এসএসসি মুক্ত স্বচ্ছ ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় ম-ম লাড্ডু

ফাইল ছবি৷

বিশ্বজিৎ ঘোষ

আহা… কী মহিমা উৎসবের! রকমফের যা-ই হোক না কেন, উৎসবের এমনই অপার মহিমা যে, একই সঙ্গে তা লোভনীয় এবং লাভেরও! লাড্ডুও তেমনই৷ তারও মহিমার অন্ত নেই৷ আর, লাড্ডু যদি দিল্লির হয়, তা হলে তো কোনও কথা-ই নেই!

তবে, লাড্ডু দিল্লির কি না সে প্রসঙ্গ উহ্য রেখেও ফের মনে করা যায় যে, গত লোকসভা নির্বাচনের আগে কলকাতায় এসে দুই হাতে দুই লাড্ডুর কথা শুনিয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী৷আর, উৎসব? তার তো কোনও সীমারেখাও নেই৷ বরং, দিনকে দিন তার আরও বিস্তার ঘটছে৷ এমনই সে বিস্তার যে, উৎসব কেবল আর ধর্মীয় কোনও আচার-রীতিতেও আবদ্ধ নেই৷

যে কারণে, ওই উৎসব হিসেবেই যেমন মেতে উঠতে দেখা যায় আইপিএল-এ কলকাতা চ্যাম্পিয়ন হলে, তেমনই তা আবার দেখা যায় দীর্ঘ বছর পর মোহনবাগান ক্লাব ভারতসেরা হলেও৷ কেবল তো আর ক্রীড়া প্রীতির জন্য নয়৷ তা ছাড়া, উৎসবের জন্য কোনও বিষয় খুঁজে নিতেও এখন সেভাবে কোনও সমস্যাও হয় না৷ তেমনই, বিষয় হিসেবে রয়েছে সিনেমা প্রীতিও৷ তার উপর, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের নানা রকম-ধরনের উৎসব তো রয়েইছে৷ রাজকোষে ঘাটতি সত্ত্বেও সে সব উৎসব আয়োজনে অবশ্য কোনও খামতি দেখা যায় না৷ তবে, ভোটে জয়লাভের পর তো উৎসবের মাহাত্ম্যও বদলে যায়৷ তেমন হবে না-ই-বা কেন!  ভোট-উৎসব যে বড় মাপের এক উৎসব৷ তার ধারে-কাছে আসবে কী করে অন্য যাবতীয় উৎসব!

- Advertisement -

কেননা, তা গোটা দেশের অথবা রাজ্যের জন্য হোক কিংবা কোনও রাজ্যের পঞ্চায়েত অথবা পুরসভার জন্য, ওই একটিমাত্র উৎসবেই যে মেতে ওঠার সুযোগ পান ক্ষমতাবান-ক্ষমতাহীন নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক! ‘চেটেপুটে উপভোগ’ করতে পারেন ওই উৎসবের আয়োজন! কারণ, ওই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করেই না ক্ষমতাহীন নাগরিকও নিজেকে সম্মানিত বোধ করতে পারেন! আর, উৎসব যদি হয় কোনও সরকারের বর্ষপূর্তির, তা হলে তো নয়া প্রজন্মের ভাষায় বলা যেতেই পারে যে, কোনও কথা হবে না বস!

কোনও কথার কোনও সুযোগ-ও হয়তো নেই এখানে! তা বর্ষপূরণের এই উৎসব পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষেত্রে হোক অথবা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষেত্রে৷ উভয় ক্ষেত্রেই এমনই ভাব যে, কোনও কথা হবে না! কী করে আর হবে কথা, কোনও সুযোগও কি থাকে যে অবকাশ মিলবে কোনও কথার! কেন-ই-বা সুযোগ থাকবে!  এত আশ্বাস, এত প্রতিশ্রুতির আয়োজন থাকে এমন উৎসবে যে, তার কাছে যাবতীয় ব্যর্থতা তখন ফিকে মনে হয়৷ বলতে গেলে, পুরানো আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি ঢেকে যায় নতুন নতুন আশ্বাস-প্রতিশ্রুতির রঙে৷

