শৈলেনকে ‘মান্না দা’ তৈরির কারিগর সনাতন স্যার

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ‘কেয়ার অফ স্যার’। অনেকটা সেরকমই ছিল মান্না দা’র কথাগুলো। ভারতীয় ফুটবলের মাইলস্টোন তিনি। দেশকে জার্সি গায়ে অধিনায়কত্ব করেছেন। কিন্তু স্কুলের গেম টিচার সনাতন স্যারের অবদানের কথা কোনওদিন ভোলেননি। আজীবন বলে গিয়েছেন স্যার ছাড়া শৈলেন মান্না হয় না।

ভারতীয় ক্রিকেটে সচিন বানিয়েছেন রমাকান্ত আচরেকর। এখনও স্যারের নাম নিলেই মাথা নিচু করেন সচিন। তাঁর পরিবর্ত নাকি বিরাট কোহলি। মাহিকে এমএসডি বানিয়েছিলেন স্কুলের গেম টিচার কেশব ব্যানার্জি। ধোনির পরিবর্ত আবার ঋষভ পন্থ। সেও কোচ তারক সিনহার অবদান কতটা তা জানিয়েছে।

আরও পড়ুন- মাদলের শব্দে মন ভালো করতে ঘুরে আসুন মোরাম

- Advertisement -

কিন্তু ভারতীয় ফুটবলে একটা শৈলেন মান্না আর তৈরি হবে না। কিন্তু শৈলেনকে মান্না বানিয়েছিলেন যিনি সেই সনাতন স্যার থেকেছেন লোক চক্ষুর অগোচরে। তবে তাঁকে সবসময় মনে রেখেছেন তাঁর প্রিয় ছাত্রটি।

ব্যাটরা মধুসুদন পালচৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়। ১৩০ বছরের পুরনো স্কুল। ত্রিশ, চল্লিশের দশকে তখন হাওড়ার স্কুলের পরিচিতি ভালো ফুটবলার তৈরির জন্য। একের পর এক ফুটবলার উপহার দিয়েছে ময়দানে। শৈলেন মান্না তাঁদেরই একজন। কিন্তু সেদিনের শৈলেনকে তৈরির কারিগরকে আর কজন জানেন? জানতেন শুধুই মান্না ‘দা’। আজীবন স্যারের নাম নিয়েছেন। কিভাবে স্যারের স্তুতি করবে ভেবে পেতেন না। মোহনবাগানের মতো বড় ক্লাবে খেলেছেন। দেশের হয়ে সফল অধিনায়ক। ভারতের সেরা ফুটবলারদের অন্যতম। কিন্তু সনাতন চাটুজ্জ্যেকে কোনওদিন ভুলে যাননি।

কেমন ছিল স্যার বন্দনা ? জানা গেল শৈলেন মান্নার স্কুলের প্রাক্তন সম্পাদক বিপ্রদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে। নিজেও একসময় চুটিয়ে ফুটবল খেলেছেন। স্কুল এবং ফুটবল উভয় সূত্রেই মান্না দা’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। শৈলেন মান্নার ৯৫তম জন্মদিনের আগে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বললেন, “কত কথা হয়েছে। অনেক গল্প। মাঠ, স্কুল, ফুটবল। কিন্তু কিছু কথা মনে থেকে যায়।” যা প্রমাণ দেয় অনেক উঁচু থেকেও ছোট্ট পৃথিবীকে তিনি স্পষ্ট দেখতে পেতেন। বিপ্রদাসবাবু বললেন , “মান্না দা সব সময় বলতেন এই যে মান্নাকে দেখছ ওটা সনাতন স্যার ছাড়া হত না।”

স্কুলে ছুটির ঘণ্টা পড়লেই ছাত্রকে নিয়ে সোজা হাওড়ার বেলগাছিয়া অঞ্চলের বিডিএফসি মাঠ। সেখানে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্র্যাকটিস। প্রত্যেকটা ট্যাকল নিখুঁত হওয়া চাই। কোন দিকে মুভ করলে বিপক্ষের স্ট্রাইকারকে আটকানো যেতে পারে সব বলে বলে শিখিয়েছেন সেদিনের ম্যাট্রিকের ছাত্রকে। বাকিটা ইতিহাস। হাওড়ায় থাকার সময় মামা বাড়ির অবদানও অনেক। কিন্তু সনাতন স্যারের জায়গাটা অন্য।

মধুসুদন পালচৌধুরী থেকেই হাওড়া ইউনিয়নে খেলার সুযোগ। ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ পর্যন্ত খেলেছেন হাওড়া ইউনিয়নে। তারপরে ১৯ পয়সায় মোহনবাগানের হয়ে যাত্রা শুরু।

তাঁর দীর্ঘ ফুটবল জীবনের ১৯ বছর টানা খেলেছেন মোহনবাগানে। পাঁচের দশকে খেলার পদ্ধতি একেবারে অন্য ধরনের ছিল। পাঁচ জন ডিফেন্সে খেলত হতো, অন্যতম শৈলেন মান্না। ১৯৫৩ সালে ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাঁকে বিশ্বের সেরা দশজন অধিনায়কের মর্যাদা দিয়েছিল। কোনও ভারতীয় ফুটবলার আজ পর্যন্ত এই সম্মান অর্জন করতে পারেননি। ফুটবলটা ভালোবেসে খেলতেন। চাকরি করতেন জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ায়।

এক অমায়িক ব্যাক্তিত্ব ময়দানের মান্না দা। হাসি মুখ ছাড়া তাঁকে কোনও দিন দেখা যায় নি। সনাতন স্যারের কথা উঠলে বারবার ফিরে এসেছে জেন্টেল ম্যানের বিনম্র শ্রদ্ধা।

Advertisement
---