স্মার্ট ইন্ডিয়া মানে কি মৃতের নগরী?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: একাধারে বিজেপি ও সিপিএমের ক্রাচ বগলে নিয়ে মাণ্ডার রাজা ‘সিআইএ কা বাজা’ বীরেন্দ্রপ্রতাপ সিং ক্ষমতায় বসেই যে কাজটা করেছিলেন, সেটা হল মণ্ডল কমিশনের সুপারিশকে কার্যকর করা৷ আজ যে দিকে দিকে মব লিঞ্চিংয়ের করাল রূপ দেখা যাচ্ছে, তার বীজ কিন্তু ওখানেই লুকিয়ে রয়েছে৷
আজমল কাসবদের মুম্বই হামলার ঘটনা যেদিন ঘটেছিল, বীরেন্দ্রপ্রতাপ সিং ঠিক সেই দিনই ‘দেহত্যাগ’ করেছিলেন৷ ২৬/১১-র ধামাকার কাছে সেই খবর পাত্তা পায়নি৷ পরের পয়সা ও প্ররোচনায় আগুন নিয়ে খেললে পরিণাম এ রকমই হয়৷

ভারতকে স্মার্ট করে তুলতে হলে সেখানে মানবাধিকার ও ন্যায়পরায়ণতাকেই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিতে হয়৷ শুধু ভাষণ দিয়ে কাঁপিয়ে দিলে কোনও কাজ হয় না৷ কোনও জনপ্রতিনিধি যদি প্রকাশ্যে মব লিঞ্চিংকে সমর্থন করেন, তাহলে তাঁর ঠাঁই হতে পারে সতীদাহ প্রথা রদের পূর্বেকার যুগে৷ আধুনিক ভারতে নয়৷

এই ধরনের ঘটনা যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে পুলিশ-প্রশাসন যদি তাতে প্রকাশ্যে মদত দেয়, তাহলে এর পরে বিশ্বসভায় ভারত ঠিক কী ধরনের মর্যাদা পাবে? এখনও শিক্ষিত সচেতন বিশ্বে ভারত শব্দের প্রতিশব্দ বাপুজি, স্বামীজি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু৷ সেই বিশ্ব এর পর ভারতকে ঠিক কী চোখে দেখবে? আমেরিকা-বিলেতের পয়সাওয়ালা স্বল্পশিক্ষিতরা যে চোখে দেখে সেই চোখেই দেখবে৷

- Advertisement -

ভারত মানে জাদু-টোনা, নেশাভাঙ, তন্ত্রমন্ত্র, হরেকৃষ্ণ, খাজুরাহো আর তাজমহল৷ হাজার স্মার্টফোন ছড়িয়েও এই ধারণা ভাঙা যাবে না৷ কারণ এই পয়সাওয়ালা স্বল্পশিক্ষিত গ্লোব ট্রটারদের মতে, ভারত অসভ্যদের দেশ৷ ভিখিরিদের দেশ৷ সেখানে মব লিঞ্চিং ঘটতেই পারে৷ যেমন, বিদেশিনীরা ধর্ষিতা হতে পারেন৷ বিদেশি পর্যটকদের যথাসর্বস্ব লুট হতেই পারে৷ এখনও তাদের চোখে ভারত মানে সাধুসন্ত, ঠগী আর হঠযোগীদের দেশ৷ জগদীশচন্দ্র বসু, সত্যেন্দ্রনাথ বসু কিংবা এপিজে আবদুল কালামের কৃতিত্ব নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই৷

দিনের পর দিন স্মার্ট ফোনে মব লিঞ্চিং ভাইরাল হচ্ছে৷ কিন্তু তাতে কি কোনও কাজের কাজ হচ্ছে? বরং, ভায়োলেন্স আরও বাড়ছে৷ চোখের সামনে এই ধরনের রিয়েলিটি দেখে অনেকের নাকি সেক্সুয়াল আর্জ জাগে৷ হয়তো সেটাই বাড়ছে৷ না হলে তো উলটো প্রতিক্রিয়া ঘটত৷

দুর্নীতি ভারতীয় সমাজে এমনভাবে শিকড় গেড়েছে যেখানে শিক্ষার আঙিনায় ব্যাপম কেলেঙ্কারি নিয়েও তেমন একটা হইচই হয় না৷ ভারত আরব দুনিয়ার শেখশাহি নয় যে, মরুভূমির নীচে তেল যতদিন আছে তার থেকেই হেসেখেলে দিন রাত কেটে যাবে৷ তেলের উপর ভর করে ঘড়ির কাঁটা উলটো দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাইলেও কেউ কিছু বলবে না৷ ভারতকে বাঁচতে হলে কিন্তু আধুনিক সভ্যতার উপর ভর করেই বাঁচতে হবে৷ মহাভারতের যুগের ‘জতুগৃহ’ আবিষ্কার করে সেখানে খুব একটা পাত্তা পাওয়া যাবে না৷