সরকারে আসার আগে ভারতীয় জনতা পার্টির ইস্তাহারে ছিল বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি৷ আর, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আশ্বাস-প্রতিশ্রুতিও দিয়ে চলেছেন নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর মন্ত্রিসভার কোনও কোনও সদস্য৷ ওই সব আশ্বাস-প্রতিশ্রুতির উপর ভর করে স্বপ্ন দেখছেন দেশবাসী৷ কী নেই স্বপ্নের ওই তালিকায়?  এসএসসি মুক্ত নতুন ভারত থেকে শুরু করে এ দেশকে স্বচ্ছ করার অভিযান৷ ডিজিটাল ইন্ডিয়া থেকে শুরু করে মেক ইন ইন্ডিয়া৷ একের পর এক স্বপ্ন৷ যেন, বিজ্ঞাপনের মতো একের পর এক সুন্দর দৃশ্য৷ স্বপ্ন তো ক্ষমতাহীনরাও দেখেন, দেখতে চান৷ স্বপ্ন তো না খেতে পাওয়া অথবা অর্ধাহারে থেকে যাওয়ারাও দেখেন, দেখতে চান৷

যদিও, এমন নানা স্বপ্নের বিষয়ে অনাহার-অর্ধাহারে থেকে যাওয়াদের কত শতাংশ জানতে পারে, সে বিষয়েও প্রশ্ন থেকে যায়৷ তবে, তাঁরাও তো স্বপ্ন দেখেন, দুধে-ভাতে না হোক, দু’বেলা যেন অন্তত জোটে দু’মুঠো নুন-ভাত৷স্বপ্নের কাজ তো স্বপ্ন করবেই, তাতে কী-ই-বা আসে যায়! কাজেই, ডিজিটাল ইন্ডিয়া আর মেক ইন ইন্ডিয়া-র জন্যেও হয়তো ক্ষমতাহীনরাও স্বপ্ন দেখেন যে, ঝলমল ইন্ডিয়ার আলো পড়বে অন্ধকার ভারতের উপরেও৷ স্বপ্ন হয়তো দেখেন অনাহারে অথবা অর্ধাহারে থেকে যাওয়ারাও যে, দু’বেলা ভরবে তাঁদের পেট৷

স্বপ্ন কেন দেখবেন না নাগরিকরা! সকলেই তো কম-বেশি শান্তি-স্বস্তিতে থাকতে চান৷ আর, যেখানে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, কালো টাকা দেশে ফিরিয়ে এনে, ওই টাকা থেকে প্রতিটি দেশবাসীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হবে! গত লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির ইস্তাহারে এমনই স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল৷ অথচ, ওই ইস্তাহারে যে সব আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে অন্তত ১০টি ক্ষেত্রে গত এক বছরে সেভাবে উচ্চবাচ্যই দেখা গেল না! ওই ১০টির মধ্যে ছিল, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি, শিক্ষা-খাদ্যের অধিকার, বিচার ব্যবস্থার সংস্কার, কৃষি-শিল্প-পরিকাঠামো ক্ষেত্রে সম্পদ বৃদ্ধি এবং মূল্যবৃদ্ধিতে রাশ টানতে অসাধু ব্যবসায়ী, মজুতদারদের শাস্তির জন্য বিশেষ কোর্টের মতো বিষয়ও৷

তবে, ওই সবের পরিবর্তে নতুন নতুন স্বপ্নও দেখানো হচ্ছে৷ যার মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছ ভারত অভিযান, জন ধন যোজনা, মেক ইন ইন্ডিয়া, অটল পেনশন যোজনা এবং প্রধানমন্ত্রী বিমা যোজনার মতো বিষয়ও৷ যদিও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সবের কোনওটির সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নতি অথবা সংস্কার কর্মসূচির প্রত্যক্ষ কোনও সম্পর্ক নেই৷ না-ই-বা থাকুক, এ সবের জেরেও তো স্বপ্ন দেখতে পারেন ক্ষমতাহীনরাও৷ স্বপ্ন-ই তো! তাতে সমস্যা কোথায়!  প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্বাধীনতা দিবসের প্রথম ভাষণে, বিশ্ববাসীকে মেক ইন ইন্ডিয়া-র বার্তা দিয়ে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার কথা বলেছেন নরেন্দ্র মোদী৷ এবং, ওই দিন একই সঙ্গে, ২০১৯-এ মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে দেশবাসীকে পরিচ্ছন্ন ভারত উপহার দেওয়ারও স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী৷

