দেহ না! শুধু হাত কেন মমি হয়ে যাচ্ছে জানেন?

হাঙ্গেরি: হাড় কঙ্কাল ভর্তি একটি বাক্স পাওয়া যায়৷ সেই বাক্সে ছিল এক শিশুর দেহের কঙ্কাল৷ কিন্তু বাক্স খুলতেই দেখা যায় শিশুর হাতের অংশ মমিতে পরিণত হয়েছে৷ বাকি বেশ কিছু হাড়ের রঙ সবুজ৷ কিছু কিছু হাড় অবশ্য সাধারণ রঙেরই৷ কিন্তু এমনটা কী করে হল?

২০০৫ এ দক্ষিণ হাঙ্গেরিতে ন্যারলোরিঙ্ক নামের একটি গ্রামের সমাধিস্থল খনন হয়৷ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের হাতে আসে একটি বাক্স৷ তাতে ভর্তি ছিল হাড় গোড়৷ প্রায় ৫০০ টি সমাধি মেলে সেখান থেকে৷ সেখানেই পাওয়া যায় ওই শিশুর সমাধি৷ মনে করা হচ্ছে মৃত শিশুর সমাধি সহ বাকি সমাধিগুলি ১২ থেকে ১৬ সেঞ্চুরির৷ কিন্তু বাক্স খুলতেই এমন দৃশ্য দেখবেন ভাবেননি কেউই৷ বাক্সের মধ্যে ছিল মমি হয়ে যাওয়া একটি সবুজ হাত৷ এতদিন সেই রহস্যের সমাধান করা সম্ভব হয়নি৷ কিন্তু সম্প্রতি ডঃ বেলেজ ও তাঁর সহকর্মী জোল্টান বল্কি সেই রহস্যের সমাধান করলেন৷

রহস্যের উন্মোচন হতেই বেরিয়ে এল মমি করার আর এক পদ্ধতিও৷ যা কেউ কখনও ভাবেননি৷ গত মাসে তাঁরা তাঁদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন আর্কিওলজিক্যাল অ্যান্ড অ্যানথ্রপোলজিকাল সায়েন্সের জার্নালে৷

- Advertisement -

হাড় বিশেষজ্ঞ ডঃ বেলেজ প্রথমে ভেবেছিলেন হাড়গুলি কোনও ছোট ইঁদুরের৷ কিন্তু কোমরের হাড় পায়ের হাড় এবং হাতের উপরের অংশের হাড় পান তিনি৷ তবে এগুলি সবই সবুজ রঙের৷ কিন্তু ডান হাতের বেশ কিছুটা অংশ তিনি দেখেন শুকিয়ে যাওয়া মাংস সমেত রয়েছে৷ যা এক কথায় বলতে গেলে মমি হয়ে রয়েছে৷ তবে কাঁধের হাড় সহ বেশ কিছু হাড়ের রঙ পাল্টায়নি৷ হাড় সমেত হাতের মমি এখন রাখা রয়েছে হাঙ্গেরির মোরা ফেরেন্স মিউজিয়ামে৷

 

পরীক্ষা করার সময় ডঃ বেলেজ বুঝতে পারেন এটি কোনও সদ্যজাত কিমবা অপরিণত শিশুর মৃত শরীরের হাড়৷ হতে পারে জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হয়েছিল তার৷ শিশুটির দৈর্ঘ্য ছিল ১১ থেকে ১৩ ইঞ্চি৷ ও ওজন মাত্র দুই পাউন্ড৷

