সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘লজ্জাবতী’ ভারতের এই মন্দিরের ভাস্কর্য সম্বন্ধে আলোচনা করতে গেলে এখনও কথা হয় লুকিয়ে লুকিয়ে। কারণ মন্দিরের দেওয়ালে ভরতি প্রেমমূলক ভাস্কর্যের জন্য।

অথচ মধ্যযুগীয় হিন্দু ও জৈন মন্দিরগুলির এক বৃহত্তম প্রমান খাজুরাহের মন্দির। বলে দেয়, বেদ পুরাণের যুগেও যৌনতা নিয়ে কতটা খোলামেলা ছিল ভারতীয় সমাজ। প্রমাণ দেয় দেশের সমৃদ্ধ সমাজ সংস্কৃতির। কিন্তু ঠিক কোন গল্প লুকিয়ে রয়েছে মন্দিরের গায়ে এই শারীরচর্চার পিছনে?

খাজুরাহ নিয়ে যৌনতায় ভরা মুচমুচে পুরাকাহিনী প্রচলিত রয়েছে।
মুচমুচে গল্প ১ : হিন্দু পুরাকথা বা কিংবদন্তি অনুযায়ী বারানসীতে হেতম্বী নামে পরমা সুন্দরী এক ব্রাহ্মণ কন্যা ছিলেন। অল্প বয়সেই তিনি বিধবা হন। একবার গ্রীষ্মের এক জ্যোৎস্না আলোকিত রাতে তিনি যখন সরোবরে স্নান করছিলেন, তখন স্নানরতা অবস্থায় তাঁকে দেখে চন্দ্রদেব মুগ্ধ হন ও তাঁকে কামনা করেন।

চন্দ্র মানুষের রূপ ধারণ করে পৃথিবীতে আসেন এবং হেতম্বী ও চন্দ্রদেব মিলিত হন। শারীরিক মিলনের ফলে হেতম্বী গর্ভবতী হয়ে পড়েন ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে চিন্তিত হয়ে পড়েন। চন্দ্রদেব তখন ভবিষ্যৎবাণী করেন যে হেতম্বীর গর্ভে যে সন্তান আছে, সে হবে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী ও খাজুরাহের প্রথম রাজা৷

হেতম্বী বারানসী ত্যাগ করে দূরে খেজুরবনে গিয়ে সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের জন্মের পর হেতম্বী তাঁর নাম রাখেন চন্দ্রবর্মণ। পিতার মতোই সে সাহসী ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চন্দ্রের আদেশে চন্দ্রবর্মণ ওই এলাকায় মন্দির নির্মাণ করেন ও মন্দিরগাত্রে ‘ইরোটিক’ মূর্তি খোদাই করেন।

শোনা যায় হেতম্বী আর চন্দ্রদেবের কাম ও প্রেমের নিদর্শন হিসেবেই খাজুরাহো গড়ে ওঠে। তাই মন্দির জুড়ে শুধু যৌনতা আর কামের ছবি। চন্দ্রের ভবিষ্যৎবাণী ছিল এই মন্দির আসলে হেতম্বীকে তার পাপ থেকে মুক্তি দেবে।

মুচমুচে গল্প ২ : এও কথিত রয়েছে যে, হেতম্বী ছিলেন কলিঞ্জর রাজ্যের রাজব্রাহ্মণ মনিরামের কন্যা। অল্প বয়সেই তিনি বিধবা হন। মনিরাম একদিন ভুল করে রাজাকে অমাবস্যার রাতকে পূর্ণিমা বলে ফেলেন। হেতম্বী পিতার এই ভুল জানার পর চিন্তিত হয়ে পিতার সম্মান রক্ষার্থে চন্দ্রদেবের কাছে প্রার্থনা জানান।

