‘পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা অনেক বেশি পরিণত’, বললেন বাংলাদেশের সায়ান

ফরজানা ওয়াহিদ সায়ান৷ ইউটিউবের দৌলতে ওপার বাংলার এই জনপ্রিয় শিল্পী এখন এপার বাংলাতেও পরিচিত৷ এবছর দুর্গাপুজোয় কলকাতার কুমোরটুলি সার্বজনীনের ‘থিম সং’ গাইছেন তিনি৷ তাঁকে দিয়েই এনআরসি ইস্যুতে ধর্মীয় ভেদাভেদের রাজনীতির বিরুদ্ধে বার্তা দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা৷ স্টুডিও ভাইব্রেশন-এ সেই থিম সং রেকর্ডিং শেষ করার পরই কথা শুরু হল সায়ানের সঙ্গে৷ প্রশ্ন করলেন দেবযানী সরকার৷

কলকাতা 24×7: এই প্রথম কলকাতায় দুর্গাপুজোর গান গাইছ৷ এর আগে কলকাতায় এসে কখনও গান গেয়েছে?

সায়ান: কলকাতায় আমি মাঝে মধ্যেই আসি৷ একবার নিজের রেকর্ডিং করেছিলাম এখানে৷ তবে কোনও আমন্ত্রণ পেয়ে এখানে গান গাইতে আসা হয়নি৷ এটাই প্রথম কলকাতায় গান গাওয়া৷

- Advertisement -

কলকাতা 24×7:কলকাতার দুর্গাপুজো দেখেছ?

সায়ান: নাহ৷ কলকাতায় এসে দুর্গাপুজো দেখা হয়নি৷ তবে ইউটিউবে অনেক ভিডিওস দেখেছি৷

কলকাতা 24×7: তোমার প্রত্যেকটা গানই সমাজকে বার্তা দেয়৷ এই পুজোর গানেও একটা বার্তা আছে৷ প্রথম থেকে এই ধরণের গান কেন বাছলে? অন্য ট্র্যাকে হাঁটলে না কেন?

সায়ান: আমি আসলে গানের কারিগর বা শিক্ষিত গায়ক নই৷ কোনওদিন ব্যাকরণ মেনে নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করে গান গাইনি৷ প্রাণ থেকে যেটা আসে সেটাই লিখি, সেটাই গাই৷ যেকথা প্রাণে নেই সেটা লিখব কিভাবে? তাই আমাকে ঠিক সুশিক্ষিত গানের মানুষ বলা যাবে না৷

কলকাতা 24×7: তুমি তোমার গান দিয়ে ধর্মের উদারতার কথা বল৷ এর জন্য নিজের দেশে কখনও সমালোচিত হতে হয়েছে?

সায়ান: উদারতা যদি আমি বুঝি তাহলে সঙ্কুচিত হয়ে কেন থাকব? বিশ্বের সবাইকে কেন নিজের ভাবব না? নিজের ভাবলেই কিন্তু কোনও সমস্যা থাকে না৷

কলকাতা 24×7: তোমার এই গান গাওয়ার পেছনে সব থেকে বেশি অনুপ্রেরণা কার?

সায়ান: ব্যক্তির কথা যদি বলতে হয় তাহলে মা৷ তিনি অপেশাদার গায়ক ছিলেন কিন্তু তাঁর গানের একটা তৃষ্ণা ছিল৷ আমি পাঁচ বছর বয়স থেকে মায়ের কাছেই থাকি৷ মায়ের থেকেই গান গাওয়ার প্রেরণা পেয়েছি৷

কলকাতা 24×7: তোমার ড্রেস কোড নিয়ে অনেক শ্রোতার মনেই এইটা কৌতুহল রয়েছে৷ সায়ান কেন কখনও সাজে না? কেন ব্ল্যাক ড্রেস পরে? এর কী উত্তর দেবে?

সায়ান: শুধু ব্ল্যাক নয়৷ সাদা, লালও আছে৷ তবে ব্ল্যাকটা বেশি পরি তার কারণ এটা একটা ইউনিফর্মের মতো করে নিয়েছি৷ আসলে আমি অলস৷ জামাকাপড়ের পেছনে যে সময়টা দিতে হয় সেটাই দিতে পারি না৷ আর সাজগোজের ব্যাপারে বলব আসলে আমরা যে শহরে থাকি সেই ঢাকা-কে ট্রাফিক জ্যামের রাজধানী বলা হয়৷ তাছাড়া সাজগোজ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ শখের৷ এই শখটা আমার নেই৷ তাই এড়িয়ে চলি৷ তবে সাজগোজের বিরুদ্ধে কোনও মত নেই৷ কিন্তু আগ্রহও নেই৷

কলকাতা 24×7: আমার কিছুই হবার নেই/ দেখছ যেমন এটাই শখ…. তোমার এই গানটা শুনলে মনে হয় তোমার নিজের লাইফে কোনও লক্ষ্য নেই৷ জীবন যে পথে তোমাকে নিয়ে যাবে তুমি সে পথেই যেতে রাজি৷ সত্যিই কী তাই?

