মানব গুহ: বুধবার কর্ণাটকে কংগ্রেস ও জনতা দল সেকুলার জোট সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়ে গেল। আর এদিনই লোকসভা ভোটে বিজেপি বিরোধী ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ার পরিকল্পনাকে আরও কিছুটা বাস্তবায়িত করল বিরোধীরা। জোটের শপথে হাজির সমস্ত বিজেপি বিরোধী নেতারা। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর বিজেপি বিরোধী নেতাদের একসঙ্গে ছবি তোলা দেখে বলাই যায়, বাস্তবায়িত হবার পথে ফেডারেল ফ্রন্ট৷

কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে লড়াইটা মূলত শুরু করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্ণাটকে কংগ্রেস-জেডিএস জোট সরকারের শপথ গ্রহণের মত এতবড় একটা উপলক্ষ্য ছাড়তে চান নি বিজেপি বিরোধী নেতারা।

২০১৭ র জুলাইয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় থেকেই এই ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন করার চিন্তা ভাবনা শুরু৷ এর পরেও বিভিন্ন সময়ে ২০১৯ এর লোকসভায় বিজেপি বিরোধী ফেডারেল ফ্রন্ট গঠনের কথা হয়েছে। কখনও শরদ পাওয়ারের নৈশভোজে, কখনও বা সনিয়া গান্ধীর নৈশভোজে আলোচনায় উঠে আসে বিজেপির বিরুদ্ধে ১৯ এর লোকসভা যুদ্ধের পরিকল্পনা৷

বেঙ্গালুরুর রাজনৈতিক পরিবেশও কিন্তু এই নিয়েই বেশ সরগরম৷ গড়ে কি উঠবে বিজেপির বিরুদ্ধে বিকল্প জোট? এতগুলো দল মিলে কি একজোট হয়ে তৈরী হবে দেশের বর্তমান শাসক দলের বিরুদ্ধে একটা জোরদার ফেডারেল ফ্রন্ট? অনেক প্রশ্ন নিয়েই বুধবার কর্ণাটক শপথে এসেছিলেন বিজেপি বিরোধীরা৷ কুমারস্বামীর শপথের চেয়েও বেশি নজর ছিল ফেডারেল ফ্রন্টের নেতাদের আলোচনার দিকে৷

শুরুটা করেছিলেন কংগ্রেস নেত্রী সনিয়া গান্ধী৷ ২০১৯ সালে, একা কংগ্রেসের পক্ষে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়া সম্ভব নয়, বুঝতে পেরেছেন সনিয়া৷ তাই ১৭ র জুলাইয়েই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই শুরু করেছিলেন ১৯ এর লোকসভা ভোটে ফ্রন্ট গড়ার প্রস্তুতি৷ তখনও তাঁর প্রধান সেনাপতি ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

এর মাঝে মমতা নিজে কংগ্রেস ও বিজেপি বিরোধী জোট নিয়ে আলোচনা সেরেছিলেন শিবসেনা প্রধান উদ্ধব ঠাকরে, দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী ও আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ডিএমকের কার্যকরী সভাপতি এমকে স্টালিন, তেলেঙ্গনা মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও সহ অন্যান্য বিজেপি ও কংগ্রেস বিরোধী নেতাদের সঙ্গে৷ এই বৈঠকগুলোয় অ্যান্টি বিজেপি ও অ্যান্টি কংগ্রেস ফ্রন্ট গড়া যায় কিনা তাই নিয়েই প্রধানত আলোচনা হয়েছিল৷

কিন্তু পরে জোটসঙ্গীদের অভিজ্ঞতায় মমতা বুঝতে পারেন যে, ভারতীয় রাজনীতিতে এই মূহুর্ত্বে কংগ্রেসকে ছাড়া বিজেপির বিরুদ্ধে ফেডারেল ফ্রন্ট গঠন করা সম্ভব নয়৷ তাই, কয়েকমাস আগের রাজ্যসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের অভিষেক মনু সিংভিকে সমর্থন করে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস।

আর তাই, বুধবার কুমারস্বামী দেবগৌড়ার শপথে বিরোধী জোটের মুখ সেই রাহূল গান্ধীর কংগ্রেস৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও এই বেঙ্গালুরু সফরে সনিয়া গান্ধী ও রাহূল গান্ধীর সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবেন বলেই খবর রাজনৈতিক মহলে৷ বাকি অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গেও মমতা-সনিয়া কথা বলবেন বলে জানা গেছে৷

তবে, মমতা না থাকলেও সনিয়া গান্ধীর ডাকা ডিনারে হাজির হয়েছিলেন বিজেপি বিরোধী প্রায় ১৯ টি দল৷ এমনকি ওই নৈশভোজে হাজির হয়েছিলেন সিপিআইএম, সমাজবাদী পার্টি এমনকি শরদ পাওয়ারের এনসিপি ও৷ কংগ্রেস ও জেডিএস ছাড়া বুধবার কর্ণাটক শপথেও হাজির ছিলেন এই সমস্ত বিজেপি বিরোধী দলের প্রায় সব নেতাই৷ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিজেপি বিরোধী জোট নিয়ে আলোচনাও এই অনুষ্ঠানে হাজির হওয়ার আরও একটা উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন থেকেই ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটে বিজেপি বিরোধী ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ বা জোট তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল৷ কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা, জেডিইউ নেতা তথা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার, সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, এনসিপি সভাপতি শরদ পাওয়ার, সিপিআই নেতা ডি রাজা, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ নেতা পিকে কুনহালিকুট্টিরও এই জোটে থাকা নিয়ে কথা হয়েছিল৷

এছাড়া সমাজবাদী পার্টি নেতা অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা লালুপ্রসাদ যাদব, তেলেগু দেশম পার্টির চন্দ্রবাবু নাইডু, বিএসপি নেত্রী মায়াবতী এবং ডিএমকে নেতা স্ট্যালিন, প্রত্যেকেরই ফেডারেল ফ্রন্টে থাকার সম্ভাবনা৷

যদিও, ১৯-২০ টি আঞ্চলিক দলের সব মতানৈক্য দূর করে আদৌ ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ে ওঠে কিনা সেটা প্রশ্নের৷ তবে, সব আঞ্চলিক দল নিয়ে সত্যি এই ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ে উঠলে তা বিজেপির পক্ষেও যে যথেষ্ট চিন্তাজনক হবে তা বলাই যায়৷ আর তাই, বুধবার কুমারস্বামীর শপথের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল তথাকথিত ফেডারেল ফ্রন্টের নেতাদের কি আলোচনা হয় সেটার দিকে৷

তবে, যেভাবে কর্ণাটকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর মঞ্চে ফেডারেল ফ্রন্ট নেতাদের একসঙ্গে একত্রে ছবি তুলতে দেখা গেল তাতে বলাই যায়, ২০১৯ লোকসভায় বিজেপি বনাম ফেডারেল ফ্রন্ট লড়াই অনেকদূর এগিয়ে গেছে৷ তবে শেষ পর্যন্ত তা কতটা এবং কিভাবে বাস্তবায়িত হয় সেটাই এখন দেখার৷

--
----
--