চন্দ্র হেতম্বীর রূপে মোহিত হন ও তাঁরা মিলিত হন। হেতম্বী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। মনিরাম এই ঘটনাটি জানতে পেরে শোকে মুহ্যমান হয়ে নিজেকে অভিশাপ দিয়ে পাথরের মূর্তিতে পরিণত করেন। পরবর্তীকালে হেতম্বীর সন্তান চন্দ্রতেয় চান্দেলা রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন ও খাজুরাহ মন্দির নির্মাণ করেন।

ইতিহাসও এবং কথিত কাহিনী নিয়ে এমনই জমাটি ‘ক্রিসপি’ মন্দিরের শিল্পগল্প। মন্দিরগুলি ৯৫০ থেকে ১০৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত হয়েছিল, অর্থাৎ মধ্যভারতের চান্দেলা রাজবংশের সময় নির্মিত হয়েছিল। শহরের প্রায় ৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে আবৃত রয়েছে মন্দির। ভারতের “সপ্তম আশ্চর্য”-এর মধ্যে গণ্য হয়। খাজুরাহের মন্দির ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যপূর্ণ স্থান।

চান্দেলা রাজবংশের পতনের পর মন্দিরগুলি পরিত্যক্ত ও বিস্মৃত হয়ে পড়ে এবং মূল ৮৫টি মন্দিরের মধ্যে মাত্র ২২টি মন্দির টিকেছিল, সেগুলি এক ব্রিটিশ সামরিক ইঞ্জিনিয়ার , ক্যাপ্টেন টি.এস.বার্ট-এর দ্বারা পুর্নস্থাপিত করা হয়।

মন্দিরগুলি পশ্চিমী, পূর্বীয় ও দাক্ষিণ্য বিভাগে বিভক্ত ছিল। মন্দিরের অভ্যন্তরে জীবন শৈলী যেমন – যুদ্ধবিগ্রহ, বিবাহ, আধ্যাত্মিক প্রতীক, দৈনন্দিন জীবন ও জীবন ধারণের সমস্ত গঠনের থেকে বিস্তারিত কীর্তিকলাপের বর্ণিত দৃশ্যের ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে। বিভিন্ন মন্দিরগুলি ভিন্ন ভিন্ন দেবদেবী যেমন – শিব, সূর্য এবং ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত।

পূর্বীয় মন্দিরের সমষ্টিগুলি ব্রহ্মা মন্দির, বামন ও জাভারি মন্দির, পার্শ্বনাথ মন্দির, ঘন্টাই মন্দির, আদিনাথ মন্দির ও শান্তিনাথ মন্দিরের সমন্বয়ে গঠিত। দাক্ষিণ্য সমষ্টির মধ্যে কেবল দুটি মন্দির অন্তর্ভূক্ত রয়েছে – ধূলাদেও মন্দির ও প্রখ্যাত চতুর্ভূজ মন্দির। কাণ্ডারীয় মহাদেব মন্দির হল এমন একটি মন্দির, যেটি বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ। এতে ৩০.৫ মিটার আকৃতির আস্ফালিত খাজুরাহর সর্বোচ্চ কুণ্ডলী আছে।

একটি অনন্য শৈল্পিক সৃষ্টির প্রতিনিধিত্বকারী, লক্ষণ মন্দিরে ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতার প্রভু নরসিংহ, প্রভু বরাহ ও ভগবান বামনের ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্যগুলিও উপস্থিত রয়েছে। প্রভু ব্রহ্মা ও প্রভু বিষ্ণুর মাঝখানে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তিটি দণ্ডায়মান। এখানে দৈত্য মহিষাসুরকে হত্যাকারিণীদের দেবী দুর্গার মূর্তিও আছে।তবে খাজুরাহের মন্দিরগুলি, তাদের প্রেমমূলক কামদ শিল্পকর্মের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। মন্দিরের অভ্যন্তরীণ ও বহির্ভাগ উভয় দেওয়ালগুলিতেই পরীদের সুসজ্জিত ও বিভিন্ন আসনে যৌনক্রিয়ার ভাস্কর্য দেখা যায়।

--
----
--