স্বপ্ন তো দেখতে চান ক্ষমতাহীনরাও৷ কারণ, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে এসএসসি মুক্ত ভারত গঠনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি৷এসএসসি অর্থাৎ, স্ক্যাম-স্ক্যান্ডাল-করাপশন৷ দেশকে এ হেন এসএসসি মুক্ত করার স্বপ্নে যে বিভোর হবেন ক্ষমতাহীনরা, তাতে আর অন্যায় কোথায়৷ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্নীতিকে দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আপাতত প্রথম বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য দেখা যাচ্ছে৷ তবে, এই এক বছরে কেন্দ্রীয় সরকারকে বেশি যত্নবান হতে দেখা গিয়েছে একটি ভাবমূর্তি নির্মাণের জন্য৷ এবং, তা হল মোদী ইজ দ্য বেস্ট৷ আর, আচ্ছে দিনের কথা তো সেই কবে থেকেই বলছেন নরেন্দ্র মোদী৷ এখন অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর দাবি, আচ্ছে দিন চলে এসেছে৷

যদিও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আচ্ছে দিন দূর অস্ত৷ নিজের ঢাক পিটিয়েই এক বছর কাটিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ নিন্দুকেরা তো কত কথাই না বলেন৷ সে সব কি আর ধরতে হয়! কাজেই, কেন্দ্রীয় সরকারের বর্ষপূর্তির উৎসবের সূচনায় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী খোদ জনতার কাছেই বার বার জানতে চেয়েছেন, তাঁরাই বলুন আচ্ছে দিন এসেছে কি না? প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নের উত্তর অবশ্য তিনি নিজেই দিয়েছেন৷ আর, ওই উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খারাপ সময় কেটে গিয়েছে৷ অন্ধকার থেকে দেশকে আলোর দিকে নিয়ে আসা হয়েছে৷ এখন আচ্ছে দিন চলছে৷ আর, এই আচ্ছে দিনের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি, এক বছর আগেও হতাশা আর অনুন্নয়নের গভীর অন্ধকারে ডুবে ছিল এ দেশ৷

অথচ, আচ্ছে দিন কোথায়, তা খুঁজে পেতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে৷ বরং, কপালের ভাঁজ আরও চওড়া হচ্ছে বিশেষ করে গরিব জনতার৷ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের জেরে এমনিতেই জেরবার ওই অংশ৷ কম জেরবার নয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিও৷ গত এক বছরে পেট্রপণ্যের মূল্য কয়েক দফায় কমেছিল৷ সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা, পেট্রপণ্যের মূল্য এ বার বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে৷এরই মাঝে আবার বৃদ্ধি পেয়েছে পরিষেবা কর৷ এবং, কর বসানো হবে স্বচ্ছ ভারতের জন্যেও৷ এ সবের প্রভাব সাধারণ মানুষের উপর তো পড়বেই, বিশেষ করে গরিব মানুষের দুর্দশাও আরও বাড়বে৷

এ দিকে, এরই মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে ডালের দামও৷ যদিও, দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারীদের জন্য নামমাত্র মূল্যে খাদ্যশস্য দেওয়ার প্রকল্প রয়েছে৷ কিন্তু, দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসকারী হিসেবে যাঁরা চিহ্নিত নন অথচ যাঁদেরও নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা, তাঁদের কী হবে? কী হবে মধ্যবিত্ত শ্রেণির৷ কী হবে ওই অংশের, যে অংশ এমন চাকরিজীবী যে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ে না তাঁদের বেতন৷ এবং, শ্রমিক-মজুরের যে অংশেরও মজুরি বাড়ে না দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে? কী হবে, এই সব অংশের ক্ষেত্রে? প্রধানমন্ত্রীর আচ্ছে দিনের আলো-বাতাস কি পাবেন তাঁরা?

