বিচারকের দৌলতে হোটেলের ঘরে ‘ঘন’ হল দম্পতির প্রেম!

স্টাফ রিপোর্টার, সিউড়ি:  এই কাহিনী শুনলে পি সি সরকারের ম্যাজিকও হার মানতে বাধ্য!
স্বামীকে কারাগারে পুড়তে যে বধূ থানার চৌকাঠে পা দিতেও রেয়াত করেননি, তিন মাস পর সেই বধূ হোটেলের ঘরে স্বামীর সঙ্গে একসঙ্গে রাত কাটালেন৷ মাঘের শীতের ভোরে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বারবার স্ত্রী থুড়ি প্রেমিকাকে দেখছিলেন গৌতম৷

একসময় লজ্জায় লাল হয়ে ওঠা অহনা অস্ফূটে বলল, ‘‘যাহ্, ওভাবে তাকিও না৷ আমার লজ্জা লাগে!’’ যেন হানিমুনে এসেছে নবদম্পতি! এক রাতের ব্যবধানে বোঝা দায়, প্রেম করে বিয়ের পর বিবাহবার্ষিকী ঘোরার আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁরা৷

বেলা গড়াতে ২০৫ নম্বর রুমে ঢুকলেন বীরভূম জেলা আদালতের সরকারি আইনজীবী রঞ্জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়৷ মিনিট পনেরো দম্পতির ঘরে কাটিয়ে হাসিমুখে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি৷ বললেন, ‘‘বিচারকের দূরদর্শিতাকে তারিফ না করে পাচ্ছি না৷ ওঁনার পরামর্শ মেনে একটা সংসার হয়তো শেষ পর্যন্ত ভাঙবে না৷’’

পাশ থেকে অহনা বলে উঠলেন, ‘‘সত্যি আমরা ভাগ্যবান! এমন বিচারকের সান্নিধ্য না পেলে আমাদের সম্পর্কটাই ভেঙে যাচ্ছিল৷’’ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন বছর আঠাশের যুবক, পেশায় সিউড়ি বিদ্যুৎ দফতরের কর্মী গৌতম৷ স্বামীকে থামিয়ে অহনা বলে উঠল, ‘‘যাঁরা আমাদের মতো ডির্ভোস চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে বলব- ডির্ভোস না দিয়ে এমন বিচারকের পরামর্শ নিন৷ ভাঙা প্রেম জোড়া লাগতে বাধ্য৷ এটা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা৷’’

মঙ্গলবার দুপুর৷ বীরভূম জেলা আদালতের বিচারক পার্থসারথী সেনের এক সিদ্ধান্তের জেরে রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠেছে সিউড়ি বাসস্ট্যাণ্ড সংলগ্ন অনামী হোটেলটা৷ মঙ্গলবার সন্ধে থেকেই সেখানে ভিড় জমিয়েছে মিডিয়াকুল৷ হোটেলের ২০৫ নম্বর রুমের ‘দম্পতি’কে ঘিরে সদাব্যস্ত হোটেল কর্তৃপক্ষও৷ দম্পতির পছন্দ মতো মঙ্গলবারের দুপুরে তাঁদের মেনুতে ছিল- সরুচালের ভাত, ডাল, আলুভাজা, আলুপোস্ত, মাছের ঝাল ও চাটনি৷ রাতে রুটি ও চিকেন সহযোগে ডিনার৷

রহস্যের পর্দাটা তাহলে তোলায় যাক! গল্পটা এরকম- সিউড়ির ভট্টাচার্য পাড়ার গৌতমের সঙ্গে ফোনালাপে সম্পর্কের পথ চলা শুরু হয়েছিল নদিয়ার তেহট্টের অহনার৷ সম্পর্ক গড়াল প্রেমে৷ যার পরিণতি, গত বছরের ২রা মার্চ অহনা-গৌতমের চারহাত এক হয়৷ তবে নব দম্পতির সংসার জীবন বিশেষ সুখের হয়নি৷ হানিমুন পর্ব মিটতেই প্রেম উবে অশান্তি স্থায়ী জায়গা নিল৷

তারই জেরে গত বছর পুজোর পর ২০ অক্টোবর শ্বশুরবাড়ি থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিলেন অহনা৷ স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে ‘শিক্ষা’ দিতে চলতি বছরের ৮ জানুয়ারী তেহট্ট থেকে সোজা সিউড়ি থানায় হাজির অহনা৷ ৪৯৮ ধারায় বধূ নির্যাতনের মামলা ঠুকে দিলেন৷ পুলিশ দেখে থরহরিকম্প হাল পরিবারের৷ পুলিশের মুখ থেকেই শুনলেন – বাড়ির বধূ মামলা ঠুকেছে৷ বধূ নির্যাতনের পাশাপাশি ডির্ভোসও চেয়ে বসেছে সে৷

অগত্যা, চার দেওয়ালের বন্দিজীবন এড়াতে বাবা, দাদাকে নিয়ে সিউড়ি জেলা আদালতে আগাম জামিনের আবেদন জানালেন গৌতম৷ মামলার ‘কেস হিস্ট্রি’ শুনে চোখ কুঁচকেছিলেন দুঁদে আইনজ্ঞ, জেলা আদালতে বিচারক পার্থসারথী সেন৷ তারই নির্দেশে মঙ্গলবার আদালতের এজলাসে মামলার শুনানীতে হাজির হয়েছিলেন গৌতম-অহনা৷ পরস্পরের বিরুদ্ধে দু’জনের ‘ছেলে মানুষী’ অভিযোগ শুনে বিচারকের নিদান ছিল- ‘‘তিনদিনের জন্য বাইরে কোনও জায়গা থেকে ঘুরে আসুন৷ হয়তো সম্পর্ক জোড়া লাগতে পারে৷’’ প্রথমে রাজি ছিল না দম্পতি৷

এমনকি হোটেলে থাকার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই বলেও বিচারককে জানান গৌতম৷ তখনই সংসার বাঁচাতে বিচারক সটান বলে বসেন- ‘‘আমি আপনাদের হোটেলের খরচ বহন করতে রাজি৷ তাহলে তো আপত্তি থাকতে পারে না৷ কি দু’জনে একসঙ্গে যাবেন তো?’’ বিচারকের আবেগতাড়িত কন্ঠ শুনে দু’জনেই একবাক্যে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানান৷

ব্যাস, বিচারকের এক সিদ্ধান্তেই কেল্লাফতে৷ অল্পের জন্য বিবাহবিচ্ছেদ থেকে বেঁচে গেল নবদম্পতি৷ এমন হাই-প্রোফাইল দম্পতির প্রেম ‘কভার’ করতে মঙ্গলবার সন্ধে থেকেই হোটেলের সামনে ভিড় জমিয়েছে মিডিয়াকুল৷ ২০৫ নম্বর রুমের সার্ভিস বয় বলছেন- কে বলেছে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে৷ আইনের বেড়াজাল টপকে আবেগের টানে বিচারকও যে ভাঙা সম্পর্ককে জোড়া লাগাতে পারেন, এঘটনা তো তারই প্রমাণ৷

----
-----