বিপ্লবীরা যেন ‘জঙ্গি’, বিস্মৃত আলিপুর বোমা হামলার ঐতিহাসিক বোমা কারখানা

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘৩২ মুরারি পুকুররোড বাড়িটা কোনটা বলতে পারেন?’ উত্তর পাওয়া গেল না। ‘আচ্ছা আলিপুর বোমা মামলায় যেখান থেকে ঋষি অরবিন্দ, বারীন ঘোষষহ ১৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল সেই বাড়িটায় যেতে চাই। কেউ বলতে পারেন?”। অবাক দৃষ্টি আর মুখ চাওয়া চাওয়ি করা ছাড়া আর কিছু উত্তর মেলেনি। স্থানীয়রা কেউ জানেন না স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই লড়াইয়ের গোপন স্থল ঠিক কোথায়? মনে নেই সংগ্রামীদের কথাও।

মুরারিপুকুর এলাকায় যেদিকেই চাইবেন সেদিকেই বিপ্লবী বারীন ঘোষের নামাঙ্কিত করা রয়েছে। কোথাও সরকার থেকে বানানো হয়েছে সরনী, কোথাওবা রয়েছে স্থানীয় ক্লাব। রয়েছে ‘বোমার মাঠ’। আলিপুর বোমা মামলার মূল ‘আসামী’ ঋষি অরবিন্দ ঘোষ। মুরারিপুকুরে প্রবেশ করার আগে রয়েছে তাঁর নামাঙ্কিত সেতু। রয়েছে তাঁর আবক্ষ মূর্তি। যাদের থেকে থেকে ঘটনার মূল সূত্রপাত সেই বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকির নামেও রয়েছে রাস্তার নাম। কিন্তু সেই বাগান বাড়ি কোথায়? কোথায়বা ছিল সেই বোমা কারখানা? কেউ জানেন না।

- Advertisement -

এমনই অবস্থা স্বাধীনতা সংগ্রামী ঋষি অরবিন্দ ঘোষ, বারিন ঘোষ, উল্লাসকর দত্তদের। সরণী রয়েছে কিন্তু এঁদের প্রায় স্মরনেই রাখেনি কেউ। ঠিকানা না পাওয়ায় গুগল সার্চ করে জানা যায় সেই বাড়িকে অনেকে বাগান বাড়ি বলে জানতেন। পথ চলতি স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করা হল ‘এখানে বাগান বাড়ি কোনটা যেখান থেকে আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছিল?’ এবারও ঘটনা সেই একই। জানা গেল বাগান বাড়ি সেখানে দুটি রয়েছে। এবার কোন বাড়িতে বোমা বানানো হত সেটা কারোর জানা নেই।

এক মহিলা আবার বললেন, “ওসব বোমা টোমা এখানে বানানো হত বলে জানি না। ওসব জমিদারদের বাড়ি।” উত্তরটা হজম করা শক্ত। যেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই লড়তে যাওয়া বিপ্লবীরা যেন বোমা বানিয়ে ‘জঙ্গি’র খাতায় নাম লিখিয়েছেন। এক ব্যক্তি আবার সবে দুপুরের ঘুম দিয়ে সবেমাত্র উঠেছিলেন। আলিপুর নামটা শুনেই বললেন , “আলিপুর!সে এখানে কোথায়? এটা তো মুরারিপুকুর।”

এভাবে টানা ঘণ্টা খানেক এগলি থেকে ওগলি। খোঁজ মেলে না ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক ‘অধ্যায়ের’। ক্লান্ত এবং কিছুটা হতাশ হয়ে যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে পড়েছি ঠিক তখনই জানা গেল আসল ‘গল্প’। স্থানীয় এক বয়স্কর থেকে জানা গেল জানা গেল সেই বাড়ির আজ কোনও অস্তিত্বই নেই। ২০০৮ সালে সেই বাড়ি ভেঙে অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে গিয়েছে। সামনে রয়েছে একটি স্মৃতি ফলক মাত্র। সত্যি দেখা মিলল সেই স্মৃতি ফলকের। যেখানে লেখা পুঙ্খানুপঙ্খভাবে লেখা রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। আর ৩২ মুরারীপুকুর রোডের ঠিকানা এখন মস্ত বড় ফ্ল্যাট।

৩০ এপ্রিল ১৯০৮-এ মুজফফরপুর, বিহারে রাত সাড়ে আটটায় ইওরোপিয়ান ক্লাবের সামনে বোমা ছুড়ে তিনজনকে হত্যা করেন ক্ষুদিরাম বসু। ৩০ এপ্রিল, মুজাফফরপুর বোমা হামলার ঘটনার পরে ২মে ৩২ নং মুরারিপুকুরের বাগানবাড়ি তল্লাশি করে পুলিশ বোমার কারখানা আবিষ্কার করে। পরে মামলা শুরু হয় ২১ মে ১৯০৮ তারিখে। ১৯০৯ সালের ৬ মে আলিপুর বোমা মামলার রায় দেওয়া হয়। রায়ে বিচারক বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ও উল্লাসকর দত্তকে মৃত্যুদণ্ড দেন। উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র কানুনগো, বিভূতিভূষণ সরকার, বীরেন্দ্র সেন, সুধীর ঘোষ, ইন্দ্রনাথ নন্দী, অবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য, শৈলেন্দ্রনাথ বসু, হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল, ইন্দুভূষণ রায়ের, দ্বীপান্তর দণ্ড হয়। পরেশ মৌলিক, শিশির ঘোষ, নিরাপদ রায়ের দশ বছর দ্বীপান্তর দণ্ড, অশোক নন্দী, বালকৃষ্ণ হরিকোণে, শিশির কুমার সেনের সাত বছর দ্বীপান্তর দণ্ড এবং জীবনকৃষ্ণ সান্যালের এক বছর কারাদণ্ড হয়। আপিলে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও উল্লাসকর দত্তের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হয়। তাঁদের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ড হয়। অরবিন্দ ঘোষ মুক্তি পান এবং অনেকের সাজা হ্রাস করা হয়। সময়ের সঙ্গে এভাবেই দ্বীপান্তরে গিয়ে বিস্মৃতি হয়ে গিয়েছে বিপ্লবীদের লড়াইও।

Advertisement ---
-----