যে চার সমস্যায় জর্জরিত মোদী

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: নরেন্দ্র মোদীর সামনে একটি নয়, চার-চারটি বড় সমস্যা রয়েছে৷ সম্প্রতি তিনি সংবাদ সংস্থা এএনআই-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন৷ সেখানেই তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন রামমন্দির নিয়ে তিনি আদালতের নির্দেশের আপেক্ষায় রয়েছে সরকার৷ এটিই মোদীর প্রথম এবং সব থেকে গভীর সমস্যা৷ যা অতিক্রম করার রাস্তা খুঁজছেন তিনি৷ রামমন্দির নিয়ে অর্ডিনান্সকে পাত্তা না দিয়ে তিনি বিজেপির আদর্শগত গুরু রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে ক্ষেপিয়ে তুলেছেন৷

সরসঙ্ঘচালক মোহন ভগবত কিছুদিন আগে মোদী সরকারকে রীতিমতো হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘কাজ করতে হলে কর৷ ভাব৷ তাড়াতাড়ি আইন বানাতে হবে৷ রামমন্দির বানানো উচিত – দেশের সমস্থ চিন্তাভাবনা এই কথাই বলে৷ রাম জন্মভূমিতেই রামমন্দির তৈরির যৌক্তিকতা সিদ্ধ হয়েছে৷ সঙ্ঘ আরো জানিয়েছে, রামমন্দির মোদী জমানার প্রথম পাঁচ বছরেরই তৈরি করতে হবে৷ মোদী সরকার পুর্ননির্বাচিত হলে রামমন্দির তৈরি হবে – সঙ্ঘ তা মানতে রাজি নয়৷ মোদীও বুঝতে পেরেছেন রামমন্দিরই তাঁর কাল হতে পারে৷ ভোটারদের থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে৷

প্রধানমন্ত্রী মোদীর কাছে দ্বিতীয় সমস্য হল তাঁর নির্বাচনী অ্যাজেন্ডা৷ ২০১৯ সালে কোন অ্যাজেন্ডায় ভোটে জিততে চাইবেন মোদী? ২০১৪ সালে উনি মঞ্চে উঠে সহজেই বলে দিতেন – ‘‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ৷’’ কিন্তু ২০১৯ সালে দেশের পরিস্থিতি বদলে গিয়েছে৷ এবছর ভোটের অ্যাজেন্ডা কী হবে তা ঠিক করে উঠতে পারেনি নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ৷ হিন্দুত্ব, উন্নয়ন, অর্থনীতি নাকি প্রশাসন – ভোটের কোন অ্যাজেন্ডায় লড়বেন মোদী? বিমূদ্রাকরণ বা নোটবন্দী বা ডিমোনেটাইজেশন যে তাঁর পাঁচ বছরের শাসনকালে সব থেকে বড় ভুল ছিল তা কি মানবেন মোদী? কৃষকদের চোখের জল কিংবা দেশের বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি – মানবেন মোদী?

প্রান্তিক মানুষজন নাকি স্পটলাইটের নীচে থাকা বিত্তশালী জনতা – কাকে গুরুত্ব দেবেন মোদী? দেশে মধ্যবিত্তদের কী হবে? টেলিভিশনে মোদীর সাক্ষাৎকার দেখে অনেকেই মনে করেছেন – তাঁর ৫৬ ইঞ্চি ছাতি কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছে৷ ‘ম্যাচো মোদী’র বদলে উনি ‘প্রধানমন্ত্রী’মোদী হয়ে উঠছেন৷ যে বিশেষজ্ঞরা নরেন্দ্র মোদী নিয়ে গবেষণা করেন – তাঁরা হামেশাই বলেন, মোদী পিছনের দিকে তাকান না৷ সময়ের সঙ্গে ভেসে চলেন৷ নিজেকে বিবর্তন করতে পারেন মোদী৷ এমন নেতারা বর্তমান ভারতে বিরল৷

মোদীর তৃতীয় সমস্য রয়েছে ঘরে এবং ঘরের বাইরে৷ এনডিএ-এর শরিকরা ধীরে ধীরে বিদ্রোহী হতে শুরু করেছে৷ বিহারে নীতীশ কুমার বেশি আসন চাইছেন, শিবসেনা মহারাষ্ট্রে মুখ্যমন্ত্রিত্ব চাইছে, ইতিমধ্যেই তারা এনডিএ-এর বাইরে চলে গিয়েছে৷ পঞ্জাবে অকালি দলের সঙ্গেও বিজেপির সুসম্পর্ক নেই৷ দলের ভিতরেও সমানভাবে বিতর্ক চলছে৷ অনেকে বলছেন, দেশের চার দিকে বিজেপি চারভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে৷ কী করবেন মোদী?

দলে তৃণমূলস্তরের কর্মীরা আবার মোদী ম্যাজিকের অপেক্ষায় রয়েছে৷ বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির অন্দরে একটা কথা বেশ চলে৷ অনেকেই বলেন – মোদীজিই আসল রক্ষাকর্তা৷ যিনিই রাম, তিনিই ভগবান বিষ্ণু৷ আবার যিনিই নরেন্দ্র দামোদোরদাস, তিনিই বিজেপির রক্ষাকর্তা৷ পার্টির একমাত্র মুখ৷ কিন্তু এই সম্পূর্ণ বিষয়টিই যেন চরিত্র বিরোধী৷ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের আদর্শে অনুপ্রাণিত বিজেপি কী কখনও এই রকম ছিল না৷ অটল বিহারি বাজপেয়ী বা লালকৃষ্ণ আডবানির, যশবন্ত সিং বা মুরলীমনোহর যোশী, রাম জেঠমালানি বা প্রমোদ মহাজনের আমলে বিজেপির কোনও নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিল না৷ সরকারের মুখ ছিলেন অটলবিহারি৷ কিন্তু অটলবিহারিই শুধুমাত্র সরকার ছিলেন না৷ মোদীকে যেন আজ বাববার বলতে হচ্ছে, বিজেপি গণতান্ত্রিক দল৷

মোদীর চতুর্থ সমস্যা রাহুল গান্ধী৷ ‘শাহজাদা বা পাপ্পু’ – সনিয়া তনয় রাহুল, মোদীর কাছে যে-ই হোন না কেন – ২০১৯ সালে তিনি মোদীর দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছেন৷ রাহুলের মোদী বিরোধী কথাবার্তা গপ্-গপ্ করে গিলছে আমজনতা৷ প্রতিষ্ঠান বিরোধীতা হোক বা মোদীর প্রতি রাগ থেকেই হোক – রাহুলের মুখ থেকে মোদীর উদ্দেশ্যে ‘সুট-বুটকে সরকার’ বা ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ শুনতে বেশ পছন্দ করেছে জনতা৷ বড় অংশের দেশবাসীকে রাহুল বোঝাতে সমর্থ হয়েছেন – মোদী বড় ব্যবসায়ীদের প্রিয় বন্ধু (পড়ুন – অনীল অম্বানি) এবং কারও কাছে ভগবান (নীরব মোদী, বিজয় মালিয়া, মেহুল চকসি) হয়েছেন৷ কিন্তু গরীবদের ‘মসিহা’ হতে ব্যর্থ হয়েছেন৷ সেই কারণেই দেশে বেকারত্ব বেড়েছে, বেড়েছে কৃষক আত্মহত্যা৷ রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে রাহুলের হামলার জবাব দিতে কিছুটা দেরি করেছেন মোদী৷ তা তিনি নিজেও জানেন৷

---- -----