সবই আসলে উৎসবের মহিমা৷ অপার মহিমার ওই উৎসব লোভনীয় তো বটেই৷ কেননা, উৎসবে তো সকলেই কম-বেশি মেতে উঠতে চান৷ আর, নানা দিক থেকে উৎসব আবার লাভেরও৷ যার মধ্যে রয়েছে রাজনীতির বিষয়ও৷ উৎসবে মেতে থাকার সময় সাধারণত অন্য কোনও বিষয় মনে না এনে তা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টাও চলে৷ কাজেই, বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে যদি জনতাকে উৎসবের আবহে মাতিয়ে রাখা সম্ভব হয়, তা হলে মন্দ কোথায়! তা সে রাজ্য হোক অথবা কেন্দ্রীয় সরকার৷ কোনও না কোনও বিষয়কে ভিত্তি করে উৎসবের আয়োজন হলে যে সাময়িক হলেও জনতার বিভিন্ন অংশকে তাতে মাতিয়ে রাখা সম্ভব হয়, তার প্রমাণও রয়েছে৷ সবই আসলে মহিমা, ওই উৎসবের!

বর্ষপূর্তির উৎসবের আয়োজন করতে দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারকে৷ আর, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তির উৎসব চলবে বছরভর৷ রাজ্য সরকারের মতো বর্ষপূর্তির বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষেত্রেও৷ বছরভর কেন্দ্রীয় সরকারের ওই উৎসবের অঙ্গ হিসেবে গোটা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাড়ে চার হাজার জনসভার আয়োজন করা হবে৷ মন্ত্রীরা বিভিন্ন রাজ্যে গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্য তুলে ধরবেন সংবাদমাধ্যমে৷ আর, সেজন্য স্লোগান রাখা হয়েছে, ‘সাল এক কাম অনেক’, ‘মোদী সরকার কাম লাগাতার’৷ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করা হবে পুস্তিকা৷ শুধু তাই নয়৷ মহাসম্পর্ক অভিযানের মাধ্যমে মোদী সরকারের এক বছরের সাফল্যের বিষয়ে আগামী তিন মাস ধরে ১০ কোটি পরিবারের ফিডব্যাকও নেওয়া হবে৷ আর, বর্ষপূর্তিতে দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা,  সবে তো সাফল্যের শুরু হল৷ আগামী চার বছরে মানুষের জীবন বদলে দেবেন তিনি৷

গত ৩০ বছরের মধ্যে এ ভাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অন্য কোনও সরকার আসেনি কেন্দ্রে৷ ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারকে অবশ্য স্যুট বুটের-কর্পোরেট বন্ধু হিসেবে সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে কংগ্রেস৷ বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, সেই কারণেই হয়তো বর্ষপূর্তির উৎসবের সূচনায় গরিব-কৃষক-শ্রমিকের সরকার বলে বার্তা দিতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে৷ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও প্রধানমন্ত্রী ওই বার্তা দিয়েছেন৷ আসলে, সবই হল উৎসবের অপার মহিমা৷ যে কারণেই হয়তো রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার নির্বিশেষে প্রকাশ পায় ওই মহিমার৷ যে কারণেই হয়তো, বর্ষপূর্তির উৎসবের সূচনায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মিলও খুঁজে পাওয়া যায়৷ সেই মিল যেমন উৎসবের ক্ষেত্রে, তেমনই তা আবার রাজনীতি তথা আশ্বাস-প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও৷ ওই সব আশ্বাস-প্রতিশ্রুতির মধ্যে যদি শুধুমাত্র কর্মসংস্থানের বিষয়টি ধরা হয়, তা হলেও কোনও কথা হবে না বস! কাকতালীয় হলেও এই বিষয়ে আশ্চর্য মিল৷

কর্মসংস্থানের জন্য যে চপ-তেলেভাজার দোকানও কত গুরুত্বপূর্ণ, তা বলেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ আর, ওই কর্মসংস্থানের জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও একই ধরনের কথা বললেন! সরকারের বর্ষপূর্তির উৎসবের সূচনা করে মথুরার সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রোজগার-কর্মসংস্থানের সুযোগ বড় বড় সংস্থার মাধ্যমে বৃদ্ধি পায়, এমনটা মোটেও নয়৷ এটা ভুল ধারণা৷ সবথেকে বেশি কর্মসংস্থান প্রদান করেন সবজি বিক্রেতা, লন্ড্রি, সেলুন, সংবাদপত্র বিক্রেতা, মুদি দোকান, দুধের দোকান, রেস্তোরাঁ৷ নরেন্দ্র মোদী আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে মিল দেখা যাচ্ছে এই ক্ষেত্রেও: মুখ্যমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে দাবি করেন, ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কিছুই হয়নি পশ্চিমবঙ্গে৷ আর, বর্ষপূর্তির উৎসবের সূচনার ভাষণে প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, গত বছর যদি লোকসভা ভোট না হত৷ এবং, তাঁরা যদি জিতে না আসতেন৷ তা হলে অন্ধকারে নিমজ্জিত হত দেশ৷ দুই সরকারের মধ্যে মিল রয়েছে আবার সৌন্দর্যায়নের বিষয়েও৷ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৌন্দর্যায়নের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ আর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বচ্ছ ভারত অভিযানের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুঁজে নিয়েছেন নির্মল বাংলা অভিযান৷

