‘বনমালি তুমি এজনমেই আমার রাধা’

মানসী সাহা: ভালবাসা ভালবাসে শুধুই তাঁকে ভালবেসে ভালবাসায় বেঁধে যে রাখে। এই ‘ভালবাসা’ কি শুধু শরীরের? একটি পুরুষ আর একটি নারী দেহের সম্পর্কের নাম কী ‘ভালবাসা’? আমার যে বলি ভালবাসার জন্ম দেয় মন। তাইতো আদর করে ভালবাসার মানুষটি বলা হয় ‘মনের মানুষ’। তাই যদি হয়, তবে ওঁদের ‘ভালবাসা’য় কেন সমাজের এতো আপত্তি? কেন ওঁদের ‘ভালবাসা’ জন্ম নেয় সমাজে নতুন নাম ‘লেসবিয়ান’। তবে কবির কথায়, ‘গোলাপকে যে নামেই ডাক না কেন, সে গোলাপই থাকে’। তাই ভালবাসা একটি মেয়ের হোক কিংবা একটি লেসবিয়ানের আদতে তা ভালবাসাই থেকে যায়। তাইতো আজ তাঁদের ভালবাসায় মেলেছে স্বীকৃতির ডানা। এমন আনন্দের দিনে এই লেসবিয়ান প্রেম গলিতে একটু ঘোরাঘুরি হোক।

‘বনমালি তুমি পর জনমে হইও রাধা……’

‘হোক কলোরব, ফুল গুল সব সব লাল না হয়ে নীল হল কেন’? মনে-প্রাণে-আত্মায় প্রতিনিয়ত একটু একটু সে বেড়ে উঠছে পুরুষ সত্ত্বায়। কিন্তু শরীরে-দেহে সে এক নারী। নিজেকে লুকিয়ে প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে তাঁর লড়াই। কিন্তু একদিন কলের তলে ভিষন জলে খালটি হয় ঝিল। সেই ঝিলের ‘আয়না জলে’ জন্ম নেয় চিত্রাংঙ্গদারা। একটি মেয়ে প্রেমে পড়বে একটি ছেলের অলিখিত এক অনিবার্য নিয়ম। অন্যথা হলেই বিপদ। তাইতো স্পাইক করা চুল, হাফ হাতা টি-শার্টে উঁকি মারা বলিষ্ঠ বাইসেপে কলেজ হার্টথ্রব আকাশ দা-কে নয়,

- Advertisement -

আরও পড়ুন: নারী নয়, আমার জীবনের প্রথম প্রেম পুরুষ: বিস্ফোরক সুমন

খোলা চুল, চুড়িদার, কাজল চোখে পৌলমী দি-র প্রতি বেশি আকর্ষণ অনুভব করলেও কোনও দিন সেকথা বলতে পারেনি সোলানি। কৃষ্ণ বিরহে কাতর রাধার মতো বিরহ জ্বালা এখানেও। তবে শুধু কি বিরহ! থেকে যাওয়া না বলা কথা, অসমাপ্ত ভালবাসা, নিজের সত্ত্বাকে হারিয়ে ফেলে জীবন গলিত নিজেকে খুঁজে ফেরা সব মিলিয়ে মনের গহ্বরে ঢুকরে সে কেঁদে ওঠে….. আর চুপি চুপি বলে ওঠে ‘বনমালি তুমি পর জনমে হইয়ও রাধা…….’

ছবি: ইনস্টাগ্রামের সৌজন্যে

পুরনো কাসুন্দি নিয়ে ঘাটাঘাটি:

লোকে বলে আজকের প্রজন্মের ভিমরতি হয়েছে। মেয়েতে-মেয়েতে আবার কিসের ভালবাসা হে…। যত সব অপসংষ্কৃতি। কিন্তু মাননীয় গুরুজনেরা আপনাদের একটু ভুল হচ্ছে। সময়ের উল্টে দিকে তাকালে আপনারা দেখতে পাবেন সমলিঙ্গের প্রতি ভালবাসা আমাদের রক্তে রয়েছে। ইতিহাস বলছে যীশু খ্রীষ্ঠের জন্মের আগে থেকে এ ধরনীতে বিদ্যমান সমকামীতা। বিভিন্ন লিপি ও চিত্রপটে মিলছে তার প্রমাণও। পার্থক্য একটাই আগে নিজের সত্ত্বাকে লুকিয়ে নিজেদের তাঁরা সপে দিয়েছে বিষম-লিঙ্গের ভোগে-বিলাসে। কিন্তু আজ অনেকেই মুক্ত কন্ঠ। নিজেদের চাওয়া-পাওয়াটা ছিনিয়ে নিতে শিখেছে। তাই এ প্রজন্মের মাথার বিকৃতি নয়। আসলে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্তিটি বুঝে নিতে শিখেছে। তাই দয়া করে এই জেনেরেশনকে দায়ী করবেন না প্লিজজজজজ……। আফটার অল ‘জিন’ কথা বলে।

এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া….

‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোনও দাবিদাবি…’ লেসবিয়ান প্রেমের দাবি সত্যি ‘শুধু তোমাকে চাওয়া’। তাইতো নিজের অতীত-ভবিষ্যৎ সব ভুলে একসঙ্গে পথ চলা শুরু হয় দুটি নারী শরীরের। নিজের পরিবারকে ফিরে পাওয়া প্রত্যাশা তাঁদের থাকেনা, না থাকে নিজেদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার দাবি। যা থাকে তা হল শুধু ভালবাসা। এই প্রেম জানে না কতটা পথ পেরলে পাবে মথুরা। শ্যামের বাঁশিতে কবে খুলবে মানুষের বন্ধ মনের দরজা। হাজার বছর পেড়িয়েও সমকামী ভালবাসার ফ্রেমটা যে একই রকম রয়েগিয়েছিল। মানুষের ঘৃণা, তাচ্ছিল, হাসি আর বিকৃতকামের তকমার চার ফেম্রে বন্দি।

তবে ‘প্রেম’ কোনদিন আর চোখ রাঙানি ভয় করেছে। তাই আজ ‘হোক কলোরব’ তাঁদের ভালবাসাও কম নয় কারও থেকে। ময়দান থেকে ভিক্টোরিয়া, বনবিতান কিংবা সিসিডি সাক্ষী থাকুর তাঁদের ভালবাসার। আজ থেকে যে বাতিল সমস্ত দন্ডবিধান।

ছবি: ইনস্টাগ্রামের সৌজন্যে

সে যে বসে আছে একা একা রঙিন স্বপ্ন তাঁর চোখেতে:

মস্ত বড় অন্ধকারে স্বপ্ন দেখে দুটি চোখ। রহস্য নীল রাতের আলোয় খুঁজে ফেরে তাঁর ‘প্রিয়া’কে। কে জানে, “ রাধা ভালবাসে কি না রাধাচূড়াকে’’। পীড়িত ভ্রমরায় দংশন করে প্রিয়াকে। এ যেন সমুদ্রমন্থনে অমৃতের সন্ধান। কিন্তু একদিন তাঁর গুন গুন মনের গান বাতাসে ভেসে ধরা দেয় মেঘ। তখনই হয় প্রেম প্রেমবৃষ্টি। শুরু হয় এক প্রেম-কাহিনির। শুরু হয় এক লড়াইয়ের। যে যুদ্ধের হাতিয়ার ভালবাসা আর সেনাপতি মনের মানুষটি।

ছবি: ট্যুইটারের সৌজন্যে

নারী-পুরুষের ভালবাসায় যখন জন্ম নেয় নতুন এক জীবন। তখন দুই নারীর ভালবাসায় জন্ম হয় নতুন এক ‘আমির’। সঙ্গীর পছন্দনে কেউ কেটে ফেলে তাঁর সখের লম্বা চুল, কেউ বা সাধের শাড়িটি শরীরে আর জড়ায় না। প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কেউ কেউ আবার বদলে ফেলে নিজের শরীর। চাহিদা থাকে শুধু একটু সঙ্গীর মুখের হাসি, আর ভালবাসা। তাই ‘প্রেম’ এই গলিও সহজ নহে।

শুভেচ্ছায় ভরা আজ ওঁদের আকাশ:

‘এবার স্বাধীন দেশে স্বাধীন আমরা। অবশেষে আমরা বিচার পেলাম’। বাতিল হল ভারতীয় দন্ডবিধি ৩৭৭। আজ থেকে সমকামীতা আর অপরাধ নয়! জয় হয়েছে তাঁদের ভালবাসার। শুভেচ্ছা বার্তায় ভরছে ট্যুইটার সাইট। সেলিব্রিটি থেকে আমজনতা সোশ্যাল মিডিয়ায় ওড়াচ্ছে ‘রেনবো’ পতাকা। কারও বা আবার আজ ডিপি এই পতাকা।ইতিমধ্যে আলিয়া ভাট থেকে টুইঙ্কেল খান্না, করণ জোহর থেকে থেকে সৃজিত মুখোপাধ্যায়, বরুন ধাওয়ান ভারতীয় আইনের এই বদলে উচ্ছ্বসিত। সবার মুখে একটাই কথা, “ভারতীয় বিচারে আজ একটি ঐতিহাসিক দিন’।

Advertisement
---