বিশ্বের একমাত্র মানুষ যাঁর রক্তের গ্রুপ EB+

মানব গুহ, কলকাতা: সোস্যাল মিডিয়া আজ তাঁর ছবিতেই ভর্তি৷ অনেকেই তাঁর ছবি দিয়ে শোকপালন করছেন, তাঁদের ভালোবাসার মানুষটির কথা জানাচ্ছেন৷ তাঁরা জানেনই না, আই লিগ জিততে না পারলে আর কোনদিন ছবি তুলবো না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন সবার প্রিয় মাঠপাগল মানুষটি৷ ক্লাব আই লিগ জেতে নি ১৪ বছর৷ সুস্থ থেকে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষটির নতুন ছবিও দেখা হয়ে ওঠে নি সমর্থকদের৷ আর হলও না৷ পুরনো স্মৃতি আর তাঁর শেষ যাত্রার ছবিই সম্বল আপামর ফুটবলপ্রেমী মানুষের৷ জীবনের মাঠ থেকেই যে বিদায় নিলেন লাল হলুদের স্বপন বল৷

স্বপন বল৷ ছোট থেকে বড়, সবার প্রিয় স্বপনদা৷ মাঠে ঘাসের রঙ সবুজ বলে তিনি খালি পায়ে নাকি কোনদিন মাঠে নামেন নি৷ লাল হলুদ ছাড়া পৃথিবীতে আর কোন রঙ এর অস্তিত্ব আছে বলে তিনি মনেই করতেন না৷ তবু সেই অন্ধ লাল হলুদ প্রেমির জন্য আজ কাঁদছে গোটা বাংলার ফুটবল সমাজ৷ সবুজ মেরূণ থেকে সাদা কালো……সব রঙের মানুষই আজ একবাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছেন বাংলার ফুটবলের অনেকটাই ক্ষতি হয়ে গেল৷

শুক্রবার বর্ষার সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফুটবলপ্রেমী মানুষরা সেই চরম দু:সংবাদটি পেলেন৷ স্বপন বল আর নেই৷ বৃহষ্পতিবার গভীর রাতেই ফুটবলের মায়া কাটিয়ে তিনি চলে গেছেন অন্যলোকে৷ লাল হলুদের সেই মাঠপাগল মানুষটি আর মাঠে আসবেন না কোনদিন৷ চিরকাল ‘ইস্টবেঙ্গলের লোক’টিকে শ্রদ্ধা করতেন অন্য সব দলের সমর্থক ও কর্মকর্তারা৷ কারণ তাঁরাও জানতেন, এই মানুষটি ফুটবল, মাঠ ও ইস্টবেঙ্গল ছাড়া কিছুই বুঝতেন না৷ আর তাঁরা এও জানতেন, তাঁদের ক্লাবে কোন স্বপন বল নেই৷

নয় নয় করে দীর্ঘ ৪৭ টা বছর ইস্টবেঙ্গলের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন৷ লাল হলুদে অর্ধশতবর্ষের ঠিক ৩ বছর আগেই তিনি চিরতরে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷ পল্টু দাসের হাত ধরেই ইস্টবেঙ্গলে প্রবেশ৷ তারপর কিছুদিন ক্রিকেট ম্যানেজার ছিলেন স্বপন বল৷ সেখান থেকে ফুটবল ম্যানেজার৷ অত্যন্ত সফল ও পয়া ম্যানেজার ছিলেন এই ফুটবল পাগল মানুষটি৷ বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদিন কোন ক্লাবের ফুটবল ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করার দিক দিয়ে দেখতে গেলে স্বপন বলের নামটা উপরের সারিতেই থাকবে৷

শুধু ম্যানেজার নয়, ফুটবলার রিক্রুটার হিসাবে তাঁর অবদান বাংলার ফুটবল ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে৷ কি না করেছেন, ইস্টবেঙ্গলের ঘরে ভালো ফুটবলার তুলে আনতে৷ ১৯৯২ সালে যেভাবে রাতের অন্ধকারে মহমেডানের ভয়ংকর ডেরা থেকে চিবুজার ও ক্রিস্টোফারকে তুলে ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে এনেছিলেন, তা ২৫ বছর পর আজও বয়স্ক ফুটবলপ্রেমিদের চায়ের আড্ডায় লোম খাড়া করে দেয়৷

উনিশশো সত্তর, আশি, নব্বই…… তিন দশকের লাল হলুদের ইতিহাস সবসময় তাঁর ঠোঁটের ডগায় থাকত৷ ঠিক যেন লাল হলুদের চলমান এনস্লাইকোপিডিয়া৷ সমর্থক, কর্মকর্তারা তো বটেই, ইস্টবেঙ্গল নিয়ে তাঁর জ্ঞান, পান্ডিত্য প্রায়ই অবাক করে দিত বিদগ্ধ সাংবাদিকদেরও৷ স্বপনদাই ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের গুগল সার্চ ইন্জিন৷ প্রায় পঞ্চাশটা বছর সামনে থেকে এই ইন্জিনটাই চালিয়ে নিয়ে গেছে লাল হলুদের জয় যাত্রাকে৷

