সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: এক তরুণের অদম্য সাহসে বাঘা যতীন ইংরেজদের সঙ্গে জোর লড়াই করতে পেরেছিলেন বুড়িবালামের তীরে। আর এক নাম না জানা বিশ্বাসঘাতক মাড়োয়ারি যুবক যার জন্য বুড়িবালামের যুদ্ধটা জিতে ফেরা হয়নি বিপ্লবী যতীন মুখার্জির।

দিনে-দুপুরে মেসরস আর.বি.রডা অ্যান্ড কোম্পানির ৫০টি মৌজার পিস্তল এবং ৯টি বাক্স টোটা গায়েব হয়ে যায়। চুরির দিন তিনেক পর ঘটনা টের পেয়েছিলেন কোম্পানীর কর্ণধার প্রিক সাহেব। এমনিতেই তখন যুগান্তর দল, অনুশীলন সামিতির বৈপ্লবিক কার্যকলাপে ব্রিটিশ পুলিশ জেরবার। হয়ে গিয়েছে আলিপুর বোমা কাণ্ড, হাওড়া-শিবপুর ষড়যন্ত্র মামলা।

এত অস্ত্র চুরির ঘটনা তখনও ঘটেনি। ঘটে গেল ১৯১৪ সালে। চুরি যাওয়া অস্ত্রের বেশ কিছু গিয়ে পৌঁছেছিল বাঘা যতীনের হাতে। অস্ত্র লুঠের মূলে ছিলেন ‘সুবোধ’ বালক হাবু। কিন্তু অন্য যুবকটি বিশ্বাসঘাতকতা না করলে হয়তো লড়াইটা জিততে পারতেন যতীনরা।

৩৯ নং মলঙ্গা লেনের বাসিন্দা অনুকুল চন্দ্র মুখার্জি ছিলেন আত্মোন্নতি সমিতির একজন একনিষ্ঠ কর্মী। অস্ত্র আর বিপ্লবী সংগ্রহে তাঁর পারদর্শীতার জন্য তাঁকে দলের সবাই ‘গুরুদেব’ বলে ডাকতেন। সেখানকারই ছেলে হাবু ওরফে শ্রীশচন্দ্র মিত্র। ডানপিটে ছেলে নজরে পড়ে যান গুরুদেবের। ছেলেটিকে তিনি গড়ে পিঠে নেন। ট্রেনিংইয়ে বেপরোয়া হাবু হারিয়ে গেল।

বিপ্লবী বিপিন বিহারি গাঙ্গুলীর বন্ধু রডা অ্যান্ড কোম্পানির কর্মী কালিপদ মুখার্জির চেষ্টায় ১৯১৩ সালের অগাষ্ট মাসে অস্ত্র হাবুর চাকরি হয়ে গেল রডা কোম্পানিতে। প্রত্যেকেরই লক্ষ্য ইংরেজদের ডেরা থেকে অস্ত্র লুঠ করা এবং বিপ্লবীদের হাতে তুলে দেওয়া। হাবু’র সূচ হয়ে প্রবেশের শুরু ১৯১৩ সালের আগস্ট মাসে। ফাল হয়ে বেরনো ১৯১৪-র আগস্টে। মাঝের এই একবছরে হাবু কমপক্ষে ৪০ বার দক্ষতার সাথে অস্ত্র খালাসের কাজ করে প্রিক সাহেবের বিশ্বাস অর্জন করে নিয়েছিল।

১৯১৪’র আগস্টে খিদিরপুর ডকে ‘ট্যাক্টিসিয়ান’ নামক জাহাজে করে এলো রডা কোম্পানির ২০২টি দেবদারু কাঠের বাক্স। যার একটিতে ছিল ৫০ টি মৌজার পিস্তল। ১৯১৪ সালের ২৬ আগস্ট প্রিক সাহেব ‘প্রিয়’ হাবুকে কাস্টম হাউসের জেটিতে নিয়ে গিয়ে মাল খালাসের প্রয়োজনীয় চিঠি ও টাকা দিয়ে চলে যান। হাবু সরকারি অফিসার- ইন-চার্জ এর কাছ থেকে মাল বুঝে নেওয়ার অছিলায় প্রতিটি বাক্স খুলে দেখে দশটি বাক্সকে চিহ্নিত করে রাখে। পূর্ব পরিকল্পনা মত অনুকুল চন্দ্র মুখার্জির পাঠানো গাড়ি সমেত সাতখানা মোষের গাড়িকে পোর্টের গুদামে নিয়ে যাওয়া হয়। সাত নম্বর গাড়ির সাথে হরিদাস দত্ত, অতুল নামে এক হিন্দুস্থানী কুলির ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েন। এই হরিদাস ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা এবং বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের দলের লোক।