নিন্দুকেরা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রথম বছর কেটে গিয়েছে প্রচার করে৷ তা হলে কি এ বার শুরু হবে আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি পূরণের পালা? কেননা, কালো টাকা থেকে কর্মসংস্থান, কোনও প্রতিশ্রুতিই এখনও পর্যন্ত রক্ষা হয়নি৷ খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্পেও এখনও নানা প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে৷ আগের সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের নাম বদল করে, সে সব নতুন প্রকল্প বলে প্রচার চলছে৷ এই বিষয়েও কোনও কোনও ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে মিল রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারের৷ তবে, কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি মতো সাফল্য সত্ত্বেও, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এক বছরের রিপোর্ট কার্ডকে ফ্লপ আখ্যা দেওয়া হয়েছে৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ নরেন্দ্র মোদীর মেক ইন ইন্ডিয়া-কে স্রেফ এক হাইপ-ও বলেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল৷ আর, নিউ ইয়র্ক টাইমস এমন বলেছে, সুপার হিরোর মতো দেওয়া হয়েছিল আশ্বাস-প্রতিশ্রুতি৷ এবং, প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বাস্তবে কি সুপারহিরোর দেখা মেলে?

নিন্দুকেরা বলছেন, আচ্ছে দিন যখন চলেই এসেছে, তখন, তা অনুভব তো করতেই পারছেন দেশবাসী! আচ্ছে দিনের আলো তা হলে তো অন্ধকার ভারতের উপরেও পড়েছে! তা হলে, সরকারের সাফল্যের কাহিনি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে কেন এ ভাবে বছরভর উৎসবের আয়োজন? তা হলে কি দেশবাসী অনুভব করতে পারছেন না আচ্ছে দিন? আর তাই, জনতাকে বোঝানোর জন্যই এই আয়োজন? এমন মিল রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গেও৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম বছরের সাফল্য পুস্তিকায়ও প্রকাশ হয়েছিল৷ পশ্চিমবঙ্গের পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনের আগে, রাজ্যের বর্তমান সরকারের পাঁচ বছরের সাফল্যকে নিয়েও পুস্তিকা প্রকাশ হওয়ার কথা৷ প্রশ্ন এখানেও, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি মতো উন্নয়নের অনুভব কি তা হলে করতে পারছেন না রাজ্যবাসী? তার জন্যই কি এ ভাবে কখনও উৎসব, কখনও প্রচারের আয়োজন?

সবই হয়তো মায়া! সেই মায়া যেমন উৎসবের, তেমনই তা আবার লাড্ডুর-ও! রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার নিজ নিজ ক্ষেত্রে শামিল রয়েছে উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে৷ অথচ, উন্নয়নের ওই রথে জনতার সব অংশ সওয়ার হতে পারছে কি না, সেটাই অন্যতম প্রশ্ন৷ ওই প্রশ্নের উত্তর মিলবে কি না, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আগামী দিনের উৎসব৷ আর, ম-ম (মোদী-মমতা)-র উৎসবে আবার এড়ানো সম্ভব নয় লাড্ডুর সুবাসও৷ তবে, কোনও কথা হবে না বস!

__________________________________________________

আরও পোস্ট এডিট:

(১) দাবাং-ভাইঝি ‘বাচ্চা’ হওয়ায় মরে নিরুপমা-কাদম্বিনী

(২) রামধনুর দীর্ঘ ছায়া বাংলায়!

(৩) ব্লেম গেমে দেশে কি কৃষক কম পড়িয়াছে!

(৪) ছায়াছবির পরবর্তী অংশ বিরতির পর

(৫) আত্মতুষ্টির অবকাশ, না অবকাশের আত্মতুষ্টি!

(৬) তেলেভাজা শিল্প, না শিল্প তেলেভাজা!

__________________________________________________

Advertisement ---
---
-----