সপ্তসিন্ধুর জলে পূজিতা হন পদ্মাপারের কালো দুর্গা

ছবি - সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা : ‘লোকে বলে কালি কালো’ বিখ্যাত শ্যামা সঙ্গীত। শক্তির আরাধ্যা দেবী কালির কালো রূপ সবারই চেনা। কিন্তু কালো দুর্গা প্রতিমা। তা কি কখনও দেখেছেন ? দেখতে হলে আসতে হবে বেলেঘাটার ভট্টাচার্য বাড়িতে। সেখানেই মিলবে দেবীর এমন রূপের। সেখানে সপ্ত সিন্ধুর জলে স্নান করেই পুজো গ্রহণ করেন কেশবর্না দেবী দুর্গা।

বেলঘাটা চার মাথার মোড় থেকে রামকৃষ্ণ নস্কর লেন ধরে একটু এগিয়ে গেলেই ভট্টাচার্য বাড়ি। বাড়ি বললে ভুল হবে ফ্ল্যাট বাড়ি। ভট্টাচার্যদের বর্তমান নিবাস। সেখানেই আরাধনা হয় প্রায় ২৯০ বছরের প্রাচীন কালো দুর্গা প্রতিমার। স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার পাবনা জেলার স্থলবসন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা শ্রী হরিদেব ভট্টাচার্য। সেই থেকেই শুরু কালো দুর্গা পূজার।

- Advertisement -

পরিবারের সদস্যা কৃষ্ণা ভট্টাচার্য বলেন, “নাটোরের রাণী ভবানীর আমলের শ্রী হরিদেব ভট্টাচার্য্য এই দুর্গাপূজার সূচনা করেন। আদতে তিনি ছিলেন নদীয়া জেলার বাসিন্দা। নাটোরের রাণী মা তাঁকে জমি প্রদান করেন এবং হরিদেব হয়ে যান পাবনার স্থলবসন্তপুরের জমিদার।” এখন সেই গ্রাম পদ্মার গ্রাসে চলে গিয়েছে। এই কালো রূপের কারন কি শুধুই স্বপ্নাদেশ?

কৃষ্ণা ভট্টাচার্য বলেন, “স্বপ্নাদেশ পেলেও পণ্ডিত হরিদেবের এই রূপ অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। অনেকে অনেক বিধান দেন। কোনওটিই তাঁর মনঃপুত হয়নি। বেনারসে গঙ্গার ঘাটে এক গ্রীষ্মের দুপুরে এক সাধুর সঙ্গে দেখা হয়। কথোপকথনের মাধ্যমে সাধু তাঁকে বলেন, দুর্গার এই রূপের ব্যখ্যা রয়েছে চণ্ডীতে।” সেখানে তিনি ভদ্রকালি। সেই শুরু। তারপর থেকে ২৯০ বছর পেরিয়ে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে ভট্টাচার্যদের অভিনব রূপের দুর্গা পূজা।

সপ্ত সিন্ধু ছাড়া পুজোয় অন্য জল ব্যবহার করা হয় না। করুনাময় ভট্টাচার্য বলেন , “বাজারে ‘ভেজাল’ সপ্ত সিন্ধুর জল পাওয়া যায়। আমরা ওই জল ব্যবহার করি না। সাত নদীর আসল জল প্রত্যেক বছর আমাদের সংগ্রহ করে রাখা হয়। সেই জলেই মায়ের পুজো হয়। পুজো হয় তন্ত্রমতে।”

পরিবারের সদস্যের থেকে জানা যায়, “কালীঘাটের পটুয়াপাড়া অঞ্চলে রয়েছে আমাদের পরিবারের দয়াময়ী কালী মন্দিরও, যেখানে নিত্যপূজোর আয়োজন রয়েছে। কালীঘাটেরই শিল্পী অরুণ পালের হাতেই এখন তৈরি হয় আমাদের দুর্গা প্রতিমা।”

মায়ের রঙ কালো হলেও চার সন্তানের গায়ের রঙ স্বাভাবিক। মহিষাসুর সবুজ রঙের। দুর্গার চার সন্তানের অবস্থানও আলাদা। মায়ের ডানপাশে থাকেন লক্ষ্মী ও কার্ত্তিক। বামপাশে থাকেন দেবী সরস্বতী এবং গণেশ।”

আরও এক সদস্য গৌর ভট্টাচার্য বলেন, “নিজেদের বাড়িতে যখন পূজো হত তখন মোষ বলি হত। জায়গার অভাব। তাই বছর কুড়ি হল তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে পূজোর চারদিনই চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। মা কে দেওয়া হয় অন্ন ভোগ।

পাবনা থেকে ১৯৪৭ সালে আসানসোল চলে আসে ভট্টাচার্য পরিবার। সেখানেই পুজো হত। তারপর স্থান পরিবর্তন করে কখনও দুর্গাপুর, কখনও সল্টলেকে তাদের পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে পূজা হয়েছে। বছর পনেরো ধরে রামকৃষ্ণ নস্কর লেনের ফ্ল্যাট বাড়ির নীচে ফাঁকা জায়গায় আরাধনা হয় দেবীর। কৃষ্ণা ভট্টাচার্য বলেন, “দেশ ভাগ হয়েছে। সমাজে বহু পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পুজোয় কোনওদিনই কোন বাধা পড়েনি।” হরিদেব ভট্টাচার্য কালো দুর্গা আরাধনা শুরু করেছিলেন, সেই ঐতিহ্য পদ্মা পেরিয়ে এখন বইছে গঙ্গা তীরেও।

Advertisement ---
---
-----