ছাত্র হিসাবেও ভালো ছিলেন৷ ক্যাথিড্রাল মিশন, বীরভূম রামকৃষ্ণ শিক্ষাপীঠ, সেন্ট পলস কলেজ হয়ে ক্যালকাটা ইন্জিনীয়ারিং কলেজ৷ ইন্জিনীয়ারিং পাশ করার পাশাপাশি ফুটবলটাও চুটিয়ে খেলতেন৷ এখন যাঁরা ফুটবলে কোনদিন পা না দিয়েও কর্মকর্তা হয়ে যান, তাদের উদ্দেশ্যে কোথাও যেন একটা বার্তা রেখে গেলেন স্বপন বল৷ ১৯৬৮ থেকে ৭০, তিন বছর লাল হলুদে জুনিয়ার দলের গোলকিপার ছিলেন৷ ১৯৭০ এই ক্লাবের সদস্যপদ৷ ব্যাস, গুরু পল্টুদার হাত ধরে জীবনের বাকি সব কিছু ছেড়ে নিজেকে ইস্টবেঙ্গলে উৎসর্গ করলেন এই রাগী ফুটবল পাগল মানুষটি৷

তারপর থেকে লালহলুদেই জীবন, ক্লাব টেন্টেই সংসার৷ নিজের সংসার স্ত্রীর হাতে ছেড়ে দিয়ে স্বপন বল তখন থেকেই ইস্টবেঙ্গলের সৈনিক৷  নামেই যাঁর বল, তাঁর স্থান তো ফুটবল মাঠেই হবে৷ লাল হলুদের সেই দাপুটে সেনাপতির লড়াই থামলো বৃহষ্পতিবার মাঝরাতে৷

সব মিলিয়ে ১৫০ র বেশি টুর্নামেন্টে ম্যানেজার৷ চ্যাম্পিয়ান ১৩৩ টিতে৷ ক্লাবের হয়ে ফুটবলার খুঁজতে ঘুরেছেন বিশ্বের অনেক দেশ৷ বাড়িতে বসে নেট ঘেঁটে ফুটবলার বেছে তারপর কমিশন খাওয়া, কি জিনিস তা স্বপন বল কোনদিন জানতেনও না৷ দল খারাপ খেললে বা হারতে থাকলে হাফটাইমে চীৎকার করে ফুটবলারদের মোটিভেট করেছেন বহূবার৷ পি কে ব্যানার্জীর ভোকাল টনিকের কথা সবাই জানে৷ কিন্তু স্বপনদার ভোকাল টনিকে কতবার যে হাফটাইমের পর গ্যালারিতে লাল হলুদ মশাল জ্বলে উঠেছে, তা জানেন একমাত্র প্রাক্তন ফুটবলাররাই৷

গুরু পল্টুদার মৃত্যুর পর ছেলের মত তেরদিন অশৌচ পালন করেছিলেন স্বপন বল৷ এই একবারই তাঁকে ভেঙে পড়তে দেখেছিল ক্লাব তাঁবু৷ ব্রাজিলিয়ান কোচ কার্লোস পাহিরা বলেছিলেন, ‘Swapan Bal is the best maneger after God’, ‘ভগবানের পর সেরা ম্যানেজার হলেন স্বপন বল’৷ এর চেয়ে বড় সম্মান আর কি হতে পারে৷ বলা হয়, স্বপনদার রক্তের গ্রুপ EB+৷ অর্থাৎ ইস্টবেঙ্গল পজিটিভ৷ তাঁর আমলে ক্লাবে নেগেটিভ কোন কিছুর অস্তিত্বই যে ছিল না৷

শেষ যাত্রায় আজ লাল হলুদের মাঠপাগল মানুষটি৷ শুধু একটাই আক্ষেপ নিয়ে জীবনের মাঠ ছাড়লেন যে, একটা নতুন ছবি তোলা সম্ভব হল না৷ ১৪ বছর পরও যে আই লিগ অধরা ক্লাবের৷ হয়ত ভবিষ্যতে নিজের আসনে আবার ফিরে এসে কোন স্বপন বলই এনে দেবেন সেই অধরা আই লিগকে৷

স্বপনদা, তাড়াতাড়ি ফিরে আসুন৷ বেশিদিন অবসর জীবন কাটাবেন না৷ সবুজ মাঠে লাল হলুদ রঙে আপনাকে খুব- খুব দরকার৷ ক্লাবের ম্যাসকট ক্লাবেই শোভা পায়, আর আপনিই তো ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ম্যাসকট৷ প্রায় শেষ হতে চলা বাংলার ফুটবলকে বাঁচিয়ে তুলতে আপনার মত মাঠপাগল মানুষকেই আবার মাঠে চাই………৷

Advertisement
---
-----