কলকাতা: একদিকে ‘কান্দে শুধু মন কেন কান্দে রে…’ অন্যদিকে পাশে পরে থাকা পুরনো গিটার হারানো সুর খুঁজছে ‘সে কি ফিরবে না…’ সে ফিরবে কিনা জানা নেই তবে যতটুক মনে মনে করা যায় সালটা ছিল ১৯৯৯। কলেজের গণ্ডি পেরিয় তখন ঘরে-বাইরে জোয়ার তুলেছে ব্যান্ড মিউজিক। কিন্তু এখন কয়েনের দু’পিঠের মতো। আজ বাংলার নন ফিল্মি মিউজিকে খেলছে ভাটা। শ্রোতাদের দাবি, আগের মতো হিট গান ব্যান্ড দিতে পারছেন! নতুন ব্যান্ড সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে তাঁদের নিজেদের মধ্যে। কিন্তু কেন? নতুন পুরনোদের সঙ্গে কথায় কথায় উত্তর খোঁজার চেষ্টা করলেন মানসী সাহা….

surajit

Advertisement

সুরজিৎ ভূমি

প্রশ্ন: বাংলা ব্যান্ডের নতুন গানগুলো আগের মতো হিট হচ্ছে না। নতুনরা সে গান করছে সেটা একটা সার্কেলের মধ্যে জনপ্রিয়। বাংলার এক সময়ের গর্ব ব্যান্ড মিউজিক নিয়ে শ্রোতাদের যে দুশ্চিন্তা সেটা ঠিক?

সুরজিৎ: দেখো ভাল গান কিন্তু হচ্ছে। তবে তা গণ্ডিতে বাঁধা পড়ে যাচ্ছে! আমাদের সময় গান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া সুযোগ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেই মাধ্যমটারই তো বিরাট পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। ফলে আজকাল গান ঠিকমতো মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে না।

প্রশ্ন: সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। মানুষ কিন্তু এখনও গান শোনে…….

সুরজিৎ: হ্যাঁ..মানুষ এখনও গান শোনে। কিন্তু একটা কথা বলতো নন ফিল্ম মিউজিকের গান কতজন মানুষের কাছে পৌঁছায়। আমাদের সময় ক্যাসেট, সিডি হু হু করে বিক্রি হত। এখন তো মিডিয়াম বদলে গিয়েছে। গানের বাজার মার খাচ্ছে। ফলে অ্যালবাম তৈরি বন্ধ। এদিকে রেডিও স্টেশনে আগের মতো ‘নন ফিল্ম টপ মিউজিক’ শোনানও হয় না। যদিও জানি সবাই ব্যবসা করতে এসেছে। কিন্তু আধা ঘণ্টা কি নতুন প্রতিভাদের দেওয়া যায় না! বিপুল প্রচার করার মতো ব্যাক-বোন তাঁদের এখনও শক্ত হয়নি।

প্রশ্ন:  তোমার কি মনে হয় এটা কেন হচ্ছে?

সুরজিৎ: আমার কাছে তো প্রি-প্ল্যান মনে হয়। একটা সময় নন ফিল্ম মিউজিকের সঙ্গে ফিল্ম মিউজিক পারছিল না। পাড়ার ফাংশন থেকে বিদেশে বাংলার গর্ব ছিল নন ফিল্ম মিউজিক। সেটার প্রতিপত্তি কম করতেই ফিল্ম মিউজিক বড় প্রোডাকশন হাউসগুলোর চাল। তারা জানে, কয়েকটা এফএম চ্যানেলে টাকা দিয়ে দিলেই প্রোমোশন চলবে। যারা নন-ফিল্ম মিউজিক করছে, তাদের তো সেই ক্ষমতা নেই।

প্রশ্ন: ফিল্ম মিউজিকের জন্য ব্যান্ড বা একক শিল্পীরা মার খাচ্ছেন?

সুরজিৎ:  একদমই সেটা বলতে পারও…….। তবে সেই সঙ্গে এটাও বলব, গান তৈরি হচ্ছে, তবে নতুনদের আরও ওয়াইড কিছু ভাবতে হবে। তবে শুধু নতুনদের দোষ কেন দেব? আমারাও যদি ভাল গান লিখে, ভাল সুর দিতে পারতাম হলফ করে বলতে পারি এই বাজারেও সেই গান হিট হত….

সিধু ক্যাকটাস

sidhu

প্রশ্ন: একুশ শতকের ব্যান্ডের যে রমরমা ছিল। বলতে গেলে সময়টাকে ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ বলা হত। কিন্তু তারপর হঠাৎ এমন কেন হল?