সায়ান: সেটা এখন নেই৷ কিন্তু আগে ছিল৷ আমার একদম ব্যক্তিগত মতামত যে, এতে কষ্ট বাড়ে বৈ কমে না৷ ধর, একটা মানুষ নাম-ডাক কিংবা অর্থ চাইল আর সেটা না পেয়েই সে পৃথিবী থেকে চলে গেল৷ তখন কিন্তু সে একটা ক্ষেদ নিয়ে যাবে৷ আর এই ক্ষেদটা আমাদের বানানো৷ তার থেকে একটা ঝরাপাতা হতে চাই৷ যদি একটা পাখি শুধু পাখি হয়ে জন্মে সফলতা নিয়ে মরতে পারে তাহলে আমি কেন পারব না? আসলে আরও-ওর কোনও শেষ নেই৷ এটা একটা তলাবিহীন ঝুড়ির মতো৷ আমার যে অ্যাম্বিশন নেই তা নয়৷ কিন্তু যে জায়গায় আমি মনে সেটা ক্ষতিকর হতে চলেছে সেই জায়গায় আমি সেটা কেটে দিই৷

কলকাতা 24×7: তুমি নিজেই বল তোমার সারাক্ষণের সঙ্গী, বন্ধু, প্রেম বলতে এই গিটার৷ এটা ছাড়া আর কোনও প্রেম?

সায়ান: হ্যাঁ৷ মানব প্রেমও হয়েছে৷ আমার আট বছরের একটা সংসার ছিল৷ চার বছর প্রেম করেছি৷ চার বছর সংসার করেছি৷ আর চার বছর লেগেছে সেই সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসতে৷

কলকাতা 24×7: তোমার একের পর এক গান জনপ্রিয় হচ্ছে৷ সাফল্য বাড়ছে৷ আর সফলতা মানুষের ব্যস্ততা বাড়ায়৷ কিন্তু তুমি নিজে বল যে তুমি ঘরকুনো, অলস৷ তাহলে আগামী দিনে সবকিছু ম্যানেজ করবে কীভাবে?

সায়ান: আমি যে খুব খ্যাতিবিমুখ তা নই৷ কিন্তু আমি এটাই ভাবি যে, অনেক মানুষ আমাকে, আমার গানকে ভালবেসেছেন৷ এর বেশি চাইলে আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে৷ আর বেশি পরিশ্রম করলে জীবনের আনন্দের ভাগটা কমে যাবে৷ সেটা কমিয়ে খ্যাতি বাড়িয়ে কোনও লাভ নেই৷ তাতে নিজেকে ঠকানো হবে৷ এই একটা জীবনে আর কদিন বাঁচব?

কলকাতা 24×7: তুমি নিজে কী চাও সেটা তোমার কাছে খুব স্পষ্ট৷ কথা বললে বোঝা যায় তুমি খুব পজিটিভ৷ তোমার গানেও পজিটিভিটি রয়েছে৷ কিন্তু যখন খুব মন খারাপ হয় বা চরম হতাশার মধ্যে নিজেকে কীভাবে সামলাও?

সায়ান: মন খারাপ হবেই৷ একটা জীবনে মন খারাপ, দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ সব আছে৷ কিন্তু এই দুঃখটা পার হতে হবে৷ জীবন তো আমাদের ভালবাসাও দেয়৷ সেখান থেকেই আবার কাজের এনার্জি পাই৷ দুঃখ চাপা দেওয়ার মধ্যে কোনও কৃতিত্ব নেই৷

কলকাতা 24×7: পুজোয় তোমার নিজের কোনও গান রিলিজ হবে?

সায়ান: আমি কিছু প্রোজেক্টের কাজ করি৷ উইমেন রাইটসের উপর আমি কিছু গান করছি৷ সেই কাজগুলোই আমার রয়েছে৷ এছাড়া আমার নিজের কিছু গান রয়েছে৷ সিনেমায় একটা-দুটো গান রয়েছে৷ এছাড়া সারা বছরই আমি মেন্টাল হেলথ নিয়ে কাজ করি৷

কলকাতা 24×7: ইতিমধ্যেই দু-একটি সিনেমায় তুমি গান গেয়েছে৷ তারপর আর কোনও সিনেমায় প্লে-ব্যাকের অফার এসেছে?

সায়ান: আমার শিল্পী হিসাবে একটা সীমাবদ্ধতা আর মানুষ হিসেবে একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে৷ মনকে সংকীর্ণ করে আমি কোনও কাজ করতে পারি না৷ তার মধ্যে যেটা পাচ্ছি সেটা করছি৷

কলকাতা 24×7: এদেশের পছন্দের শিল্পী কে?

সায়ান: প্রথমেই বলব লতা মঙ্গেশকর৷ আমার খুব প্রিয় মানুষ৷ তবে একজন নয়, একাধিক শিল্পী রয়েছেন সেই তালিকায়৷ কিশোর কুমার, আর ডি বর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কবীর সুমন, নচিকেতা৷ এখনকার শিল্পীদের মধ্যে ইমনকে ভাল লাগে৷ এখানকার গানবাজনার একটা শক্ত ভিত রয়েছে৷ ঐতিহ্য রয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীরা অনেক বেশি পরিণত৷ আমি যে জায়গা থেকে এসেছি সেখানকার মানুষ হয়তো আঘাত পেতে পারেন আমার কথায়৷ কিন্তু এটাই আমার উপলব্ধি৷ এখানকার লোকেরা ব্যাকরণ জেনে গান গায়৷

কলকাতা 24×7: পুজোর গান গাইলে৷ তাহলে এবছর দুর্গাপুজোয় সায়ান কী কলকাতায় থাকছে?

সায়ান: সেটা এখনই বলতে পারছি না৷ তবে খুব ইচ্ছে আছে৷

Advertisement
-----