কিন্তু সমাধিতে পাওয়া সবুজ হাড় বিরল৷ এমনটা দেখা যায়না৷ ব্রোঞ্জ এবং কপারের গহনা একমাত্র হাড়ের রঙ পরিবর্তন করে দিতে পারে৷ ডঃ বেলেজ ভাবেন শিশুটির দেহ হয়ত কোনও ধাতুর সংস্পর্শে এসেছিল৷ সেই কারণেই হাড়ের রঙ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু কী করে শিশুটির ছোট্ট হাতটিই শুধু ধাতুর সংস্পর্শে এসে মমি করে দিল? খোঁজ শুরু হয়৷ সেজেড ইউনিভার্সিটির বায়লজিক্যাল অ্যানথ্রপলজিস্ট ডঃ বেলেজ তাঁর সহকর্মী ও অনুবাদক জোল্ট বেরেস্কির মাধ্যমে জানান “এটা সাধারণ ঘটনা নয়৷ আপনি যদি নিজেকে প্রশ্ন করেন তো বুঝবেন এটি অসম্ভব৷”

তাঁরা একটি রাসায়নিক পরীক্ষা চালান৷ তাতে দেখেন শিশুর দেহের হাড়ে কপারের মাত্রা সাধারণ মানের থেকে একশো গুন বেশি রয়েছে৷ এমনকি সেই কপারের পরিমাণ একটি মমিতে যতটা থাকে তার থেকেও অনেক মাত্রায় বেশি৷

ডঃ বেলেজ সম্প্রতি কাছের মিউজিয়াম থেকে খুঁজে পান সেই বাক্স যে বাক্সর মধ্যে শিশুটিকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল৷ বাক্সটি পরীক্ষা করে তার মধ্যে থেকে বেলেজ পান রহস্যের সমাধান সুত্র৷ একটি ছোট্ট সেরামিকের পাত্র পান তিনি ও পান একটি ক্ষয়ে যাওয়া কপারের পয়সা৷ ডঃ বেরেস্কি জানান “আমরা গল্পের রহস্য উন্মোচন করতে শুরু করি এর পরেই৷” এরপরেই দুজনের দল এই সিদ্ধান্তে আসেন, শিশুটিকে মৃত্যুর পর ওই পাত্রে শোয়ানোর পরে কেউ তার হাতে পয়সাটি ধরিয়ে দিয়েছিল৷ পুরাণ কালে এমন অনেকে বিশ্বাস করতেন এভাবে মৃতের হাতে পয়সা ধরিয়ে দিলে তার পরকালে বা পুনর্জন্মে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে৷ বা এটিকে পর জনমের একটি উপায় হিসেবে ধরা হত৷

এখানে সেই কপারের পয়সায় থাকা অ্যান্টি মাইক্রোবাইয়াল প্রপার্টিস বছরের পর বছর শিশুটির হাতে থেকে যায়৷ মাটির তলার পরিস্থিতিতে বাক্সের ভেতর তেই কপার শিশুটির হাতের মাংস ও চামড়া নষ্ট হয়ে যেতে দেয়নি৷ এই গবেষক দল মনে করেন শিশুটির কপারে হাত মমি হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে৷ কারণ কপারেও মমিফিকেশন করা যায় এই তথ্য আগে কখনও পাওয়া যায়নি৷

গবেষকদের এই দল জানান শিশুটিকে অবশ্যই উপুড় করে রাখা হয়েছিল৷ তাই শরীরের অন্য অংশ কপারের সংস্পর্শে না থাকায় বাকি হাড় অংশ মমি হয়নি৷ এই দলটি সাক্ষী হিসেবে আরও দুটি ওই সময়ের অপরিণত শিশুর সমাধিও গবেষণা করে দেখেছে৷ তার মধ্যে একটিতে সবুজ হাড় মিলেছে৷ সেই সমাধিতে কয়েন ও পাত্র পান তাঁরা৷ আরেকটিতে কোনও কয়েন ছিল না৷ তাই তার হাড়ের রঙে কোনও পরিবর্তন পাননি তাঁরা৷ অবশেষে কপার কয়েনই সেই মমি হয়ে যাওয়া সবুজ হাত ও সবুজ হাড়ের রহস্যের সমাধান করল৷

Advertisement ---
---
-----