ছ’টি গাড়িতে বাকি মাল তুলে সাত নম্বর গাড়িটিতে হরিদাস হাবুর চিহ্নিত করা দশটি বাক্স তুলে দেন। হাবু ছ’টি গাড়িকে গেট পাস দিয়ে বেড়করে দেওয়ার কিছু পরে যখন ওই গাড়িগুলি খানিক দূরে চলে যায় তখন সাত নম্বর গাড়িটিকে গেট পাস দিয়ে বের করেন হাবু আর চালককে নির্দেশ দেন অতুলের নির্দেশ মত গাড়ি নিয়ে যেতে।

হাবু ছ’টি গাড়ি নিয়ে ভ্যান্সিটার্ট রো’এর রডা কোম্পানীর গুদামে হাজির হয়। কিন্তু সাত নম্বর গাড়ি আসেনি। উদ্বিগ্ন হওয়ার ভান করে সাত নম্বর গাড়ির খোঁজে সে বেড়িয়ে পরে। প্রিক সাহেবেরও কোন সান্দেহই হয় না।

এদিকে চালককে মদ্যপ করিয়ে হরিদাস অস্ত্র ভরতি গাড়ি নিয়ে চম্পট দেয়। পরের দিন হাজির হয় শিক্ষাগুরু অনুকুল চন্দ্র মুখার্জির বাড়ি। হিন্দ আইনক্স সিনেমা হলের উল্টোদিকে অনুকুল চন্দ্র মুখার্জি, বিপিন গাঙ্গুলী, হরিদাস দত্ত ও গিরীন্দ্র নাথ ব্যানার্জির মূর্তি সহ ঘটনাটির সংক্ষেপ বর্ননাও মেলে। ৩২/২ মলঙ্গা লেনে ছিল কান্তি মুখার্জির লোহার গোলা। অনুকুল চন্দ্র সেখানে বাক্সগুলো নামিয়ে রেখে মোষের গাড়িটিকে ছেড়ে দেন। এরপর দুটি গাড়িতে বাক্সগুলি চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হিদারাম ব্যানার্জি লেনের মধ্যে দিয়ে ৩নং জেলিয়াপাড়া লেনের ভুজঙ্গ ধরের বাড়িতে।

সেখান থেকেই বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সেই রাতেই পিস্তল ও টোটাগুলি বিলি করে দেওয়া হয়। তিন দিন পরও হাবু ফিরে না আসায় ২৯ আগস্ট বিকেলে প্রিক সাহেব ঘটনাটি পুলিশকে জানান।

৩১আগস্ট গিরীন্দ্রানাথ, অনুকূল চন্দ্র, নরেন্দ্রনাথ ভট্যাচার্য, কালিদাস বোস ও ভুজঙ্গ ধর কে গ্রেফতার করা হয়। বিপিন গাঙ্গুলি গা ঢাকা দেওয়ায় তাঁকে ধরা যায় নি। ২৭ সেপ্টেম্বর বিলি না হওয়া ২১২০০ টোটাসহ হরিদাস দত্তকে পুলিশ বড়বাজার এক গুদাম থেকে গ্রেফতার করে। মূল কর্তা হাবু তখন রংপুরে। পরে হাবু আশ্রয় নেয় অসমের গোয়ালপাড়াত। সেখান থেকে হাবু মণিপুরে চলে যায়। এরপর হাবুর আর কোন খোঁজ মেলেনি।

১৯১৫ সালের ৮ মার্চ ‘বেনিফিট অফ ডাউটে’ গিরীন্দ্রনাথ ও অনুকূল চন্দ্র ছাড়া পান। কারাদন্ড হয় ভুজঙ্গ ধর হরিদাস দত্ত, কালিদাস বসুদের। ততদিনে চুরি যাওয়া পিস্তল ও টোটা বাংলার বিপ্লবীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন। বাঘা যতীন এই পিস্তল আর টোটা নিয়ে বুড়িবালামের তীরে যুদ্ধ করলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। কারণ যুদ্ধের জন্য যথেষ্ট অস্ত্র তাঁদের কাছে ছিল না।

বাঘা যতীনদের কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল আটক হওয়া ২১২০০ টোটা। যা পৌঁছায়নি অজানা মাড়োয়ারি ছেলের বিশ্বাসঘাতকতায়। সেই টোটাগুলির সন্ধান পুলিশকে বলে দেয়। ধরা পরা টোটাগুলি ধরা না পরে যদি বাঘা যতীন পেতেন তাহলে বুড়িবালামের যুদ্ধের ইতিহাস হয়তো বদলাতেও পারত। বুড়িবালামের তীরের শেষ ৭৫ মিনিটের যুদ্ধটায় আর একটু সময় বেশি টিকেও থাকা যেত হয়তো। যদির কথা নদীতে। আর বাকি সবই ইতিহাস।

--
----
--