তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আংশিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করলো বামফ্রন্ট। শুক্রবার বিকেলে রাজ্যের ৪২ টি কেন্দ্রের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ২৫ টি কেন্দ্রের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছেন তাঁরা। তাতে দেখা যাচ্ছে জেলার বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে সিপিএমের তরফে প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন প্রাক্তন সাংসদ সুনীল খাঁ। প্রার্থী হিসেবে নাম প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই অভিনন্দনের জোয়ারে ভাসছেন প্রবীণ এই সিপিএম নেতা।

বাঁকুড়ার বড়জোড়া ব্লকের মালিয়াড়া গ্রামে ১৯৪৭ সালের ২৮ আগষ্ট জন্ম সুনীল খাঁয়ের। ছোটো থেকেই ‘ডাকাবুকো’ এই মানুষটির রাজনীতির অঙ্গনেও প্রকাশ হঠাৎ করেই। প্রত্যক্ষভাবে কোন দিন সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এস.এফ.আই এর সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও বরাবর বাম মনোভাবাপন্ন ছিলেন। গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা শেষ করে বাঁকুড়া শহরের সম্মিলনী কলেজে ভর্তি হন। সেখানের পড়াশুনা শেষ করে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

কলেজে পড়ার সময় সেনাবাহিনীতে কাজ করার ইচ্ছে থাকলেও বাবা-মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় তাদের অনিচ্ছায় সুনীল বাবুর সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। জীবিকার তাগিদে এক সময় একা একাই মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। পরে সেখান থেকে ফিরে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে যান সিপিএমের সঙ্গে। পরে ১৯৯৩ সালে মালিয়াড়া গ্রাম পঞ্চায়েতে সিপিএমের পঞ্চায়েত প্রধান নির্বাচিত হন।

প্রধান থাকাকালীনই ১৯৯৬ সালে পার্টির নির্দেশে দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাংসদ নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪ সালে ফের ঐ কেন্দ্র থেকে সাংসদ হিসেবে পূণঃনির্বাচিত হন। দলের কাজের পাশাপাশি সাক্ষরতা আন্দোলনেও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে সুনীল খাঁ এর। ছিলেন দলের শ্রমিক সংগঠন সিআইটিইউ-র গুরুত্বপূর্ণ পদে। বর্তমানে তিনি সিপিএমের বড়জোড়া এরিয়া কমিটির সদস্য।

বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের সিপিএমের প্রার্থী সুনীল খাঁ কলকাতা২৪×৭ কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, পার্টির নির্দেশে অনেক দিন পর আবারো নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছি। সংসদীয় রাজনীতিতে না থাকলেও পার্টির কাজের সূত্রে সারা বছর মানুষের সঙ্গেই থাকি। একদিকে বর্তমানে রাজ্যের মন্ত্রী, ‘ভূমিপুত্র’ তৃণমূলের শ্যামল সাঁতরার নাম ঘোষণা করেছে তাঁর দল।

অন্যদিকে বিজেপির তরফে ‘বিদায়ী’ সাংসদ সৌমিত্র খাঁ প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এই নির্বাচনী লড়াই কি আপনার কাছে খুব কঠিন হচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর চটজলদি জবাব, আমিও তো ‘ভূমিপুত্র’। আমি যেখানে থাকি, আমার সেই গ্রাম মালিয়াড়া, বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যেই পড়ছে। ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে বড়জোড়া, সোনামুখীতে আমরাই জিতেছি। তাছাড়া দুর্গাপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে আমি যখন নির্বাচিত হয়েছিলাম সেই সময় বাঁকুড়ার বড়জোড়া ও সোনামুখী, বর্ধমানের খণ্ডঘোষ বিধানসভা কেন্দ্র দু’টি আমার লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে ছিল।

সাক্ষরতা আন্দোলনে যুক্ত থাকার সুবাদে ইন্দাস, বিষ্ণুপুরের সঙ্গেও যেমন আত্মিক যোগাযোগ, তেমনি পার্টির অসংখ্য কর্মসূচীতে ওখানে যোগ দিয়েছি। সেই হিসেবে লড়াই মোটেও শক্ত নয় বলেই তিনি মনে করেন। কবে থেকে প্রচার শুরু করবেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগামীকাল রবিবার সকালে ক্ষেতমজুরদের এক সভায় যোগ দেওয়ার কথা আছে। তারপর পার্টি যেভাবে নির্দেশ দেবে সেভাবেই প্রচার কর্মসূচী চালানো হবে বলে তিনি জানান।

বিষ্ণুপুর লোকসভা কেন্দ্রে প্রাক্তন সাংসদ সুনীল খাঁ প্রার্থী হচ্ছেন জেনে উজ্জীবিত সেখানকার বাম কর্মী সমর্থকরা। এক সময়ের ‘লাল দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত প্রাচীণ ঐতিহ্যের পীঠস্থান বিষ্ণুপুরে আবারো লাল পতাকারই জয় হবে, এমনটাই মনে করছেন তারা।

সিপিএম কর্মী সিপিএমের বাঁকুড়া জেলা কমিটির অন্যতম সদস্য, বিষ্ণুপুরের প্রাক্তন বিধায়ক স্বপন ঘোষ (ঝড়ু) বলেন, এক জন যোগ্য ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষকে পার্টি নির্বাচিত করেছে। এই মুহূর্তে শ্রমজীবি মানুষের কথা সংসদে তুলে ধরার মতো সাংসদের অভাব সুনীল খাঁ অনেকটাই পূরণ করবেন। জয়ের ব্যাপারে ‘একশো শতাংশ আশাবাদী’। ঝাড়ু ঘোষ বলেন, তৃণমূল আর বিজেপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এই ক’বছরে একের পর এক ঘটনায় সাধারণ মানুষ ওদের স্বরূপ চিনে গেছেন। এখন বামপন্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষ মুখিয়ে আছেন বলেও তিনি জানান।