‘নন্দীগ্রাম মঞ্চ’ থেকে দৃঢ় হচ্ছিল শপথের মুঠো…

প্রসূন ভৌমিক: আজ এমন একটা সময় ১৪ মার্চ এল, যখন টিভি, ইন্টারনেট ও খবরের কাগজে দেখা যাচ্ছে মহারাষ্ট্রে গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলছেন হাজার হাজার কৃষক। তাঁদেরকে সংগঠিত করেছেন সেখানকার কম্যুনিস্ট পার্টি। যে কোনও কম্যুনিস্ট পার্টির এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। কৃষক-শ্রমিকের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের ক্ষমতায়ণ করে জোতদার লুঠেরাদের হাত থেকে রক্ষা করা তাদের রাজনৈতিক কর্তব্য।

অথচ, ২০০৭-এর এই সময় কৃষকের জমি কর্পোরেট লুঠেরাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য কৃষকের গণপ্রতিরোধে পুলিশ ও হার্মাদ দিয়ে গুলি চালায় বঙ্গের ‘কম্যুনিস্ট’ সিপিএম। এর কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছে সিঙ্গুরের জমি আরও এক কর্পোরেটের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া।

১৫ মার্চ এশিয়ার শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। অনেকের কবিতা নিয়ে বিজল্পের একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয় সেখানে। গিয়ে আবিষ্কার করলাম মঞ্চে বিধানসভার তৎকালীন অধ্যক্ষ হাসিম আব্দুল হালিম, রবীন দেব সহ সিপিএমের তাবড় তাবড় নেতা। বিজল্পের সেই সংখ্যার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় শেষ মুহূর্তে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলাম নন্দীগ্রামের কৃষকহত্যাকারীদের জন্য ধিক্কার।

- Advertisement -

কিন্তু সেসব না-দেখেই মঞ্চে প্রকাশিত হয়ে গেছে বিজল্প। এর পর প্যালেস্টাইনের এক অতিথির বক্তব্যের পর আমাদের পরিকল্পনা মাফিক এক কবিবন্ধু কবিতা পড়তে উঠলেন। কবিতাপাঠের আগে ইংরেজি ভাষায় আমেরিকা, ইজরাইলের পাশাপাশি নন্দীগ্রামের গণহত্যাকাণ্ডে সিপিএমকেও সমতুল্য বলে ধিক্কার জানালেন। মঞ্চে শুরু হয়ে গেল গুলি খাওয়া বাঘের দাপাদাপি।

দরগা রোডের একটি স্কুলে এই অনুষ্ঠান চলছিল। সিপিএমের মধ্যে কোনও কোনও শুভানুধ্যায়ী পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও আমি ও আমরা অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে যাওয়ার পর হুমকি ও ধাক্কাধাক্কি উপেক্ষা করে সামনের গেট দিয়েই বেরিয়েছিলাম। নন্দীগ্রামের ঘটনার পর এটাই ছিল আমাদের কয়েকজনের প্রথম প্রতিক্রিয়া। বিজল্পের সেই সংখ্যা আর পাওয়া যায় না। ঘটনাটিও এতদিন বাইরে প্রকাশ করিনি। আসলে, পরবর্তীকালে গোটা বাংলা জুড়ে যে ঝড় বইছিল, প্রতিদিন যত কর্মসূচি নিজেরা তৈরি করছিলাম অথবা অন্যের কর্মসূচিতে যোগদান করছিলাম, সেই ঘিরে হারিয়ে গিয়েছিল এই ঘটনাটি।

সম্ভবত ১৬ মার্চ বাংলা বনধ ছিল। পরের দিন কবীর সুমনের ডাকে ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে ঐতিহাসিক সমাবেশ। শুরু হল প্রতিরোধ। মেট্রো চ্যানেলে প্রতি শনিবার সহনাগরিকদের মুক্তমঞ্চে কবীর সুমন, জয় গোস্বামী, বিভাস চক্রবর্তী, শুভাপ্রসন্ন সহ লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী সুশীল সমাজ পথে নামতে থাকলেন।

অন্যদিকে, মহাশ্বেতা দেবী ও ডা. দেবপ্রিয় মল্লিকের নেতৃত্বে নন্দীগ্রামে গিয়ে কৃষকদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানো, অত্যাচারিতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সোনাচূড়া শহিদ স্মৃতি হাসপাতাল গড়ে তোলা, ত্রাণ সংগ্রহ করে শিবিরগুলিতে বণ্টন করা, এ সব ছিল নিয়মিত কর্তব্য।

বাংলার সমস্ত গণসংগঠনকে নিয়ে গণআন্দোলনের এক যৌথ মঞ্চ গড়ে ওঠে এই সময়। এর মূল সংগঠক ছিলেন মেধা পাটেকর। দায়িত্ব পড়ে আমার উপরে। মহাশ্বেতা দেবী এই মঞ্চের নাম দেন ‘নন্দীগ্রাম মঞ্চ’। ধর্মতলায় এই মঞ্চ দীর্ঘদিন ধরে চলে। ঐতিহাসিক ১৪ নভেম্বরের মিছিল শেষ হয় এই মঞ্চেই। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, ত্রাণ সংগ্রহ ও নন্দীগ্রামে পাঠানোর কাজ হত এই মঞ্চ থেকে। অরুন্ধতী রায়, সুমিত সরকার, তনিকা সরকার, স্বামী অগ্নিবেশ, হিমাংশু কুমার সহ সর্বভারতীয় স্তরের বিশিষ্টজন নিয়মিতভাবে এই মঞ্চে আসতেন। আমাদের সঙ্গে নন্দীগ্রামেও যেতেন।

আজ এত দিন পর ১১ বছরের সেই মেয়েটার মুখ ভেসে উঠছে। নর্মদা শীট, রাধারানী আড়িদের সঙ্গে গণধর্ষিতা হয়েছিল সে-ও। আমরা কথা বলতে যাওয়ার সময় মাথায় ওড়না দিয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। সে নাকি দু’ দিন আগেও গ্রামের মধ্যে আদুল গায়ে খেলাধুলো করত। ধর্ষিতা হওয়ার পর সে প্রথম চিনল লজ্জাকে! আমাদেরও খুব লজ্জা করছিল, ঘেন্না হচ্ছিল, দৃঢ় হচ্ছিল শপথের মুঠো…

Advertisement ---
-----