ধর্ষণের অভিযোগে জেরবার শান্তির নন্দীগ্রাম যেন ‘মরুদ্যান’

সুমন বটব্যাল, কলকাতা: ১১ বছর আগের ঘটনা৷ ধানের জমি থুড়ি ভাতঘর বাঁচাতে আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন গ্রাম্যবধূরা৷ শুধু স্বামীদের হাতেই নয়৷ লাঠি, কাস্তে তুলে নিয়েছিলেন তাঁরা নিজেদের হাতেও৷ ২০০৭-এর ১৪ মার্চ খেজুরির দিক থেকে পুলিস-ক্যাডার যখন গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে নন্দীগ্রামের প্রতিরোধ ভাঙতে এগিয়ে আসছিল তখনও মানব পাঁচিলের সামনে ছিলেন সেই মহিলারাই৷

সরকারের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল দুই মহিলা সহ তরতাজা ১৪টি প্রাণ৷ নন্দীগ্রামের প্রমীলাবাহিনীর আন্দোলনের সেই কাহিনি মনে করিয়ে দিয়েছিল তেভাগা আন্দোলনের কথা৷ ফলস্বরূপ, ক্ষমতায় আসার পর শহিদের মা ফিরোজা বিবিকে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদে দাঁড় করিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

‘পালাবদলে’র বাংলায় এ হেন জমি আন্দোলনের পীঠস্থানেই ধর্ষিতা হচ্ছেন মহিলারা৷ বিভিন্নভাবে হেনস্থারও শিকার হচ্ছেন৷ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগের তির খোদ শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধেই৷ স্বভাবতই রাজনৈতিক মহল প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, যাঁদের হাত ধরে নন্দীগ্রামের জমি রক্ষা হল, বামেদের বিদায় ঘণ্টা বাজল, সেই মহিলাদের প্রতি এটাই কি রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের প্রতিদান?

- Advertisement -

এ বার আসা যাক সাম্প্রতিক দু’টি নির্মম অত্যাচারের কাহিনিতে
ঘটনা এক: গত বছরের পয়লা নভেম্বর৷ নন্দীগ্রাম এক নম্বর ব্লকের আমদাবাদ পঞ্চায়েতের সুবদি গ্রাম৷ স্থানীয় বাসিন্দা পরশুরাম মান্নার স্ত্রী ইন্দিরা আবাস যোজনায় চল্লিশ হাজার টাকা পেয়েছিলেন৷ অভিযোগ, কাটমানি বাবদ ১০ হাজার টাকা দাবি করেন তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় বুথ কমিটির সভাপতি অসিত হাজরা৷ কাটমানি না দেওয়ায় ওই বধূকে স্থানীয় ক্লাবে তুলে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ৷ এমনকি থানায় জানালে ফল ভালো হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়৷

নির্যাতিতা ওই বধূ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন৷ মেডিকেল টেষ্টে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিতও হয়৷ সেই সময় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযুক্তকে আড়াল করার অভিযোগও ওঠে৷ পরে পরিস্থিতির চাপে অভিযুক্ত তৃণমূল কংগ্রেস নেতা অসিত হাজরাকে গ্রেফতার করে পুলিশ৷

এর পরই শুরু ‘বদলার’ রাজনীতি৷ স্থানীয় সূত্রে খবর, খেজুরি দুই নম্বর ব্লকের কুলঠা গ্রামের ইটভাটা মালিক পরিমল দাসের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা পেতেন পরশুরাম৷ বকেয়া টাকা দেওয়ার টোপ দিয়ে তাঁকে ডেকে পাঠানো হয়।

তিনি নির্মল শীট নামে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে কুলঠায় যান। সেখানে আগে থেকেই তৈরি ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা, কর্মীরা। এলাকায় পৌঁছতেই দু’ জনকে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হয় মিয়ামোড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় পার্টি অফিসে৷ অভিযোগ, নেতার বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করার অপরাধে তাঁদের দু’জনকে প্রকাশ্যেই খুঁটিতে বেঁধে চলতে থাকে বেধড়ক মারধর৷ হাত বেঁধে খুঁটিতে বেঁধে অকথ্য মারধরের সেই ছবি ভাইরাল হয়েছে৷ রাজ্যর মানুষ শিউরে উঠেছেন সেই মধ্যযুগীয় বর্বরতার ছবি দেখে৷

ঘটনা দুই: গত বছরের ১৫ নভেম্বর৷ নন্দীগ্রামে নাকচরাচর গ্রাম৷ সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে বাজারে গিয়েছিলেন মহিলার স্বামী। বাড়িতে একাই ছিলেন ২৬ বছরের ওই গৃহবধূ। সেই সময় বাড়িতে ঢুকে তাঁর হাত-পা বেঁধে গণধর্ষণ করেন ছয় ব্যক্তি। সে দিন রাতে বাড়িতে ফেরার পর নির্যাতিতাকে ঘরের মধ্যে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁর স্বামী। অভিযোগের ভিত্তিতে দুই জনকে গ্রেফতারও করে পুলিশ৷ এ ক্ষেত্রেও অভিযোগের তির তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে৷

উপরের ঘটনা দু’টি নমুনা মাত্র৷ স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ‘পালাবদলে’র বাংলায় এমন একাধিক নারী নির্যাতনের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে নন্দীগ্রাম৷ অনেক ক্ষেত্রেই বিচার মেলেনি৷ আবার অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে চুপ করে গিয়েছেন৷ কখনও বা স্রেফ সালিশির মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা হয়েছে৷ স্বভাবতই, বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে৷ নির্যাতিতাদের কথায়, তাঁরাই আন্দোলন করলেন৷ আর, আজ তাঁরাই অত্যাচারিত হচ্ছেন৷ এ কেমন বদল? সরাসরি এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা৷ তবে তাঁদের দাবি, দু’একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া নন্দীগ্রাম শান্তই রয়েছে!

Advertisement ---
---
-----