়ে পড়েন মন্দোদরী৷ প্রসবের পর মেয়েকে অনেক দূরে মাটির নীচে পুঁতে রাখেন তিনি৷ মিথিলার রাজা সেই মেয়েকেই মাটির নীচ থেকে খুঁজে পান৷ জন্ম হয় মৈথিলীর৷ তবে এ নিয়ে ধর্ম ও শাস্ত্রে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে৷

Advertisement
-----