হোস্টেলের আলমারিতে পৈতে রেখে এসেছিলেন সীতারাম

দেবময় ঘোষ: কমিউনিস্ট নেতার নাম সীতারাম। তাতে বিন্দু মাত্র অসুবিধা হয়নি সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির। বাবা-মায়ের দেওয়া নাম কখনও পরিবর্তন করার চিন্তা মাথায়ও আসেনি কমরেড সীতারামের। শুধু যা পরিবর্তন করেছিলেন, তা হল জাতের পরিচিতি।

পিতামহের নাম অনুসারে ছিলেন সীতারামরাও। তেলেগু ব্রাহ্মণ। কিন্তু পরবর্তীকালে নিজের নামটা নিয়েই এগিয়ে চললেন সীতারাম। ছেড়ে এলেন জাত। মাঝে মাঝে নিজেই বলেন, “ওই যে শেক্সপীয়ার বলেছিলেন, নামে কি আসে যায় …।”

তবে পৈতে নিয়ে বেশ বেকায়দায় পড়েছিলেন সীতারাম। এগারো বছর বয়সে উপনয়নের পর তাঁকে পৈতে অর্পণ করা হয়েছিল। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি সীতারাম বলেছেন, প্রায় দশ বছর শরীরে পৈতে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। শেষে, হোস্টেলে ময়লা জামাকাপড়ের সঙ্গেই ফেলে আসেন সেটি।

ততদিনে ছুটিতে বাড়ি ফিরেছেন। বাবার চোখে পড়ল, সীতারামের পৈতে নেই। ভেবেছিলেন সীতা হয়তো পৈতে হারিয়ে ফেলেছে। প্রথা অনুযায়ী, বাবা নিজের পৈতে এগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারেননি সীতারাম। অস্ফুট স্বরে বলেছিলেন, পৈতেটা অন্য জায়গায় রেখে এসেছি। সাক্ষাৎকারে, সীতারাম বলেছেন, “ময়লা জামা কাপড়ের গাদায় পৈতে ঝুলিয়ে এসেছি, বাবাকে তা বললে ধর্মের অবমাননা করা হত।”

যতদিন দিল্লিতে আসেননি সীতারাম, জীবন কেটেছে অন্ধ্রপ্রদেশে। দিল্লিতে সেন্ট স্টিফেনস কলেজে, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় – ছাত্রজীবনে প্রবেশ করেন সীতারাম। সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক একজন সাধারণ চৌকশ ছাত্র ছিলেন, যাঁর উদ্দেশ্য ছিল পরীক্ষায় ভালো ফল করে ভাল চাকরি আদায় করা। যাইহোক, জীবন তাঁকে সেদিকে টানেনি। নিয়ে গিয়েছিল ছাত্র রাজনীতির দিকে। এক ব্যাতিক্রমী রাজনৈতিক চরিত্রের জন্ম হয়েছিল তখন।

সীতারামের কথায়, স্বাধীনতার পর তাঁরাই ছিলেন দেশের প্রথম যুব সমাজ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে , রাজনৈতিক সচেতনতা ছিলই। তবে জেএনইউ-ই অন্তরে সেই স্ফুলিঙ্গের জন্ম দিয়েছিল।

জরুরি অবস্থার সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান সীতারাম। সেসময় দু’বার পুলিশের হাতে থেকে বেঁচে যান তিনি। বাবা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সীতারাম হাসপাতালেই বাবাকে দেখভালের কাজ করছিলেন। হাসপাতালে কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে তা অনুমান করতে পারেনি পুলিশ।

কিছুদিন পরেই দুঃসংবাদ এবং সুসংবাদ একসাথে এলো। ডাক্তার বাবাকে ছুটি দিলেন। সীতারামের কপালে ভাঁজ। এবার কোথায় পালাবেন।

পরদিন সকলেই পুলিশ গ্রেফতার করে তাঁকে। তবে, ভাগ্য সঙ্গে ছিল। মিশা (MISA) আইনের বদলে ভুলক্রমে জামিনযোগ্য ধারায় গ্রেফতার করা হল সীতারামকে। কিছুদিনের মধ্যে জামিন পেতেও অসুবিধা হয়নি।

গুরুত্বপূর্ণ ৭০ সাল। রাজনৈতিক জীবনে তোলপাড় চলছে। ৭১ সালেই সিগারেটে প্রথম টান দেন সীতারাম। সাক্ষাৎকারে সীতারাম বলেছেন, সেসময় হলিউড বা বলিউডের এমন সিনেমা পাওয়া যাবে না, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রে ধূমপান করে না। যুবকত্ব থেকে পরিণত পৌরুষের পথে যেতে গেলে ধূমপান অনুঘটকের কাজ করতো। সেই থেকেই শুরু। সংসদের ধূমপান কক্ষে তাঁকে খুঁজে পাবেন।

যদিও নিজের সঙ্গে দেখা করার বিশেষ সময় নেই সীতারামের। জীবনটা রাজনীতিকে দান করেছেন। নিজের বাড়িটা দিয়েছেন পার্টিকে।

রাজ্যসভায় দু’বারের সাংসদ সীতারাম বক্তা হিসেবে সংসদের বাইরে ও ভেতরে নজরকাড়া সাফল্য পেয়েছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে তাঁর গুণমুগ্ধ শ্রোতা অসংখ্য। হয়তো, সেই কারণেই সিপিএমের মহাশক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমিটির ভোটে সীতারামের তৃতীয়বার রাজ্যসভায় মনোনয়ন বাধা পায়।

বলা হয়, সিপিএম এখনও পর্যন্ত দুটি ঐতিহাসিক ভুল করেছে। ১৯৯৬ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জ্যোতি বসুকে আটকে এবং সীতারাম ইয়েচুরিকে ২০১৭ সালে তৃতীয়বার রাজ্য সভায় না পাঠিয়ে। ভারতবর্ষের ঘরে ঘরে সিপিএম-কে পৌঁছে দিতে পারতেন জ্যোতিবাবু। অন্যদিকে, সংসদীয় বিষয়গুলি নিয়ে গত দশ বছর ধরে সিপিএমের চিন্তাভাবনা যেভাবে তুলে ধরেছেন সীতারাম, সে যুক্তির গভীরতা স্বীকার করেছেন শাসক-বিরোধী সকলেই।

কেন তৃতীয়বার রাজ্যসভায় যেতে পারলেন না সীতারাম। পার্টির শক্ত নিয়মের বাইরেও দলগত কলহ যে একটা কারণ, তা বলাই যায়।

রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের আগে হাউস কি , সেব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা ছিল না সীতারামের। বলেছিলেন, “অবাক হয়েছিলাম শুনে, যে কেন আমাকে হাউস এ গিয়ে শপথ গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে? বাড়ি যাবও কেন?” অটল বিহারী বাজপেয়ী জানতেন না সীতারাম তখনও সংসদ নন। একবার তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘হাউস এ দেখা যাচ্ছে না। কি ব্যাপার’’ ২০০৫ সালে প্রথম সংসদ হন সীতারাম। তারপর থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাননি। লেলিন যা বলেছেন, তা সাধারণ মানুষকে সাঘারণ ভাষায় বোঝান সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক৷

----
-----