সিধু: তারপর আর কি..ঠুনকো হেসে সাধারণ মানুষের থেকে ব্যান্ডগুলোর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। আগে যে সব রেডিও স্টেশনে আমাদের গান বাজানো হত, এখন সেখানে তো বাজানোই হয় না। আর সেটা বলতে পারও একরকম বাংলার প্রযোজকদের দৌলতেই। আসলে কারকাড়ে টাকা খরচা করে যে ফিল্মগান তাঁরা বানাচ্ছেন, সেগুলি হেরে যাবে নন ফিল্ম মিউজিকের কাছে! এটা তো হতে দেওয়া যায় না! টাকা দিয়ে টাইম কিনে চলেছে তারা! আমরা ভেসে যাচ্ছি জলে….।

প্রশ্ন: কিন্তু যাই বল আগের মতো হিট গান কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না। ক্যাকটাসের ক্ষেত্রেই ধর না, ‘হলুদ পাখি’, ‘বঁধু রে’, ‘বুদ্ধ হেসেছে’ শেষ! আর কোথায়?

সিধু: আমরা আগে গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতাম আর এখন ধরাচ্ছি? এমটা নয়! এখনও আমরা গান বাঁধি। কিন্তু তা আর মানুষের কাছে পৌঁছায় না। ভাবতে অবাক লাগে ২০১০ সালের পর ফিল্মি মিউজিক যেখানে ৯৯ শতাংশ প্রচার পাচ্ছে, নন ফিল্ম মিউজিক মাত্র ওয়ান পারর্সেন্ট! বুঝতেই পারছ অবস্থাটা। মানুষ শুনলে তো বুঝবে আমরা এখনও গানওয়ালা। ‘সংগীত বাংলা’ চ্যানেলটা দাঁড়িয়ে গেল বাংলা ব্যান্ডকে ধরে। আমাদের ‘পক্ষীরাজ’এর ভিডিও দিনে ১২বার করে দেখাত! সেই প্রচারটাও তো নেই এখন শুধু সারাদিন চলছে দেব আর জিৎ।

প্রশ্ন: তাহলে তুমি বলতে চাইছ ফিল্মি মিউজিক নষ্ট করে দিচ্ছে নন ব্যান্ড কালচার?

সিধু: দেখ ফিল্মি মিউজিক লোকে শুনছে, পছন্দও করছে। তবে ফিল্মি মিউজিক কিন্তু অনেকটাই ব্যান্ড ঘেঁষা। আধুনিক, কতটা ওয়েস্টার্ন, কতটা বাঙালি কম্বিনেশনে চলছে আজকের মিউজিক। তাই ব্যান্ড কালচার বাংলা থেকে নষ্ট হয়ে গিয়েছে এটা বলা যাবে না। শুধু একটু আলো দরকার!

প্রশ্ন: এই পরিস্থিতি থেকে বেড়ানোর কোনও হাল পেলে….

সিধু: নাহ… এখনও পায়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়া (ইউটিউব) এখনও খুব ভাল মাধ্যম নিজেদের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ায়। যদিও সেখানেও রিচ কেনা যায়! তবে নাই মামার থেকে কানা মামা অনেক ভালও। আমাদের ‘নাগরিক বোতাম’ বেশ রেসপন্স পেয়েছে। কিন্তু ভুল এটাই আমারা শুধু অডিও করেছিলাম। বুঝতে পারিনি এখনকার মানুষ অডিওর সঙ্গে কিছু দেখতেও পছন্দ করে। তাই এই ভুলটা দ্বিতীয়বার করছি না।

প্রশ্ন: কিন্তু এতো সবের পর ‘ক্যাকটাস’, ‘ফসলিস’, ‘ভূমি’, ‘চন্দ্রবিন্দু’-র পর তেমন কোনও ব্যান্ড হল না….

সিধু: না অনেক ব্যান্ড ভালও কাজ করেছে। ‘ঈশান’, ‘পৃথিবী’, ‘এলিয়েনজ’, ‘প্রাচীর’ বেশ ভাল কাজ করেছে। ‘ভারতবর্ষ’র কাজ আমার ভাল লাগে। কোনও একটা কারণে সেই ছাপটা কিছুতেই রাখতে পারছে না। সেটা রাখতে পারলে সিনিয়র ব্যান্ডদেরও খুব সুবিধা হতো। আর এরকম কড়া প্রশ্নেরও সম্মুখীন হতে হতো না! তাছাড়া ব্যান্ড-কালচার হিট হওয়ার পর পাড়ায় পাড়ায় ব্যান্ড তৈরি হয়েছে। অনেকে তাদের ইন্টেলেকচুয়াল এবং মিউজিক্যাল অক্ষমতা দিয়ে ব্যান্ড তকমাটা এঁটে স্টেজে পৌঁছে গিয়েছে এবং লোকজনকে বিরক্ত করেছে। সব মিলিয়ে একটা হচপচ কেস….