আধুনিক সভ্যতা মানে নিত্যনতুন স্মার্ট ফোন কিনে ঘোরানো নয়৷ ‘লাইক’ করছি আর পিৎজা গিলছি৷ এই ধরনের ব্রাউন সাহিব ইংরেজ আমলেও দেখা যেত৷ ব্রিটিশরা নিজেদের প্রয়োজনে তাদের পুষত বটে, তবে তাদের পোষা কুকুরের চাইতে খুব বেশি মর্যাদা দিত না৷ বরং, কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট তাঁর নিজের লেখায় অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন৷ ব্রিটিশের আশীর্বাদপুষ্ট ভারতীয় রাজন্যবর্গের প্রতি কোনও ভালোবাসা তিনি দেখাননি৷

জওহরলাল নেহরুর পরবর্তী ভারতের যে রাষ্ট্রনেতাই দিল্লির ক্ষমতায় আসুন না কেন, তাঁরা বিশ্ব দরবারে তাঁর মতো ভক্তি, শ্রদ্ধা, মর্যাদা কিংবা ভালোবাসা পাননি৷ এমনকী, তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীও পাননি৷ কারণ, নেহরু সেই মর্যাদা পেয়েছিলেন তাঁর নিজগুণে৷ তাঁর পরবর্তীকালে যাঁরা দিল্লির ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই গুণের অধিকারী তাঁরা হতে পারেননি৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে বাপুজি-র সখ্যতা কিংবা জওহরলাল নেহরুর ঘনিষ্ঠতা এমনি এমনি হয়নি৷ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে রমাঁ রলাঁর বন্ধুত্ব কিংবা পত্রালাপের পটভূমিতে কোনও স্পনসরশিপের দরকার পড়েনি৷

সে-ও এক ভারত, আর আজ এ-ও এক ভারত! মনে হচ্ছে এই ভারত এক উলট পুরাণের রথে চড়েছে৷ হু হু করে পিছন দিকে ছুটছে৷ মোটামুটি অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভে পৌঁছে গিয়েছে৷ এর পর হয়তো সটান মুঘল আমলে ঢুকে পড়বে৷ যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও আসেনি, আর অগাস্টাস হিকিও খবরের কাগজ ছাপাননি৷

মুঘল মিনিয়েচারে যেমন শাহজাদিদের হাতে রত্নখচিত মুকুর, এখনকার ‘শপিং মল’-শোভিতাদের হাতে তেমন সব দামী দামী স্মার্ট ফোন৷ যেন এক বিশাল মুঘল হারেম৷ একজন লিখছে আজ এই খেলাম, কাল ওই খাব৷ প্রত্যুত্তরে কেউ অ্যাপে মেসেজ পাঠাল: আমি একটা নতুন ছাতা কিনেছি, কাল সিনেমা দেখব৷ মাঝখান থেকে গণধর্ষণ থেকে মব লিঞ্চিংয়ের ভয়াল বাস্তব রূপ দেশের বিভিন্ন দিকে ফুটে বের হচ্ছে৷ কে যে বেটিদের বাঁচাচ্ছে কিংবা পড়াচ্ছে, ঈশ্বর জানেন৷

বেটিরা পড়ছে বলেই হয়তো বেটাদের বায়ু আরও কুপিত হচ্ছে৷ কারণ, তাদের হাতেও স্মার্ট ফোন৷ এমন শিক্ষা দেব যে, কোনও দিন আর কোনও বেটি মুখ তুলে তাকাতে পারবে না৷ এই রকম একটা পরিস্থিতিতেই দেশজুড়ে সামাজিক অবক্ষয় ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়৷ আমাদের সংবিধান প্রণেতারা কি এই ভারতেরই স্বপ্ন দেখেছিলেন?
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইতোমধ্যেই সরকারকে সতর্ক করেছে৷ বলেছে, ডেমোক্রেসি আর মবোক্রেসি এক জিনিস নয়৷ সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্র ধরে যে নতুন উৎকট পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা তাকে বলেছেন ‘নিউ নর্ম্যালসি’৷ অর্থাৎ যা আদতে অ্যাবনর্মালিটি৷

সময়বিশেষে গণহিস্টিরিয়া অনেক সমাজেই দেখা দেয়৷ কিন্তু স্মার্ট ফোনের হাত ধরে যে অ্যাবনর্মালিটি ভারতের সমাজে দেখা দিয়েছে তার অতীত নজির মেলা ভার৷ ভবিষ্যৎ অবস্থাটা কিন্তু সেই স্ক্যাডিনেভিয়ান ইঁদুরদের মতো৷ দলে দলে ছুটছে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মরতে৷ এই অবস্থা চলতে থাকলে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতে হয়তো অনেক স্মার্ট সিটি গড়ে উঠবে, কিন্তু সেগুলির অবস্থা হবে স্টিফেন কিংয়ের উপন্যাসে বর্ণিত ডেরি শহরের মতো৷ শহরে ক্রমে স্বাভাবিক পরিবারের সংখ্যা কমে আসবে৷ জোম্বি ফ্যামিলির সংখ্যা বাড়বে৷ সকালে তারা ড্রাকুলার মতো বিছানায় পড়ে থাকবে, রাতে বের হবে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের রক্ত পান করতে৷ ক্রমে ক্রমে গোটা শহরটাই হয়ে যাবে মৃতের নগরী৷

Advertisement
---