পদ্মশ্রী পেলেন বাংলার সুভাষিণী

নয়াদিল্লি: যাত্রাটা সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি হার মানেনি। সেই সাহসিকতাকেই সম্মান জানালেন বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের সাংবিধানিক প্রধান। পদ্মশ্রী পেলেন বঙ্গতনয়া সুভাষিণী মিস্ত্রি।

পার্ক সার্কাসের ব্রিজের নীচে সব্জি বিক্রি করে, পুকুর পরিষ্কার করে, পরিচারিকার কাজ করে তিল তিল করে জমিয়েছিলেন টাকা। সেই অর্থেই গড়ে তুলেছেন দাতব্য হাসপাতাল। সেই বঙ্গতনয়া সুভাষিণী মিস্ত্রিকেই এবার পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করল ভারত সরকার।

বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ১২ বছর বয়সে। ২৩ বছর বয়সে উপযুক্ত চিকিতসার অভাবে হারাতে হয়েছিল স্বামীকে। ১১ বছরের দাম্পত্য জীবনে কোলে এসেছে চার সন্তান। স্বামীর মৃত্যুশোক বড় শোক। সেই শোক সামলাবেন, নাকি ৪ সন্তানকে মানুষ করবেন!

- Advertisement -

এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ভেঙে পড়েননি সুভাষিণী দেবী। দৃঢ় সংকল্প নিয়েছিলেন চোখের সামনে আর কোনও ব্যক্তিকে যাতে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ খোয়াতে না হয়। মনে মনে পণ করলেন হাসপাতাল গড়বেন। সেই হাসপাতালে গরিবের চিকিৎসা হবে বিনা পয়সায়।

৭৩ বছর বয়সী সুভাষিণি মিস্ত্রির লড়াই শুরু হয়েছিল সেই অর্ধ শতক আগে থেকেই। তিনি এমন একজন মা, যিনি মানবকল্যাণের স্বার্থে বাজি রেখেছেন গোটা জীবন। লোকের বাড়ি বাসন মেজেছেন, সবজি বিক্রি করেছেন, দিন মজুরি করেছেন, লোকের জুতো পালিশ করেছেন দিনের পর দিন। মাথা নত করেছেন সারাজীবন মাথা উঁচু করে বাঁচবেন বলে। যেটুকু উপার্জন করেছেন, সিংহভাগটাই চলে গেছে হাসপাতাল তৈরির কাজে।

সালটা ১৯৯৩। জমানো টাকায় হাসপাতাল বানানোর জন্যে কলকাতার শহরের বাইরে ১ বিঘা জমি কিনে ফেললেন সুভাষিণী দেবী। অনেক কম দামে। জায়গাটি কলকাতার কাছাকাছি একটি গ্রামে, হাঁসপুকুর। সবসময় সেই নীচু জায়গায় জল জমে থাকে। পুরো জলা জায়গা। সুভাষিণী নিজে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে মাটি ফেলে সেই জায়গাকে বাসযোগ্য করেছেন। ১৯৯৬ সালে সেখানে গড়ে উঠল হাসপাতাল। নাম দেওয়া হল হিউম্যানিটি হাসপাতাল ‘হিউম্যানিটি হসপিটাল’। হাসপাতাল খোলার প্রথম দিনই ২৫২ জন রোগীর চিকিৎসা হয়েছিল সেখানে। আজও নিত্যদিন ওই হাসপাতালে বহু মানুষের চিকিৎসা করা হয় বিনা খরচে।

এমন একটি হাসপাতাল, যেখানে রোগীকে সামান্য অসুখের জন্যে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করতে হয় না। কোনও কারণ ছাড়া এটা পরীক্ষা, সেটা পরীক্ষা করতে হয় না। যেখানে চিকিৎসা হয় আগে। ফর্মের সই করে, টাকা জমা দিয়ে তবেই হবে চিকিৎসা- এমনটা এখানে চলে না। ন্যূনতম খরচে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। সবই একজন মায়ের পরিশ্রমের ফল। সেই মা আর কেউ নন, ঠাকুরপুকুর বাজারের কাছে হাঁসপুকুরের সুভাষিণী মিস্ত্রি।

স্বপ্নকে উড়ান দিতে জীবনের সমস্ত পুঁজি ঢেলে দিয়েছেন তিনি। লোকের বাড়ি আয়ার কাজ করেছেন। ধুলোয় বসে সব্জি বিক্রি করেছেন। উপার্জন সামান্য কয়েকটা টাকা। দিন মজুর হয়ে কাজ করেছেন। প্রতিদিন ১ টাকা ২৫ পয়সা রোজগার ছিল তখন। পুরো টাকাটাই জমিয়ে রেখেছিলেন। তবুও হেরে যাননি। পরিস্থিতির কাছে মাথা নত করেননি একবারও। এক টাকা, দুটাকা করে জমিয়ে ১০ হাজার টাকা দিয়ে জমি কিনেছেন। গ্রামের মানুষের কাছ ৯২৬ টাকা চাঁদা তুলেছেন, কাদামাটি, বাঁশ টালি দিয়ে গড়েছেন হাসপাতাল।। সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করেছেন। চার সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে অজয় লেখাপড়া করেছিলেন অনাথ আশ্রমে থেকে। সেই অজয় আজ মা সুভাষিণী দেবীর হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক। বর্তমানে অজয় বাবুকে নিয়ে নিয়ে ডাক্তারের সংখ্যা ১২জন। ৪৫টি বেড রয়েছে। একইসঙ্গে রয়েছে ১০টি আইসিইউ।

হাসপাতালকে আরও বড় করার জন্য বেশ কয়েকজন সহৃদয় ব্যক্তি এগিয়ে এসেছেন। আশপাশে আরও ২ বিঘা জমি কেনা হয়েছে। সাংসদ মালিনী ভট্টাচার্যর কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছিলেন ‘হিউম্যানিটি হাসপাতালের’ প্রতিষ্ঠাতা সুভাষিণী মিস্ত্রি। সেই মহিয়সী মহিলার হাতেই এবার উঠল ‘পদ্মশ্রী সম্মান’।