শুভঙ্কর রেভলিউশন

surajit

প্রশ্ন: ব্যান্ড একটা সময় সে চমক দিতে পেরেছিল. তা ফিকে হয়ে গেল! তোমাদের তো হাল ধরার কথা ছিল…..

শুভঙ্কর: দেখ সেই সময়টা আলাদা ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা গান করছি কিন্তু সেভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি না! প্রচার পাচ্ছি না। আমাদের গানই যদি মানুষ শুনতে না পায়, কি করে বুঝবে আমারা হিট দিতে পারি কি না?

প্রশ্ন: দেখ সিনিয়র ব্যান্ডদের প্রথমদিকে গান গাইতে দেওয়া হয়নি। মঞ্চ তারা নিজেরা লড়ে তৈরি করেছিল। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে মূলধারায় বাংলা ব্যান্ডকে এনে দেওয়ার পর নতুন প্রজন্ম কি সেটা ধরে রাখতে পারল না?

শুভঙ্কর: আমরা যখন শুরু করেছিলাম, কিছুই কিন্তু বদলে গিয়েছে। এখন যাঁরা গান করছেন, তাঁদের পক্ষে মানুষের কাছে পৌঁছনোটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তুমি যে সময়ের কথা বলছ তখনকার পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। এখন কোনও নবাগতকে কেউ ব্রেক দিতে চায় না! আমি নিজে ব্যান্ডের গান শুনতাম রেডিওতে। এখন কোথায় সেই সময়। স্টেজ দিলে তো ধরে রাখব! তাছাড়া আরও একটা সমস্যা আছে! আজকাল কিছু না জেনে, না শিখে অনেকেই ব্যান্ড তৈরি করছেন। যার ফলে এমন কথা শুনতে হচ্ছে। কিছু করার নেই!

প্রশ্ন: তোমরা তো শো করছ। আচ্ছা লোকে কোন গানগুলো শুনতে চায়? নতুন কোনও গান, নাকি পুরনো সেই রক গান?

শুভঙ্কর: রেভলিউশন নিজের ছাড়াও ফিল্ম-নন ফিল্ম সব গানই স্টেজে পারফর্ম করে। তবে বেশি পুরনো গানেরই অনুরোধ আসে। ওই যে বললাম, মানুষ জানলে তো শুনতে চাইবে। দুটো পুরনো গানের মাঝে আমাদের নিজেদের একটি গান! এই ভাবেই মানুষের কাছে পৌঁছানোর একটা চেষ্টা করছি।

উপল চন্দ্রবিন্দু

upal

প্রশ্ন: বাংলা ব্যান্ডের স্বর্ণযুগ কি হারিয়ে গেল?

উপল: খুব কঠিন প্রশ্ন। আমার ব্যক্তিগত মত, ২০০০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত সত্যি আমরা যে সময়টা দেখেছি, ২০১৫’তে সেটা দেখছি না। তবে পুরনো জিনিস নিয়ে মানুষের কতদিন উন্মাদনা থাকবে? তাছাড়া নতুনরা তেমন চমক তৈরি করতেও পারছে না। যদিও তারা তেমন প্রচার পাচ্ছে না! কিন্তু ভাল গানের কদর সব সময়। গান যে হিট হচ্ছে না, তা তো নয়। অনুপম রায় দিনের পর দিন হিট দিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়েও হয়তো কিছু একটা দিতে পারছে না ওরা।

প্রশ্ন: তাহলে তুমি বলছ নতুনদের মধ্যে একটা ইনোসেন্সের অভাব রয়েছে?

উপল: সেটা বলতে পারব না। গান যে নতুনরা একদম পারে না তেমন তো নয়। অনেকে ভালও গান করে। কিন্তু ঠিকঠাক প্রমোশনের অভাবে আড়ালে থেকে যাচ্ছে না। আজ ফিল্ম মিউজিক যেমন প্রচার পাচ্ছে, নন ফিল্ম সেখানে নগন্য।

প্রশ্ন: এটা কেন হচ্ছে বলে তোমার মনে হয়?

উপল: আমার মনে হয় এটা পুরোটাই পলিটিক্স। এখন কি আমরা গান করি না? কিন্তু সেই গান মানুষের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমের নেই। রেডিও স্টেশনে আগের মতো নন ফিল্মি গান বাজে না। ফিল্মে গান করলে সেটা হিট ব্যান্ডের গান করলে সেটা হিট নয় তেমন তো নয়

----
--